সংসদীয় আসনের খসড়া প্রকাশ ইসির

৩৮টির সীমানা বদল

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০০ সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই খসড়ায় এবার ৩৮টি আসনের সীমানায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে ঢাকা ও কুমিল্লায়। প্রস্তাবিত ৩৮টি আসনে ভৌগোলিক অখ-তা, প্রশাসনিক এলাকা যোগ ও বিলুপ্ত ছিটমহল যোগ করা হয়েছে। ফলে আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য চলমান দশম সংসদের ২৬২ আসনের সীমানা বহাল থাকল। এই আসন পরিবর্তন চূড়ান্ত হলে বর্তমান অনেক মন্ত্রী-এমপির আসন বদল হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, খসড়া তালিকা নিয়ে কারো কোনো দাবি-আপত্তি থাকলে ১ এপ্রিল বিকেল ৫টা পর্যন্ত আবেদন করতে পারবেন। কমিশন দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তি শেষে ৩০ এপ্রিল সংসদীয় আসনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে বলে জানান তিনি। গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) খান মো. নুরুল হুদার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সভায় সংসদীয় আসনের সীমানার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে সীমানা পুনর্নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

কুমিল্লা-১০ আসন নিয়ে আইনি জটিলতা থাকার কারণে এত দিন সীমানার গেজেট প্রকাশে বিলম্ব হচ্ছিল। তবে সম্প্রতি আপিল বিভাগে কুমিল্লা-১০ আসন-সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় স্থগিত হওয়ার পর খসড়া তালিকা প্রস্তুত করে অনুমোদন দেওয়া হয়।

ইসি প্রকাশিত খসড়া গেজেটে বলা হয়েছে, সীমানা পুনর্নির্ধারণ সংক্রান্ত ১৯৭৬-এর অধ্যাদেশের আওতায় সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছয়টি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতি জেলার বিদ্যমান মোট আসনসংখ্যা অপরিবর্তিত রাখা। প্রশাসনিক ইউনিট বিশেষ করে উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড যথাসম্ভব অখ- রাখা। ইউনিয়ন পরিষদ এবং পৌর এলাকার ওয়ার্ড একাধিক আসনে বিভাজন না করা। নতুন প্রশাসনিক এলাকায় অন্তর্ভুক্ত করা।

বিদ্যমান সীমানায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়ের কারণে নতুন সীমানা নির্ধারণ করা এবং ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং যোগাযোগব্যবস্থা যথাযথ বিবেচনা করা। তবে ইসির প্রকাশিত খসড়া সীমানার তালিকায় এখনো কিছু উপজেলা খ-িত অবস্থায় রয়েছে। এ বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাস্তবতা বিবেচনায় এগুলো একত্রিত করা সম্ভব হয়নি।

গত বছর ১৬ জুলাই ইসি ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সীমানা চূড়ান্তের কথা থাকলেও তা নির্ধারিত সময়ে শেষ করা যায়নি। রোডম্যাপ ঘোষণার সময় সিইসি বলেছিলেন, সীমানা নির্ধারণ নিয়ে তাদের নতুন আইন করার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন আইন প্রণয়ন করা সম্ভব না হওয়ায় বিদ্যমান আইনেই ইসির সাবেক যুগ্ম সচিব বিশ্বাস লুৎফুর রহমানকে পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে সীমানা নির্ধারণের খসড়া প্রকাশ করা হলো। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ইসির সংলাপে অংশ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দশম সংসদের সীমানা বহাল রাখার দাবি করে; অন্যদিকে বিএনপি ২০০৮ সালের আগের সীমানায় ফিরে যাওয়ার দাবি জানিয়েছিল।

