নেপালে বিমান বিধ্বস্ত : হাসপাতালে স্বজনদের আর্তনাদ

গাফিলতি কাদের কোথায় ত্রুটি

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে মর্মন্তুদ প্রাণহানির ঘটনায় কাঁদছে দেশ। শোকে মুহ্যমান দেশের মানুষ। নিহত স্বজনের মরদেহ পাওয়ার অপেক্ষা যেন আর ফুরাতে চায় না। থামছে না বেঁচে থাকা স্বজনদের চোখের জল। সেই সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ চিকিৎসাধীন মানুষগুলোর বেঁচে থাকার আর্তি আরো বেশি বেদনাবিধুর করে তুলেছে চারপাশ। সর্বত্র এখন কেবলই কান্না, কেবলই দুঃখ। একসঙ্গে এত মানুষের এমন করুণ মৃত্যুর শোক যেন বইতে পারছে না দেশ।

ইতোমধ্যেই নিহতদের স্মরণে রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি ও সাংগঠনিক নানা পর্যায়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শুরু হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সারা দেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিহতদের স্মরণে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে মোমবাতি প্রজ্বালন করে সর্বস্তরের মানুষ। গতকালও সেখানে নিহতদের বন্ধু-সহকর্মী-স্বজনরা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। স্মরণ করেন চোখের জলে।

বিশেষ করে নেপালের কেএমসি হাসপাতাল ও তার আশপাশ এলাকায় এখন কেবলই কান্না। শোক উদ্বেগে ভারী সেখানকার বাতাস। এই হাসপাতালের মর্গেই রাখা হয়েছে নিহত ৫১ জনের মরদেহ। এদের মধ্যে নিহত ২৬ বাংলাদেশিও রয়েছেন। সে মরদেহ ঘিরে চলছে স্বজনদের আহাজারি। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বলছেন, নিহতদের সবারই শরীরের ৮০-৯০ শতাংশ পুড়ে গেছে। কঠিন হয়ে পড়েছে পরিচয় শনাক্ত করা।

একই সঙ্গে এই হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন রয়েছেন আহতরা। প্রাণে বেঁচে গেলেও হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অনেকে। তাদের বেঁচে থাকার আর্তি আরো বেশি শোকাহত করে তুলছে সবাইকে। বেঁচে থাকলেও এসব মানুষ স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারবেন কি-না সংশয় দেখা দিয়েছে তা নিয়েও। নেপালে বাংলাদেশ দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি অসিত বরণ সরকার সাংবাদিকদের জানান, বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১০ বাংলাদেশি। তাদের সবার অবস্থাই সংকটাপন্ন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী কেএম শাহজাহান কামাল গত মঙ্গলবার হাসপাতালে গিয়ে আহতদের খোঁজখবর নেন। তবে এমন মর্মন্তুদ প্রাণহানির ঘটনা মেনে নিতে পারছে না মানুষ। ঘুরেফিরে প্রশ্ন উঠছে, দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ নিয়ে। কোন প্রেক্ষাপটে ও কাদের গাফিলতিতে এতগুলো মানুষের প্রাণ গেলÑ সে প্রশ্ন যেমন আসছে বারবার; তেমনি দুর্ঘটনা এড়াতে আগেভাগেই উভয় দেশের বিমান কর্তৃপক্ষের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই নিয়ে কথা বলছেন দেশ-বিদেশের বিমান বিশেষজ্ঞরা। দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে।

বিমান বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের (এটিসি) দেওয়া বার্তা নিয়ে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সঠিক করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। সঠিক তথ্য-উপাত্ত পেলে মূল কারণ বোঝা যাবে। বিশেষজ্ঞরা ত্রিভুবন বিমানবন্দরের দুই প্রান্তের সাংকেতিক নাম জিরো টু (০২-দক্ষিণ প্রান্ত) এবং টু জিরো (২০-উত্তর প্রান্ত) নিয়ে যেমন বিভ্রান্তির শঙ্কা দেখছেন; তেমনি বার্তার আগেই বিমানে কোনো যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিয়েছিল কি না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করছেন। পাশাপাশি বিধ্বস্ত বিমানের নিহত ক্যাপ্টেন আবিদের যোগ্যতা নিয়ে অতটা প্রশ্ন না উঠলেও অনীহা সত্ত্বেও তাকে জোর করে বিমান নিয়ে পাঠানোর যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রশ্নও চলে আসছে সামনে। এমনকি এই দুর্ঘটনার আগে একই বিমানের দেশের অভ্যন্তরে আরো দু’বার দুর্ঘটনার মুখে পড়া ও বিমানটি ১৭ বছরের পুরনো এবং ফিটনেস নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে; সে দিকটাও গুরুত্ব দিতে বলছেন অনেকে। তারা এমনও বলছেন, দুর্ঘটনাপ্রবণ ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কারণ এ ধরনের বিমানবন্দরে যতটুকু নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা দরকার, তা ছিল কি নাÑ সেটিও দেখতে হবে।

অবশ্য দুর্ঘটনার পর পরস্পরকে দায়ী করে বক্তব্য দিয়েছে ত্রিভুবন বিমানবন্দর ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ। ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, পাইলট নির্দেশনার উল্টো দিক দিয়ে উড়োজাহাজটি নামাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে ওই বিমানবন্দরের মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রী তাদের কোনো ত্রুটি ছিল না উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে বলেন, নেপালের এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ থেকে তাদের ভুল বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ যে বক্তব্য দিয়েছে, আমরা তা প্রত্যাখ্যান করছি। উড়োজাহাজটিকে দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে নামার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি উত্তর প্রান্ত দিয়ে নামে। তিনি এমনও বলেন, ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কর্মীরা আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা পাইলটদের সঙ্গে বারবারই যোগাযোগ করে তাদের সঠিক দিক দিয়েই নামতে বলেছিলেন।

