আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তন দেশকে পিছিয়ে দিয়েছে

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই একটি উন্নত দেশে পরিণত হতে পারত যদি ১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনা জাতির জীবনে না আসত।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে তিন বছরের মধ্যেই যখন আমরা স্বল্পোন্নত দেশ হয়েছিলাম। আর পাঁচটি বছর হাতে পেলে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারত। এটি আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ উন্নত হতে পারত। কিন্তু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ৪৭ বছর লেগে গেছে উন্নয়নশীল দেশ হতে। আর যাতে বাংলাদেশ না এগোতে পারে সেজন্যেই ছিল ষড়যন্ত্র। গতকাল রোববার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন এবং জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনাসভায় সভাপতির ভাষণে এ কথা বলেন তিনি।

ষড়যন্ত্রের বিষয়টি ভালোই উপলব্ধি করতে পারেন উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘১৯৭৫ সালের পর ছয় বছর আমাকে শরণার্থী হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছিল। আর যখন ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে রাজনীতি শুরু করিÑপ্রতি পদেই বাধার সম্মুখীন হই। বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় যারা এক সময় আমাদের করুণার চোখে দেখত, আর একটা ঋণ নিতে গেলে একটা প্রকল্প করতে গেলে হাজার রকম শর্ত জুড়ে দিত, আর দুর্নীতি না করলেও দুর্নীতির অপবাদ দিয়ে প্রকল্পের টাকা বন্ধ করে দিত (যেমন পদ্মা সেতু), তারা আর এটা করতে পারবে না। সেই সাহস আর পাবে না।’

তিনি বলেন, ‘আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশ ঋণ পেতে আর সমস্যা হবে না, হয়তো একটু সুদ বেশি দিতে হবে। তাতে কিছু আসে যায় না। ওইটুক আমরা দিতে পারি।’ মানুষের জন্য আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করলে যে দেশের উন্নযন করা যায় এটি সরকার প্রমাণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলাম বলেই আজকে উন্নয়নের ছোঁয়াটা মানুষ পাচ্ছে। যদি আমরা ক্ষমতায় না আসতে পারতাম, তাহলে ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াতের মতো আমাদের উন্নয়ন অর্জনগুলো আবার নষ্ট করে দিত’- বলেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতীয় সংসদের উপনেতা এবং আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, আবদুল মতিন খসরু, এম এ মান্নান ও দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, শিল্পী হাশেম খান এবং সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন আলোচনাসভায় বক্তব্য দেন। দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন।

বেসরকারি মেডিক্যালে শিক্ষার মানে নজর দেওয়ার তাগিদ প্রধানমন্ত্রীর : বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার মানের দিকে নজর দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি চিকিৎসক ও নার্সদের উদ্দেশে বলেছেন, আমাদের প্রাইভেট সেক্টর এগিয়ে আসছে। সেখানেও তারা মেডিক্যাল কলেজ করছে। তবে সেখানে আমি বলব, আরেকটু নজর দেওয়ার দরকার যে, তাদের শিক্ষার মানটা ঠিকমতো আছে কিনা। গতকাল রোববার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে চিকিৎসক ও নার্সদের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ সোসাইটি অফ ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন (বিএসসিসিএম) এবং বাংলাদেশ সোসাইটি অফ ক্রিটিক্যাল কেয়ার নার্সিংয়ের

তৃতীয় এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দেশের খ্যাতিমান চিকিৎসকদের বই লেখার তাগিদ দিয়ে বলেন, আমাদের ভালো ভালো ডাক্তাররা এত নামকরা হয়ে যান কিন্তু বই লেখেন না। লেখাটেখা একটু কম হচ্ছে। মেডিক্যাল সায়েন্স অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। আর এই বই এত দামি কারো পক্ষে তো এভাবে কেনা সম্ভব না। প্রত্যেক মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পাঠাগারের একান্ত প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এজন্য চিকিৎসকদের পেশাজীবী সংগঠনগুলো ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিএসসিসিএমের সভাপতি ইউ এইচ সাহেরা খাতুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য সচিব এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছাড়াও এই সংগঠনের মহাসচিব এ এস এফ আরিফ আহসান বক্তব্য দেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ক্রিটিকন থ্রির সভাপতি মির্জা নাজিমউদ্দিন।