ইসির সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০০১ সালের নির্বাচনের সময় ১৯৯৫ সালের সীমানার গেজেট বহাল রাখা হয়েছিল। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচনের আগে বিগত সেনাসমর্থিত নির্বাচন কমিশন ১৩৩ সংসদীয় আসনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিল। এর ফলে গ্রামাঞ্চল থেকে প্রায় ১২টি আসন কর্তন করে জনবসতিপূর্ণ ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রামে যুক্ত করা হয়েছিল। প্রতি আদমশুমারির পর সীমানা পুনর্নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। যেহেতু সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী ২০১৩ সালে সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়, সেহেতু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ৩ জুলাই ৫৩টি আসনে পরিবর্তন আনে বিগত কাজী রকিবউদ্দীন কমিশন। এবার সীমানায় পরিবর্তন না আনলেও সমস্যা হতো না। যেটি ছিল, সেটি বহাল রেখে গেজেট প্রকাশ করলেও আইনগত কোনো সমস্যা ছিল না। যে ৩৮টি আসনে পরিবর্তন আনা হলো, খসড়া অনুযায়ী জলঢাকা উপজেলা নিয়ে নীলফামারী-৩ করা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে কিশোরগঞ্জ উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন। সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে করা হয়েছে নীলফামারী-৪ আসন। বিদ্যমান রংপুর-১ (গংগাচরা) আসনে এবার যুক্ত করা হয়েছে রংপুর সিটির ১ থেকে ৮ নম্বর ওয়ার্ড। রংপুর সদর এবং রংপুর সিটির ১ থেকে ৮নং ওয়ার্ড বাদ দিয়ে রংপুর-৩ আসন করা হয়েছে। আগে রংপুর সদর উপজেলা এবং রংপুর সিটি অন্তর্ভুক্ত এলাকা নিয়ে এই আসন গঠিত হয়েছিল। পীরগাছা ও কাউনিয়া উপজেলা নিয়ে রংপুর-৪ আসন করার প্রস্তাবনা করা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে রংপুর সিটির সংশ্লিষ্ট এলাকাসমূহ। কুড়িগ্রাম-৩ আসনটি উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়ন ব্যতীত এবং চিলমারী উপজেলার অষ্টমীরচর ও নয়ারহাট ইউপি বাদ দিয়ে গঠন করা হয়েছিল। এবার শুধু উলিপুর উপজেলা নিয়ে আসনটি গঠন করা হয়েছে। আর কুড়িগ্রাম-৪ আসনটি করা হয়েছে রৌমারী, রাজিবপুর এবং চিলমারী উপজেলা নিয়ে। সাঁথিয়া উপজেলা নিয়ে পাবনা-১ করা হয়েছে। আগে এই আসনটিতে সাঁথিয়ার সঙ্গে বেড়া উপজেলার পাঁচ ইউপি যুক্ত ছিল। আর পাবনা-২ আসনটি করা হয়েছে সুজানগর ও বেড়া উপজেলা নিয়ে। মাগুরা-১ আসনটি করা হয়েছে মাগুরা সদর এবং শ্রীপুর উপজেলা নিয়ে। বাদ দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার চার ইউপি। মাগুরা-২ আসনটি এবার করা হয়েছে শুধু মহম্মদপুর এবং শাখিলা উপজেলা নিয়ে। এই আসন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে সদর উপজেলার চার ইউপি। খুলনা-৩ আসনটি খুলনা সিটির ১ থেকে ১৫টি ওয়ার্ড এবং দিঘলিয়া উপজেলার আড়ংঘাটা ও যোগীপোল ইউপি নিয়ে গঠন করা হয়েছে। খুলনা-৪ আসনটি দিঘলিয়া উপজেলার আড়ংঘাটা এবং যোগীপোল ইউপি ব্যতীত রুপসা এবং তেরখাদা নিয়ে করা হয়েছে। আগে দিঘলিয়া, রুপসা এবং তেরখাদা উপজেলা নিয়ে আসনটি গঠন করা হয়েছিল।