এমনকি নেপালের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ দাবিও করেছে, তাদের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে কোন ভুল বার্তা দেওয়া হয়নি। আবহাওয়া ছিল পরিষ্কার। পাইলটদের দৃষ্টিসীমা ছিল অন্তত পাঁচ কিলোমিটার। পাইলটরা নিশ্চিত করেছিলেন যে তারা রানওয়ে দেখতে পাচ্ছেন। এ ব্যাপারে তাদের কাছে প্রমাণও রয়েছে। কিন্তু ইউএস-বাংলার পাইলটরা তাদের নির্দেশ মানছিলেন না। অবতরণের সময়েই উড়োজাহাজটিকে নিয়ন্ত্রণহীন দেখা গেছে। একদিকে কাত হয়ে ছিল। ক্রুদের অস্বাভাবিক আচরণ প্রত্যক্ষ করার পর সব উড়োজাহাজের উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ত্রিভুবন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, পাইলটের কোনো দোষ ছিল না। বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের (এটিসি) বিভ্রান্তিকর বার্তার কারণে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হতে পারে। এ ব্যাপারে ইউএস-বাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আসিফ ইমরান বলেন, এটিসি ভুল বার্তা দিয়েছিল। নিহত পাইলট আবিদ এর আগে একই মডেলের ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের বিমান ১ হাজার ৭০০ ঘণ্টা পরিচালনা করেছেন। তিনি ৫ হাজার ঘণ্টার ওপরে বিভিন্ন উড়োজাহাজে কাজ করেছেন। কাঠমান্ডু বিমানবন্দরেই তিনি শতাধিকবার যাতায়াত করেছেন। এ ব্যাপারে তাদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ রয়েছে বলে দাবি করেছে ইউএস-বাংলা।

এই নিয়ে বিবিসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিভিন্ন দেশের বিমান বিশেষজ্ঞরা কথা বলেছেন। তাদের মতে, বিধ্বস্ত হওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার নয়। তবে রেকর্ডিং শুনে মনে হয়, একমাত্র রানওয়েটির কোন প্রান্ত দিয়ে উড়োজাহাজটি অবতরণ করবে, সেটি নিয়ে একটা ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। এ ব্যাপারে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের পাইলট ক্যাপ্টেন পবনদ্বীপ সিং বিবিসিকে জানান, তার মানে হয়েছে পাইলট ‘ভিজ্যুয়াল ল্যান্ডিংয়ের’ চেষ্টা করছিলেন। সাধারণত উড়োজাহাজ অবতরণের ক্ষেত্রে পাইলটরা ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম (আইএলএস) ব্যবহার করেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে যখন রানওয়ে পাইলটের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকে, তখন ভিজ্যুয়াল ল্যান্ডিংও (ম্যানুয়ালি) অনুমোদিত। কিন্তু কাঠমান্ডুর মতো বিমানবন্দরে ভিজ্যুয়াল অবতরণ খুবই ঝামেলাপূর্ণ।

প্রশ্ন উঠেছে বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটির ফিটনেস নিয়েও। সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, উড়েজাহাজটি ছিল ১৭ বছরেরও বেশি পুরনো। বেশ কয়েকবার হাতবদল হয়ে এসেছে ইউএস-বাংলার হাতে। এর ফিটনেস ছিল না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এর আগে আরো দু’বার এই একই বিমান দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিল। অবশ্য ইউএস-বাংলা ড্যাশ মডেলের এয়ারক্রাফটটি ঢাকা ছাড়ার আগে ওড়ার সম্পূর্ণ উপযোগী ছিল বলে দাবি করেছেন সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (সিএএবি) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম নাইম হাসান। তিনি বলেন, এয়ারক্রাফটটি ওড়ার আগে নিরাপত্তার সব প্রক্রিয়া আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি। দুর্ঘটনাকবলিত এয়ারক্রাফটটির ব্ল্যাকবক্স নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান কানাডার বোমবারডিয়ারে পাঠানো হবে। ব্ল্যাকবক্স ডিকোডিংয়ের পরে আমরা বলতে পারব, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার পেছনে যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, নাকি মানুষের ভুল ছিল।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, উড়োজাহাজের বয়সের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। যত পুরনো হবে, তত বেশি নজরদারি বাড়াতে হবে। কারণ বয়সের সঙ্গে বাড়ে ঝুঁকিও। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন নাসিমুল হক বলেন, কাঠমান্ডু এটিসি (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল) টাওয়ারের সঙ্গে ইউএস-বাংলার ক্যাপ্টেনের কথোপকথনে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি ছিল। তবে এটা কোন পক্ষের তা তদন্ত ছাড়া বলা যাচ্ছে না।

কী ধরনের ও কেমন তদন্ত দরকারÑ জানতে চাইলে বিশ্লেষকরা বলেন, তদন্তে দেশের সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এক্সপার্টদেরও যুক্ত করা যেতে পারে। ব্ল্যাক বক্সের তথ্যসহ প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা থেকেও অনেক কিছু জানা যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়োজাহাজে থাকা ব্ল্যাক বক্সে ককপিটের যাবতীয় কথাবার্তা ও উড়োজাহাজের কারিগরি তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রেকর্ড হয়ে থাকে। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার কারণ জানতে এখন নির্ভর করতে হচ্ছে এটির ওপর। এতে রক্ষিত ডাটা ও অডিও ভাষ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে জানা যাবে দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ। ইতোমধ্যেই ওই ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার করা হয়েছে। সেটি কানাডায় পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান মন্ত্রী।

 

"