অনুষ্ঠানমঞ্চে উপস্থিত স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, স্বাস্থ্য সচিব সিরাজুল হক খান এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে শেখ হাসিনা বলেন, এ ব্যাপারে আপনাদের আরো একটু দৃষ্টি দিতে হবে। ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট এবং ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভিজিটর কর্নার করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এখন তো ডিজিটাল যুগ। দরকার হলে মনিটরে রোগী দেখবে অথবা গ্লাস দেওয়া থাকবে। গ্লাসের বাইরে থেকে দেখবেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার ভোট বাড়ল কিনা, সেটা নিয়ে আমরা চিন্তা না। রোগী বাঁচল কিনা সেটা নিয়ে আমরা চিন্তা। রাজনৈতিক নেতারা আর রোগীর আত্মীয়স্বজনদের বলব, রোগী বাঁচাতে চাইলে চিকিৎসাটা ভালোভাবে করতে দিতে হবে।

যুগোপযোগী স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন এবং গত ৯ বছরে ১২ হাজার ৭২৮ জন সহকারী সার্জন এবং ১১৮ জন ডেন্টাল সার্জন, মাঠ পর্যায়ে ১৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ও প্রায় সাড়ে ১২ হাজার নার্স নিয়োগ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কিন্তু ডাক্তারের অভাব। একজন ডাক্তারকে এত রোগী দেখতে হয় যে, এটা আসলে মানুষের পক্ষে সম্ভব কিনা। রোগীর তো আসলে মুখের কথায় অর্ধেক রোগ ভালো হয়ে যেতে পারে; এটা হলো বাস্তব কথাÑ তাদের ভেতরে একটা কনফিডেন্স এনে দেওয়া।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুর সফরে সে দেশের সরকার প্রধানের সঙ্গে উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে কথা হয়েছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ডাক্তারদের ট্রেনিং অবশ্যই দরকার।

হাসপাতালগুলোর ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে দর্শনার্থীর বিষয়ে চিকিৎসকদের আরো শক্ত হতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের ভিজিটরের সমস্যা; এখানে আমি দুইটি জিনিস দেখি- একটি হচ্ছে, কোনো রোগী হলে তার ভিজিটার যেতেই হবে। ভিজিটর না গেলে রোগীরও মন খারাপ হয়। খুব ক্রিটিক্যাল রোগী, সে কিছু বুঝতেই পারছে না তারপরও যেতে হবে। আরেকটি হচ্ছে, আমরা যারা রাজনীতি করি, আমাদের রাজনৈতিক নেতারা রোগী হলে তাকে দেখতে যেতে হবে। না গেলে নাকি প্রধানমন্ত্রীর ইজ্জত থাকে না। আবার রোগীরও ইজ্জত থাকে না, এই ধরনের রোগীদের দেখতে চাই না।

এ সময় অযথা দর্শনার্থীদের প্রবেশের বিষয়ে চিকিৎসকদের আরো শক্ত হতে পরামর্শ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জায়গাটায় আপনাদের কড়াকড়ি করতে হবে। আমি বলব, এই ব্যাপারে ক্রিটিক্যাল কেয়ারের ডাক্তারদের আরো হার্শ হতে হবে, শক্ত হতে হবে, বাধা দিতে হবে। আজকে তো আমি বলে গেলাম। আমার নাম ভাঙায়েন। কোনো অসুবিধা নেই।

নিমতলী অগ্নিকা- এবং ২০১৫ সালে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পেট্রোলবোমা নিক্ষেপে অগ্নিদগ্ধদের দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাকে খুব খাতির করে বলে, ‘আসেন আপনি ভেতরে আসেন। কিছু হবে না-হাত পরিষ্কার করে’। তারপর আমি নিজেই যাওয়া বন্ধ করলাম। বললাম, না আমি গ্লাস দিয়ে দেখব। গ্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে আমি দেখলাম।

ক্যামেরাম্যানরা খুব নাখোশ, ছবি নিতে পারছে না। কারণ রোগী থাকবে, রোগীর কাছে যাব। রোগীর বেডে বসব। তারপর একটা ছবি নেবে। ওই ছবির অনেক মূল্য। কিন্তু রোগীর যে বারোটা বাজে ওটা কিন্তু দেখে না। একটা অবস্থা হয়; অপারশেন থিয়েটারের মধ্যে ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়ে। অপারেশন থিয়েটারের মধ্যে ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে পড়তে হবে কেন?

"