সাতক্ষীরা-৩ আসনটি আগে আশাশুনি, দেবহাটা এবং কালীগঞ্জ উপজেলার চারটি ইউপি নিয়ে গঠন করা হয়েছিল। এবার শুধু আশাশুনি এবং দেবহাটা উপজেলা নিয়ে এই আসনটি করা হয়েছে। আর আগের চারটি ইউপি যুক্ত করে পুরো কালীগঞ্জ উপজেলা এবং শ্যামনগর নিয়ে সাতক্ষীরা-৪ আসন করা হয়েছে। সরিষাবাড়ী এবং জামালপুর সদরের দুটি ইউপি নিয়ে আগে জামালপুর-৪ আসন করা হয়েছিল। এবার শুধু সরিষাবাড়ী উপজেলা নিয়ে আসনটি করা হয়েছে।

পাশাপাশি জামালাপুর-৫ করা হয়েছে শুধু জামালপুর সদর নিয়ে। বড় ধরনের পরিবর্তন করা হয়েছে ঢাকার পাঁচটি আসনের। শুধু কেরানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে এবার করা হয়েছে ঢাকা-২ আসন। আগে আসনটি ছিল কেরানীগঞ্জের পাঁচটি ইউপি, ঢাকা মেট্রোপলিটন কামরাঙ্গীরচর এবং হাজারীবাগ থানাধীন সুলতানগঞ্জ ইউপি, দক্ষিণ সিটির ৫৫, ৫৬ এবং ৫৭নং ওয়ার্ড এবং সাভারের তিনটি ইউপি। কেরানীগঞ্জের বাকি পাঁচটি ইউপি নিয়ে ছিল ঢাকা-৫ আসন। সাভার উপজেলা নিয়ে দুটি সংসদীয় আসন করা হয়েছে। সাভার উপজেলার সাতটি ইউপি এবং সাভার পৌরসভা নিয়ে এবার ঢাকা-৩ আসনটি করা হয়েছে। ঢাকা-৭ আসনটি আগে দক্ষিণ সিটির ২৩ থেকে ৩৩ পর্যন্ত ওয়ার্ড, ৩৫ এবং ৩৬ ওয়ার্ড নিয়ে। এই আসনটিতে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে ৫৫, ৫৬ এবং ৫৭নং ওয়ার্ড। ঢাকা-১৪ আসনটি উত্তর সিটির ৭ থেকে ১২টি ওয়ার্ড এবং সাভারের কাউন্দিয়া ইউপি নিয়ে গঠন করা হলেও এবার আসনটি থেকে কাউন্দিয়া ইউপি বাদ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-১৯ আসনটি ছিল আমিনবাজার, তেতুলঝোড়া, ভাকুর্তা ও কাউন্দিয়া ইউপি ব্যতীত সাভার উপজেলা নিয়ে। এবার নতুন করে সাভার উপজেলার শিমুলিয়া, ধামসোনা, ইয়ারপুর, আশুলিয়া, পাথালিয়া এবং সাভার ক্যান্টনমেন্ট আসনটি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে পরিবর্তন এনে নতুন করে করা হয়েছে সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১০টি ওয়ার্ড এবং নারায়ণগঞ্জ সদরের আলীরটেক এবং গোগনগর ব্যতীত বাকি ইউপি নিয়ে। আগে ফতুল্লা এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা নিয়ে আসনটি করা হয়েছিল। আর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি সদরের আলীরটেক, গোগনগর ইউপি, বন্দর উপজেলা এবং সিটির ১১ থেকে ২৭ ওয়ার্ড নিয়ে। আগে আসনটি নারায়ণগঞ্জ থানা এবং বন্দর থানা নিয়ে ছিল। নড়িয়া উপজেলা এবং সখিপুর থানা নিয়ে শরীয়তপুর-২ আসনটি ছিল। এবার নতুন করে আসনটি নড়িয়া এবং ভেদরগঞ্জ উপজেলা নিয়ে করা হয়েছে। আর ডামুড্যা, গোসাইরহাট উপজেলা নিয়ে শরীয়তপুর-৩ আসনটি করা হয়েছে। আগে আসনটি ছিল ডামুড্যা, গোসাইরহাট উপজেলা এবং ভেদরগঞ্জ থানা নিয়ে। শুধু কুলাউড়া উপজেলা নিয়ে এবার মৌলভীবাজার-২ আসন গঠন করা হয়েছে। আগে আসনটি ছিল কুলাউড়া এবং কমলগঞ্জের চারটি ইউপি নিয়ে। মৌলভীবাজার-৪ আসনটি শ্রীমঙ্গল এবং কমলগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে। এই আসনটি আগে শ্রীমঙ্গল এবং কমলগঞ্জের চারটি ইউপি ব্যতীত গঠিত হয়েছিল। নবীনগর উপজেলা নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসন গঠন করা হয়েছে। এই আসনটি আগে নবীনগর উপজেলার বড়িকান্দি ও ছলিমগঞ্জ ইউপি বাদে গঠিত হয়েছিল। এবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনটি থেকে বড়িকান্দি ও ছলিমগঞ্জ ইউপি বাদ দিয়ে শুধু বাঞ্ছারামপুর উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে। ঢাকার পর বড় পরিবর্তন এসেছে কুমিল্লার আসনে। জেলার চারটি আসন পরিবর্তন করেছে ইসি। এর মধ্যে কুমিল্লা-১ আসনটি দাউদকান্দি এবং তিতাস উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আগে দাউদকান্দি এবং মেঘনা উপজেলা নিয়ে আসনটি ছিল।

