কোটা সংস্কার

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট সড়ক অবরোধের ডাক

* রাস্তা আটকে বিক্ষোভ; ভোগান্তি * বিভক্তি ঘুচিয়ে আন্দোলনকারীরা এক জোটে * আন্দোলনে সমর্থন শিক্ষকদের

প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০

ঢাবি প্রতিনিধি

প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা না আসা পর্যন্ত চাকরিতে কোটা সংস্কারের আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। নিজেদের মধ্যে বিভক্তি ঘুচিয়ে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তারা। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করেছেন তারা। একইসঙ্গে তারা প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সারাদেশে সড়ক অবরোধ করার ঘোষণাও দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এ ঘোষণা দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের যুগ্ম-আহ্বায়ক রাশেদ খান। এদিকে, কোটা সংস্কার দাবিতে গতকাল ঢাকায় রাস্তা আটকে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। এতে দুপুর থেকে রামপুরা থেকে বসুন্ধরা পর্যন্ত বীর উত্তম রফিকুল ইসলাম এভিনিউ এবং প্রগতি সরণিতে পাঁচ ঘণ্টা এবং ধানমন্ডির সোবহানবাগ হয়ে মিরপুর রোডে তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েন বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও পথচারীরা। অন্যদিকে, কোটা সংস্কারের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শিক্ষক সমিতি আয়োজিত মানববন্ধনে এ সমর্থন জানান। মাকসুদ কামাল বলেন, ‘কোটা সংস্কারের এ দাবি শিক্ষার্থীদের নৈতিক দাবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা এ নৈতিক দাবিকে পূর্ণ সমর্থন জানাই।’ অন্যদিকে, সরকারের সঙ্গে সমঝোতা ভেঙে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভক্তি ঘুচিয়ে আন্দোলনে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে গড়ে ওঠা ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের পুরনো নেতারা।

তারা বলেছেন, ‘ছাত্রসমাজের’ দাবি এবং কোটা বিষয়ে কৃষি ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে তারা আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। সেই সঙ্গে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, সড়ক অবরোধসহ সব ধরনের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ।

সংবাদ সম্মেলনে রাশেদ বলেন, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ৭ মে পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত থাকবে। কিন্তু জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীদেরসহ ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দিয়েছেন। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।

তিনি বলেন, আমরা কৃষিমন্ত্রীর এ বক্তব্য প্রত্যাহারের জন্য মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি এ বিষয়ে বক্তব্য দেননি। এছাড়া অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন আগামী বাজেটের আগে কোটা সংস্কার করা হবে না। এ কারণে আমরা আবার আমাদের নিয়মিত কর্মসূচিতে ফিরে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, গত সোমবার সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর আমাদের সিদ্ধান্ত আন্দোলনকারীদের একাংশ না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু আজ থেকে আবার আমরা একসঙ্গে আন্দোলনে নামলাম।

রাশেদ বলেন, আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকবে। অনির্দিষ্টকালের জন্য সারা বাংলাদেশের রাস্তা অবরোধ করা হবে।

এ সময় পরিষদের যুগ্ম-সমন্বয়ক নুরুল হক, ফারুক হাসান, মাহফুজুর রাহমানসহ ২০জন প্রতিনিধি দলের সবাই উপস্থিত ছিলেন। তবে আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসান আল মামুনকে সেখানে দেখা যায়নি।

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করেন তারা। দাবিগুলো হলোÑ প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কোটা সংস্কারের বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে, আন্দোলনে আটকদের অবিলম্বে মুক্তি এবং আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

রাজু ভাস্কর্যে অবস্থান নেওয়ার পর স্লোগান ও মিছিল করেন আন্দোলনকারীরা। এর মধ্যে কৃষিমন্ত্রীর কুশপুতুল পোড়ানো হয়। এর আগে বিকেল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসির রাজু ভাস্কর্য অভিমুখে বিভিন্ন দিক থেকে মিছিল এসে জড়ো হতে থাকে। শহীদ মিনার, ফুলার রোড, ভিসি চত্বর, ভিসি অফিসের সামনে দিয়ে সূর্যসেন হল, বিজনেস ফ্যাকাল্টি, কলা ভবন হয়ে টিএসসিতে বেশ কয়েকটি মিছিল জড়ো হয়। সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে প্রতিবাদ সমাবেশে তাদের স্লোগানে কেঁপে উঠে টিএসসি।

প্রসঙ্গত, সোমবার কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের তুলোধুনো করে জাতীয় সংসদে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা সুযোগ পাবে না, রাজাকারের বাচ্চারা সুযোগ পাবে? তাদের জন্য মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংকুচিত হবে?’ পরিষ্কার বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ চলছে, চলবে। রাজাকারের বাচ্চাদের আমরা দেখে নেব।

জাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, শিক্ষকদের সংহতি

জাবি প্রতিনিধি জানান, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) তিন দিনের ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি চলছে। গতকাল মঙ্গলবার কোনো বিভাগেই ক্লাস-পরীক্ষা হয়নি। এমনকি বিভিন্ন বর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষাও স্থগিত ছিল। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতি ঘটনার সঙ্গে জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি দাবি করছে। শিক্ষক সমিতি মনে করে এই কোটা সংস্কার আন্দোলনের যৌক্তিকতা রয়েছে এবং বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার জন্য সমিতি সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছে।

রাবিতে ছাত্রলীগের মহড়া

রাবি প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আন্দোলনকারীরা দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর রাবি শাখা আহ্বায়ক কমিটির সদস্যরা কর্মসূচি স্থগিত করলেও বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বাইক মহড়া দিয়েছেন।

বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ দাবি করে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের নেওয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা বিভক্ত হয়ে পড়েন। এ ঘটনায় ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনুর নেতৃত্বে সংগঠনের নেতাকর্মীরা এলে আন্দোলনকারীদের একাংশ সেখান থেকে সরে যান। অন্যদিকে, বামপন্থিরা আন্দোলনকারীদের একাংশকে নিয়ে সিনেট ভবনের সামনেই থেকে যায়। পরে উভয়পক্ষ পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন করেন।

বেলা দেড়টার দিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনের বিশ্ববিদ্যালয়ের আহ্বায়ক মাসুদ মোন্নাফ বলেন, ‘কেন্দ্রীয় কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী, আমরা এক মাসের জন্য আন্দোলন স্থগিত করেছি। কিন্তু কুচক্রীরা ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল করতে আন্দোলন করছে।

বাম সংগঠনের নেতাকর্মীরা বেলা ২টায় পরিবহন মার্কেটের সামনে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে। তারা নিজেদের ‘সাধারণ শিক্ষার্থী’ বলে দাবি করে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোটা সংস্কারের আন্দোলন করছি। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি অব্যাহত রেখে আজ (বুধবার) বেলা ১১টায় বিক্ষোভ সমাবেশ পালিত হবে।

শাবিপ্রবিতে মানববন্ধন

শাবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানববন্ধ, মৌন মিছিল ও সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৩ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ভবনের সামনে মানববন্ধন হয়। মানববন্ধন শেষে মিছিলটি ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে আবার একই স্থানে সমাবেশে মিলিত হয়।

বশেমুরবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের অবস্থান কর্মসূচি

বশেমুরবিপ্রবি প্রতিনিধি জানান, কোটা পদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে ২য় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সকালে জয় বাংলা চত্বরে সমবেত হয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এ সময় আন্দোলনকারীরা ‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’, ‘পিতা তুমি ফিরে এসো, বৈষম্য দূর করো’সহ নানা স্লোগান দেন।

"