গোটা শহর জ্বলছে দ্রোহের আগুনে

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

ঢাকার রাজপথ তখন উত্তাল। মোড়ে মোড়ে বসেছে চেকপোস্ট। সম্পদ পাচার বা সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহ ঠেকাতে সতর্ক প্রহরা বাঙালির। চলছে শোভাযাত্রা, মিছিল। সামরিক আইনের ১১৫ ধারা জারির প্রতিবাদে নতুন করে বিক্ষোভে জ্বলছে বেসরকারি কর্মচারীরা। গোটা শহর জ্বলছে দ্রোহের আগুনে। এলো ১৪ মার্চ। জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ৪ দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে একাত্তরের এই দিনেই ঢাকার পথে নেমে আসে বিক্ষুব্ধ জনতা। সভা-সমাবেশ ও শোভাযাত্রা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ছাত্র-শ্রমিক-পেশাজীবী সংগঠন এবং যুব মহিলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। বৈঠা হাতে রাজপথে নামে মাঝি-মাল্লারা।

জাতীয় শ্রমিক লীগ কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ প্রতিটি শ্রমিক এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন ও বাহিনীর সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ প্রদানের নির্দেশ দেয়।

সকালে বঙ্গবন্ধু তার ধানমন্ডির বাসভবনে প্রায় দেড় ঘণ্টা বৈঠক করেন ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে। রুদ্ধদ্বার বৈঠকে প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও জাতীয় পরিষদের আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির উপনেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম কামরুজ্জামান ও ওয়ালী ন্যাপের কেন্দ্রীয় নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বঙ্গবন্ধু বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা এলে আমি তার সঙ্গে কথা বলতে রাজি আছি।

তবে করাচির নিশাত পার্কে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় জুলফিকার আলী ভুট্টো স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক।

পূর্ব পাকিস্তানের জন্য খাদ্যশস্যবাহী ‘মন্টেসেলো ভিক্টরি’ নামে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর থেকে করাচি নিয়ে যাওয়া হয়। ‘ওসান এন্ডুরাস’ নামের সমরাস্ত্রবাহী আরেকটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরের ১০নং জেটিতে নোঙর করে। বন্দর শ্রমিকদের অসহযোগিতার কারণে ৯ মার্চ ১৬নং জেটিতে নোঙর করা সমরাস্ত্রবাহী অপর জাহাজ ‘সোয়াত’-এর সমরাস্ত্র খালাসের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় কর্তৃপক্ষ।

১২ মার্চ জারি করা সামরিক নির্দেশের প্রতিবাদে দেশরক্ষা বিভাগের বেসামরিক কর্মচারীরা নগরীতে বিক্ষোভ করেন এবং বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে তার সঙ্গে দেখা করে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি ও কর্মস্থল বর্জনের ঘোষণা দেন।

রাতে এক বিবৃতিতে স্বাধীনতার দাবিতে চলমান অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত রাখতে বাঙালির প্রতি নতুন নির্দেশ দেন বঙ্গবন্ধু। পৃথক এক বিবৃতিতে সংগ্রাম পরিষদের নেতা নুরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন বর্তমানে ছুটিতে থাকা কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালি কর্মচারীদের পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত না গিয়ে নিজ নিজ এলাকার সংগ্রাম পরিষদে যোগ দিতে অনুরোধ জানান।

সংবাদপত্র প্রেস কর্মচারী ফেডারেশন বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে সমাবেশ করে ও বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে আসে। লালবাগ বালুর মাঠে এক ছাত্র-জনসভা করে ছাত্রলীগ।

ডিআইটি ভবন প্রাঙ্গণে টিভি নাট্যশিল্পীদের সমাবেশ থেকে অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করা হয়।

বাংলা একাডেমিতে এক সমাবেশে লেখক সংগ্রাম শিবির নাম একটি কমিটি করে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা।

ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ) বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণের জনসভা থেকে দেশের ৭ কোটি জনতাকে সৈনিক হিসেবে সংগ্রামে অংশ নিতে আহ্বান জানায়।

সদরঘাটে জনসমাবেশ করে ফরোয়ার্ড স্টুডেন্টস ব্লক। সন্ধ্যায় পল্টন ময়দানে কথাশিল্পী সম্প্রদায় কবিতা পাঠ ও গণসংগীতের আসর বসায়। বাংলা জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বরিশালে এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠনের আহ্বান জানান। দেশের পত্রিকাগুলোতেও আন্দোলনকে সমর্থন করে সম্পাদকীয় লেখা চলতে থাকে।

 

"