কোটা সংস্কার আন্দোলনে স্থবির রাজধানী

* শিক্ষকদের একাত্মতা * বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ

প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের চতুর্থ দিনে গতকাল বুধবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভের কারণে প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী। বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের খবর আসে ঢাকার বাইরে থেকেও। সকাল থেকে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন। কোটা সংস্কারের দাবিতে তারা মিছিল করেন। প্লাকার্ড, ব্যানার হাতে স্লোগান দেন। এদিকে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে তাতে সমর্থন জানিয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন ঢাকা ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামন ও মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান। এছাড়া আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও বাকৃবি শিক্ষক সমিতি।

ঢাকায় সকাল ১০টার পর থেকে পান্থপথ, তেজগাঁও, ফার্মগেট, মিরপুর রোডসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তাঁতীবাজারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অবরোধ করেন। এছাড়া গ্রিন রোড, আগারগাঁও, ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের পূর্ব-পশ্চিম, মিরপুর-১০, কুড়িল বিশ্বরোডে অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ফার্মগেট এলাকায় এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেন। তারা পান্থপথ সিগন্যাল মোড়ে বিক্ষোভ করছেন। দুপুর পৌনে ১২টার দিকে এই মোড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। এ সময় গ্রিন রোড, পান্থপথ ও ফার্মগেট এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এছাড়া খামারবাড়ির সামনের সড়কেও পুলিশ ব্যারিকেড দিয়েছে।

ধানমন্ডিতে সকাল সোয়া ১০টার দিকে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রাপা প্লাজার মোড়ে অবস্থান নেন। বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে তারা সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ কারণে লালমাটিয়ায় আড়ং মোড়ে পুলিশ ব্যারিকেড বসিয়ে যানবাহন ঘুরিয়ে দেয়। এদিকে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ), আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এআইইউবি) ও ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির (আইইউবি) শিক্ষার্থীরা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার গেটে অবস্থান নেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থীরা। এতে কুড়িল বিশ্বরোড থেকে রামপুরা পর্যন্ত সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : টানা চতুর্থ দিনের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সমবেত হয় সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের আন্দোলন চালিয়ে আসা শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা। শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের নিচে জড়ো হতে শুরু করেন সকাল ৯টার দিকে। সকাল ১০টার দিকে ওই জমায়েত জন¯্রােতের রূপ পায়। সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের কেন্দ্রীয় পাঠাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান বলেন, কোটা কমানোর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং সড়ক অবরোধের কর্মসূচি চলবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এতে ওই সড়কের দুই দিকেই শত শত গাড়ি আটকা পড়ে। অবরোধ শুরুর প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশ দেখা গেলেও পরে আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাউকে দেখা যায়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : শাটল ট্রেন অবরোধ করে রাখেন শিক্ষার্থীরা। ষোলোশহর স্টেশন মাস্টার এস এম শাহাবুদ্দিন বলেন, আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভের মুখে ট্রেন চলাচল আপাতত বন্ধ। কোটা সংস্কারের দাবিতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী ট্রেন অবরোধ করেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) : ক্লাস বর্জন করে শিববাড়ি মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়। এর আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের হাদি চত্বরে সমাবেশ হয়। বেলা ১১টার দিকে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা, ঢোল, গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ময়লাপোতা মোড়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। এতে শহরের যান চলাচল অচল হয়ে যায়। সেখানে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ বেকার তরুণ-তরুণীরাও যোগ দেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) : ক্লাস বর্জন করে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেছে শিক্ষার্থীরা। এতে যান চালাচল বিঘিœত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, বেলা ১১টা থেকে রুয়েটের প্রধান ফটকে রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় : কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টা থেকে কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়ক অবরোধ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা রাস্তা অবরোধ করে রেখেছে। তাদের বুঝিয়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তারা শুনছে না।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নেন।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি, ময়মনসিংহ) : ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে শিক্ষার্থীরা মুক্তমঞ্চের সামনে বিক্ষোভ করেন। পরে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করেন। এতে ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন স্টেশনসহ আশপাশের এলাকায় আটকা পড়ে তিনটি ট্রেন। পরে বাকৃবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. এ এস মাহফুজুল বারি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় : শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক অবরোধের কারণে ঢাকা-বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে বিক্ষোভ শুরু করে। এ সময় শিক্ষার্থীরা সড়কের ওপর গাছ এবং ইট রেখে অবরোধ সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই প্রান্তে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় : বুধবার সকাল থেকে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে পূবালী চত্বরে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ কুমিল্লার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অবস্থানের কারণে নগরীতে যান চলাচল বন্ধ ছিল। এদিকে সকাল থেকেই বিশ^বিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। বেশ কয়েকটি বিভাগের বিভিন্ন পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ : সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন। পরে পুলিশের ব্যারিকেড উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে সদর উপজেলার ঘোনাপাড়ায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে বাঁশ, ব্লক ও ইট ফেলে অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে।

এদিকে আন্দোলন চলাকালীন দুপুর ১টার দিকে কয়েকজন ছুরি, বোমা ও দেশীয় অস্ত্রসহ আন্দোলনকারীদের মধ্যে ঢুকে পড়ে। ভিসি প্রফেসর ড. খোন্দকার নাসিরউদ্দিন বক্তব্য দেওয়ার সময়ে তারা হামলা করতে গেলে শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা পড়ে। পরে দুজনকে পিটুনি দিয়ে পুলিশে দেয় শিক্ষার্থীরা।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর : শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মিছিল এবং দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে ওই সড়ক দিয়ে সকাল ১০টা থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক রুবেল আহমেদ কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দাবি না মানা পর্যন্ত তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টাঙ্গাইল : সংসদে মতিয়া চৌধুরীর ‘কোটা সংস্কারে আন্দোলনকারীরা রাজাকারের বাচ্চা’ বলে মন্তব্য করার প্রতিবাদে মাথায় কালো কাপড় বেঁধে বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই, স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে শিক্ষার্থীরা। মিছিল শেষে বিশ^বিদ্যালয়ের প্রথম গেটে তারা সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করে। এ সময় টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স, ফুড টেকনোলজি অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্স বিভাগসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় : ক্যাম্পাসের জয়বাংলা ভাস্কর্য চত্বরে অবস্থা নিয়ে নানা স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় আন্দোলনরতদের অন্যতম মুখপাত্র রবিউল ইসলাম জানান, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন ইভান, মাজেদুল, রুবেল, আল আমিন, উর্মি, কলি প্রমুখ। এদিকে রাস্তা দখল করে অবস্থান নেওয়ায় পিরতলা বাজার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ( শেকৃবি, ঢাকা) : শিক্ষার্থীরা মিরপুর ১০-ফার্মগেট ও গাবতলী -মহাখালী সড়কের সংযোগস্থলে ( আগারগাঁও মোড়) অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এসময় তারা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাই নাই, কোটা প্রথার সংস্কার এই মুহূর্তে দরকার,আমার দেশ আমার মা বৈষম্য মানি না’ ইত্যাদি স্লোগান দেন।

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ডুয়েট, গাজীপুর) : সকালে ঢাকা-জয়দেবপুর সড়কের শিববাড়ি মোড় এলাকায় অবরোধ করে শিক্ষার্থীরা। এর আগে ডুয়েটের ক্যাম্পাস থেকে মিছিল নিয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিববাড়ি ত্রিমোড়ে জড়ো হয় তারা। এ সময় পুলিশ বাধা দেয়। পরে তারা রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় ওই এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়।

"