সিটি নির্বাচন

খুলনা-গাজীপুরে জমজমাট প্রচারণা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন জমে উঠেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে আগামী ১৫ মে হতে যাওয়া এই ভোটকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি। তাছাড়া এই দুই সিটি নির্বাচন দল দুটির জন্য অগ্নিপরীক্ষাও। কারণ, এবারও প্রথম দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন মেয়র প্রার্থীরা। দুই সিটিতেই ভোটের উত্তাপ। ফলে জমে উঠেছে খুলনা ও গাজীপুর সিটির ভোট। এরই মধ্যে মেয়র প্রার্থীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তারা বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন; গণসংযোগ করছেন; শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মূল ফ্যাক্টর হবে তরুণ ভোটাররা। এ নির্বাচনে ভোটার তালিকায় যুক্ত হওয়া ৫২ হাজার ৫২৭ তরুণ ভোটারের হাতেই আগামী দিনের নগরপিতার ক্ষমতার চাবি বলে মনে করছেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তারাই কেসিসি ভোটের ফলে মূল ভূমিকা পালন করবেন। তরুণরা আগামীর সিসিকে কেমন দেখতে চান, সেই অনুযায়ী নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। সে হিসেবে নতুন ভোটাররা অনেক বেশি সচেতন হবেন। আর এই ভোটারদের কাছে টানতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী তালুদার আবদুল খালেক, বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু। নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলোচনা ও বর্ধিতসভা, সমাবেশ এবং উঠোন বৈঠক করছেন তারা।

নগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, এ নির্বাচন নৌকা মার্কার নির্বাচন, জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচন। খুলনাকে উন্নত, পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

অন্যদিকে নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, আমি নির্বাচিত হলে বিদ্যমান ও দৃশ্যমান সমস্যা নিয়ে কাজ করব। নাগরিকদের দেওয়া অর্থের ব্যবহার নিশ্চিত করব।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, এ নির্বাচনে গতবারের নিজেদের ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে বিজয়ী হওয়ার আশা করছেন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম। বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেছেন, দলীয় ঐক্য অটুট রয়েছে। জনগণ ধানের শীষকে বিজয়ী করবে। দলীয় কর্মী সমর্থকরাও তাদের নিজেদের পক্ষে ঐক্য আরো জোরালো করে নিজেদের দলের প্রার্থীকে বিজয়ী করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হতে দলীয় কর্মপন্থা নির্ধারণ ও ভোটারদের মন জয়ে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। এছাড়া একই দলের মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের রাগ, ক্ষোভ ও অভিমান মিটিয়ে নৌকা ও ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম দলীয় গতবার নির্বাচনে দলীয় ব্যর্থতাকে দূরে সরিয়ে নৌকাকে বিজয়ী করার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করেছেন।

বিএনপির প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কারান্তরীণ। নেতাকর্মীরা নির্যাতিত ও ব্যথিত। আমরা ঐক্যবদ্ধ আছি।

হলফনামা : সম্পদে এগিয়ে খালেক, মঞ্জুর কাঁধে মামলা : খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে কোটিপতি তালুকদার আবদুল খালেকের সঙ্গে ভোটের লড়াই হবে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর। সম্পদে অনেক এগিয়ে সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ মনোনীত খালেক আর মামলার বোঝা কাঁধে বিএনপির মঞ্জুর। বার্ষিক আয়ও বেশি খালেকের। স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষিত এই দুই রাজনীতিক। মেয়র প্রার্থী হিসেবে পাঁচজন মনোনয়ন দাখিল করেছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে খালেক-মঞ্জুর মধ্যেই।