কুমিল্লা-২ আসনটি হোমনা এবং মেঘনা উপজেলা নিয়ে গঠন করা হয়েছে। এই আসনটি হোমনা এবং তিতাস উপজেলা নিয়ে আগে গঠন করা হয়েছিল। কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নিয়ে আগে কুমিল্লা-৬ আসনটি করা হয়। এবার কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা, কুমিল্লা সিটি এবং কুমিল্লা সেনানিবাস নিয়ে আসন গঠন করা হয়েছে।

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ এবং নাঙ্গলকোট উপজেলা নিয়ে এই কুমিল্লা-১০ আসনটি আগে গঠন করা হয়েছিল। এবার আসনটির সঙ্গে লালমাই উপজেলা যুক্ত করা হয়েছে। সুবর্ণচর এবং নোয়াখালী সদর উপজেলা নিয়ে নতুন করে নোয়াখালী-৪ আসনটি করা হয়েছে। পূর্বে এই আসনটি থেকে নোয়াখালী সদরের নেয়াজপুর এবং অশ্বদিয়া ইউপি বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই দুটি ইউপি, কোম্পানীগঞ্জ এবং করিবহাট উপজেলা নিয়ে নোয়াখালী-৫ আসন করা হয়েছিল। এবার করা হয়েছে শুধু কোম্পানীগঞ্জ এবং কবিরহাট উপজেলা নিয়ে নোয়াখালী-৫ আসনটি। শুধু রাংগুনিয়া উপজেলা নিয়ে চট্টগ্রাম-৭ আসনটি করা হয়েছে। আগে এই আসনটির সঙ্গে বোয়ালখালী উপজেলার শ্রীপুর-খরনদ্বীপ ইউপি যুক্ত ছিল। চট্টগ্রাম-৮ আসনটি পুরো বোয়ালখালী উপজেলা এবং চট্টগ্রাম সিটির ১৫ থেকে ২৩ পর্যন্ত ওয়ার্ড এবং ৩১ থেকে ৩৫ পর্যন্ত ওয়ার্ড নিয়ে গঠন করা হয়েছে। আগে এই আসনটিতে থেকে শ্রীপুর-খরনদ্বীপ ইউপি কেটে নেওয়া হয়েছিল।

 

"