চলে গেলেন সৃষ্টিতত্ত্বের উজ্জ্বল নক্ষত্র স্টিফেন হকিং

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

প্রতিদিনের সংবাদ ডেস্ক

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিদ স্টিভেন হকিং গতকাল বুধবার মারা গেছেন, যাকে বিবেচনা করা হয় আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের ‘উজ্জ্বল নক্ষত্র’ হিসেবে। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। পরিবারের সদস্যদের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে বিবিসি অনলাইন। স্টিফেন হকিং পৃথিবীর সেরা মহাকাশবিজ্ঞানীদের একজন, যার লেখা ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের একটি। মহাবিশ্ব নিয়ে প্রকাশিত তার আরেকটি বই ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন’। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত ছিলেন ব্রিটিশ এই পদার্থবিদ।

লুসি, রবার্ট ও টিম নামে স্টিফেন হকিংয়ের তিন সন্তান। তারা বলেছেন, ‘আমরা গভীর শোকের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমাদের প্রিয় বাবা আজ মারা গেছেন। তিনি বিখ্যাত এক বিজ্ঞানী ছিলেন। তার কাজ দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে।’

স্টিফেন হকিংয়ের সাহস ও অধ্যবসায়ের প্রশংসা করেন তার সন্তানরা। তারা বলেন, হকিংয়ের প্রতিভা এবং রসবোধ বিশ্বব্যাপী মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। একবার তিনি বলেছিলেন, এটা যদি আমাদের ভালোবাসার মানুষগুলোর আবাসভূমি না হতো, তাহলে এটা মহাবিশ্বই হতো না, আমরা তাকে কখনো ভুলব না।

পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্টিফেন হকিংকে। তার জন্ম হয়েছিল ৮ জানুয়ারি ১৯৪২ সালে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে। দুরারোগ্য মোটর নিউরন ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন স্টিফেন হকিং। কিন্তু শারীরিক অক্ষমতা তাকে রুখতে পারেনি। ওই অসুস্থতার কারণেই বাকি জীবন তাকে হুইলচেয়ারে কাটাতে হয়। তার বাকশক্তি প্রায় লোপ পায়। বিশেষভাবে নির্মিত ভয়েস সিন্থেসাইজার দিয়ে কথা বলতে পারতেন তিনি। আইনস্টাইনের পর হকিংকে বিখ্যাত পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

হকিংয়ের বাবা ফ্র্যাঙ্ক হকিং ছিলেন জীববিজ্ঞানের গবেষক। মা ইসাবেল হকিং ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী। বাবা চেয়েছিলেন হকিং বড় হয়ে চিকিৎসক হোক। ছেলেবেলা থেকেই হকিংয়ের আগ্রহ বিজ্ঞান আর গণিতে। এরপরও মহাবিশ্বের অজানা বিষয়গুলো নিয়ে সব সময় উৎসুক ছিলেন তিনি। মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্য বিগ ব্যাং থিওরির প্রবক্তা বলা হয় স্টিফেন হকিংকে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান অধ্যাপক পদ থেকে ২০০৯ সালে অবসর নেন। রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানীয় ফেলো এবং পন্টিফিকাল একাডেমি অব সায়েন্সের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি।

প্রিন্স অব অস্ট্রিয়ান্স পুরস্কার, জুলিয়াস এডগার লিলিয়েনফেল্ড পুরস্কার, উলফ পুরস্কার, কোপলি পদক, এডিংটন পদক, হিউ পদক, আলবার্ট আইনস্টাইন পদকসহ এক ডজনেরও বেশি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। হকিংয়ের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং বোর-হাইজেনবার্গের কোয়ান্টাম তত্ত্বকে মিলিয়ে দেওয়া। আপেক্ষিকতার তত্ত্ব কাজ করে মহাজগতের অতিকায় বস্তু নিয়ে আর কোয়ান্টাম তত্ত্বের বাহাদুরি হচ্ছে ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র জগতে।

কৃষ্ণগহ্বর থেকে শক্তি চুইয়ে বেরিয়ে যায় এবং এর ফলে কৃষ্ণগহ্বর এক সময় হারিয়ে যায় বলে তিনি যে ধারণা দেন, তাই এক সময় হকিং রেডিয়েশন নামে পরিচিতি পায়।

স্যার রজার পেনরোজের সঙ্গে করা যৌথ গবেষণায় তিনি দেখিয়েছিলেন, আইনস্টাইনের দেওয়া আপেক্ষিকতার সাধারণ সূত্রানুসারে স্থান-কালের শুরু বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে এবং এর সমাপ্তি হয় কৃষ্ণগহ্বরে।

তাত্ত্বিক গবেষণার বাইরে এই বিজ্ঞানী সাধারণ মানুষের কাছেও জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি একাধিক টেলিভিশন শোতেও হাজির হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ‘দ্য সিম্পসনস’, ‘রেড ডোয়ার্ফ’ ও ‘দ্য বিগ ব্যাং থিওরি’। এছাড়াও তাকে কেন্দ্র করেও তৈরি হয়েছে একাধিক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও সিনেমা।

স্টিভেন হকিংয়ের প্রয়াণে প্রথম যারা শোক প্রকাশ করেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের জনক স্যার টিম বার্নার্স লি। ‘আমরা এক বিশাল হৃদয় আর বিস্ময়কর আত্মাকে হারিয়েছি। শান্তিতে ঘুমান স্টিভেন হকিং।’ মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সাত্যিয়া নাদেলা বলেন, ‘আমরা মহান একজনকে হারালাম। বিজ্ঞানে অবিশ্বাস্য অবদান আর জটিল তত্ত্ব আর ধারণাকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

‘অসম্ভব যেসব বাধার মুখে তিনি পড়েছেন, তারপরও মহাবিশ্ব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান অর্জনে তার উদ্দীপনা আর সীমাহীন সাধনার জন্যও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

 

"