তালুকদার আবদুল খালেক : হলফনামায় পেশা হিসেবে মৎস্য ঘের ব্যবসা দেখিয়েছেন সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক। তার নগদ টাকা রয়েছে ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৭৫০ টাকা ও স্ত্রীর ২ কোটি ১৫ লাখ ৫৬ হাজার ৭৯৪ টাকা। নিজের নামে তিনটি ব্যাংকে জমা রয়েছে দুই কোটি ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৬১৬ টাকা আর স্ত্রীর নামে দুটি ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ২০ লাখ ৪৪ হাজার ৭০৪ টাকা। এছাড়া এসবিএসি ব্যাংকের শেয়ার রয়েছে ২ কোটি টাকার। তাছাড়া সঞ্চয়পত্র ১০ লাখ টাকার এবং স্ত্রীর ৪৫ লাখ টাকার, এফডিআর ১০ লাখ টাকার ও স্ত্রীর ১৬ লাখ ৯৪ হাজার ৯৪৯ টাকা, পোস্টাল এফডিআর ১৮ লাখ টাকার। স্বামী-স্ত্রীর গাড়ি রয়েছে মোট তিনটি। স্থাবর সম্পদের মধ্যে পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত কৃষিজমি রয়েছে ২৩ বিঘা, অকৃষি জমি ও পাঁচতলা বাড়ির অংশবিশেষ রয়েছে তার। এছাড়া মৎস্য ঘেরে বিনিয়োগ রয়েছে এক কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৯০০ টাকার। বার্ষিক কৃষিখাতেই তার আয় এক লাখ ৩০ হাজার টাকা, মৎস্য ঘেরে আয় ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৩০০ টাকা, ব্যাংক সুদ ৮ লাখ ৫১ হাজার ৫৮০ টাকা। তাছাড়া সংসদ সদস্য হিসেবে পারিতোষিক ও প্রাপ্তভাতায় আয় হয়েছে বার্ষিক ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৭৫ টাকা। কোনো মামলায় অভিযুক্ত না হলেও নয়টি মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে, যার মধ্যে ইতোমধ্যে সবকটিতেই অব্যাহতি ও খালাসপ্রাপ্ত হন তিনি। নগরীর ৩৩ নং মুন্সীপাড়া ৩য় গলির বাসাটি বর্তমান ঠিকানা দেখালেও বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মল্লিকের বেড় নিজ জন্মস্থানকে স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, ২০১৩ সালের ১৬ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তালুকদার আবদুল খালেকের হলফনামা ছিল মেয়র থাকাবস্থায় নিজের আয় ১৭১ গুণ ও সম্পদ প্রায় ৪ গুণ বেড়েছিল। এ সময় তার স্ত্রী ও তার ওপর নির্ভরশীলদের আয় এবং সম্পদও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তখন তালুকদার খালেকের আয় ছিল ৪ কোটি ৬২ লাখ ৫৫ হাজার ৬০০ টাকা। যদিও ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় তার বার্ষিক আয় ছিল ২ লাখ ৭০ হাজার।

নজরুল ইসলাম মঞ্জু : হলফনামায় পেশা হিসেবে ব্যবসা দেখিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু, তবে তাও আবার বন্ধ। এখন বাড়িভাড়া আয়ের উৎস। এখান থেকে তার বার্ষিক আয় হয় ২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। আর তার ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় ২ লাখ ৮২ হাজার টাকা।

মনোনয়ন দাখিল পর্যন্ত নজরুল ইসলাম মঞ্জুর অস্থাবর সম্পদ নগদ টাকা ৩ লাখ টাকা, বৈদেশিক মুদ্রা (ডলার) ৮৯০। তার স্ত্রীর নগদ ২ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রা ১৭ হাজার ৪৫৪.৩২। এছাড়া একটি টয়োটা জিপ (মোটর গাড়ি), ইলেকট্রনিক সামগ্রীর মধ্যে একটি টিভি ও একটি ফ্রিজ। আসবাবপত্রের মধ্যে ২টি সোফাসেট ও ২টা আলমারি। তার স্ত্রীর ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার রয়েছে। আর স্থাবর সম্পদের মধ্যে তার স্ত্রীর দশমিক ০১৪৩৪৫ একর অকৃষি জমি রয়েছে। আর যৌথ মালিকানায় দশমিক ০৬৫০। এর মধ্যে তার অংশ ২/৭। যৌথ মালিকানায় ৪ তলা বিশিষ্ট দালান রয়েছে। এটিতে তার অংশ ২/৭।

দায়-দেনা : বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন খুলনা অফিস থেকে তার বাবা আবদুল হালিম ৭৮৪ (মা.) ঋণ কেসে ৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। তার (বাবা) মৃত্যুর পর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা হচ্ছে। মোট ৩ লাখ ৮৫ হাজার ২৭১ দশমিক ৩৯ টাকা। তার বিরুদ্ধে ৪টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এছাড়া খুলনা থানায় তার বিরুদ্ধে দায়ের করা আগের তিন মামলার একটিতে অব্যাহতি পেয়েছেন। আর দুটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহীত হয়েছে।

অপরদিকে, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকালে তার হলফনামায় তিনি পেশায় উল্লেখ করেছিলেন বিবিধমালের ব্যবসা। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর বার্ষিক বেতন ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪০০ টাকা। আর অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ ছিল ৬ লাখ টাকা। জনতা ব্যাংকে চলতি হিসাবে ছিল ১০৯২ টাকা, রূপালী স্টক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডে শেয়ার ৯ হাজার টাকা, খুলনা দেশ করপোরেশনে বিনিয়োগ ছিল ৫০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর ২০ তোলা স্বর্ণ। ৭০ হাজার টাকা মূল্যের ইলেকট্রনিক সামগ্রী ছিল। এছাড়া ১ লাখ ২২ হাজার টাকা মূল্যের আসবাবপত্র ছিল। সেই সময়ে দায়-দেনার তিনি বাবার (এইচবিপিসি) ২ লাখ ৭৩ হাজার ২২৯ দশমিক ০৫ টাকা এবং জামানাত বিহীন ঋণ ছিল ১৬ হাজার টাকা। তখন তিনি তার আত্মীয়-স্বজন তাকে স্বেচ্ছায় প্রণোতিতভাবে দিয়েছিলেন সম্ভাব্য ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। বার্ষিক আয় ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আর ব্যয় ছিল ১ লাখ টাকা।

 

"