কার দোষে দুর্ঘটনা : মর্মন্তুদ মৃত্যু

এ শোক রাখব কোথায়

প্রকাশ : ১৪ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

শোকে স্তব্ধ গোটা দেশ। শোক বইছে নেপালেও। স্বজনদের হারিয়ে শোকবিহ্বল দুই দেশ ও দেশের মানুষ। কত স্বপ্নের ফুল ঝরে গেল অকস্মাৎ। কত সংসার থেমে গেলে মুহূর্তেই। কত সৃজনশীলতা, রোদ্দুজ্জ্বল আগামী, কত সম্ভাবনা বিনষ্ট হলো অকালেই। ছাইভস্ম দেহ বাতাসে ওড়াল কত সোনালি ডানার চিল। হারানো স্বজনদের ঘরে, বন্ধুর মনে, কর্মস্থলে, পথেঘাটে এখন কেবলই মৃত্যুবারতা। আনন্দ নেই। শান্তি নেই। কেবলই কান্না দুঃখ।

কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে সারিবদ্ধভাবে রাখা স্বজনদের অগ্নিদগ্ধ লাশ। তাদের ঘিরে স্বজনদের গগনবিদারী চিৎকার ভারী করে তুলছে বাতাস। সে দৃশ্য কাঁদায় সবাইকে। বেদনায় ঢেউ আছড়ে পড়েছে দুই দেশে, সর্বত্র। অগ্নিদগ্ধ শরীর নিয়ে হাসপাতালে যারা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন, শঙ্কা তাদের ঘিরেও। বাঁচবে তোÑ এমন উদ্বেগ ভিজিয়ে তুলছে চোখ। বিশেষ করে আজ বা আগামীকাল যখন সারি সারি লাশগুলো ফিরবে দেশে; স্বজনের লাশ ও শোকের সে ভার বইবে কী করে স্বজন, স্বদেশ! এ শোক দেশ রাখবে কোথায়!

গত সোমবার বাংলাদেশের ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি বিমান নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়ে নারী-শিশুসহ অর্ধ শতাধিক মানুষের করুণ মৃত্যু হয়। বিমানটিতে ৭১ জন আরোহীর মধ্যে ৬৭ জন ছিল যাত্রী, বাকি চারজন ক্রু। পাইলট-ক্রুসহ আরোহীদের ৩৬ জন বাংলাদেশি, ৩৩ জন নেপালের এবং একজন করে যাত্রী ছিল চীন ও মালদ্বীপের। ৩৬ বাংলাদেশির মধ্যে ৯ জন কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ২৫ জন বেঁচে নেই। বাকি দুজন নিখোঁজ রয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশে এর আগেও বিমান বিধ্বস্ত, নৌ ও সড়ক পথে দুর্ঘটনা, পাহাড়ধস, আইলাসহ নানা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে মর্মন্তুদ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। মাঝে মধ্যেই ঘটছে। কিন্তু নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় সোমবারে অর্ধশতাধিক মানুষের মর্মন্তুদ মৃত্যু বিশেষভাবে শোকাহত করেছে দেশকে। এ মৃত্যুযাত্রায় সরকারি মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা যেমন রয়েছেন; তেমনি সাংবাদিক, আলোকচিত্রী, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক কর্মী, ক্যাপ্টেন, ক্রু থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের সৃজনশীল মানুষের সংখ্যাও অনেক। হাতের মেহেদি শুকায়নি এমন নতুন দম্পতি যেমন আছেন; তেমনি স্বামী, স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানসহ পুরো পরিবারের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। সম্ভাবনাময় তরুণ মেধার বিনাশ ঘটেছে। নিহতের অধিকাংশই নানাজনের সঙ্গে নানাভাবে পরিচিত ও ব্যাপক জনপ্রিয়। নানা বন্ধনে বাঁধা একে অন্যের সঙ্গে। কেউ আত্মীয়, বন্ধু, কেউবা সহকর্মী। কাজে, আড্ডায়, রাজনীতি, আন্দোলনে কিংবা পেশাগত কাজে নিহতদের সঙ্গে নানা স্মৃতি সবার। রয়েছে নানা মুহূর্তের আনন্দযাপন নানা ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নানা মাধ্যমে উদ্ভাসিত সেসব স্মৃতি আরো বেশি বেদনাবিধূর করে তুলেছে দেশকে; ব্যক্তি থেকে সমাজের নানা স্তরে।

এসব মানুষদের হারিয়ে শোকে কাতর বাংলাদেশ এখন কাঁদছে। শোকাহত দেশের সর্বস্তরের মানুষ। গতকালই বিমান বিধ্বস্তে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাৎক্ষণিকভাবে নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেন শেখ হাসিনা ও নেপালের পাশে থেকে সহায়তার আশ্বাস দেন। সর্বশেষ সফর সংক্ষিপ্ত করে সিঙ্গাপুর থেকে গতকালই দেশে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অবিলম্বে একটি কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও শোক প্রকাশ করেছেন।

এখনো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শোক পালনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিকভাবে দেশের বিভিন্ন স্থানে শোক পালন শুরু হয়েছে। আজ শ্রীলঙ্কায় ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে কালোব্যাজ পরে মাঠে নামবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। নিহতদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণে গতকাল রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করেছেন নিহত রিমু-বিপাশা দম্পতি স্বজনরা। এ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান সানজিদা হক, মেয়ে জামাই মো. রফিক উজ জামান ও একমাত্র শিশুসন্তান অনিরুদ্ধ জামান। সানজিদা সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজনের) সহযোগী সমন্বয়কারী ছিলেন। তার স্বামী রফিক উজ জামান ঢাকায় প্রতিবন্ধীদের অধিকার বিষয়ক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একমাত্র ছেলে অনিরুদ্ধকে নিয়ে রাজধানীর শুক্রাবাদ এলাকায় থাকতেন তারা।

এই মর্মন্তুদ প্রাণহানির ঘটনার কারণ নিয়ে চলছে নানা বিতর্ক। নেপালের বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষ দুর্ঘটনার জন্য পরস্পরকে দুষছেন। নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্তও শুরু করেছে। বাংলাদেশে এখনো এ ব্যাপারে কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের খবর পাওয়া যায়নি। উঠে আসছে ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষের নানা গাফলতি ও ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুর্ঘটনাপ্রবণের কথাও। বিশেষ করে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত বিমানটি ১৭ বছরের পুরনো হওয়ায় ও এর আগেও একই বিমানের দেশের অভ্যন্তরে আরেকবার দুর্ঘটনার মুখে পড়ায় নানা প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। সেই সঙ্গে বেসরকারি বিমান খাতের নানা বিশৃঙ্খলার কথাও আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে কেন বারবার দেশের বিমান এমন দুর্ঘটনার মুখে পড়ছে।

বিশেষ করে ইউএস-বাংলার বিমানটির দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ কী- জানতে উদগ্রীব মানুষ। একদিকে ইউএস-বাংলা বিমান কর্তৃপক্ষ বলছেন, নেপাল বিমানবন্দরের ভুল ট্রাফিক সংকেতের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সিগন্যাল ভুল হলে বিমানটি রানওয়েতে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হতো। কিন্তু তা হয়নি। ট্রাফিক মিস গাইড করলে পাইলট রানওয়েতে ল্যান্ড না করে আপ করে। দক্ষ পাইলটই এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। পরে রানওয়ে ক্লিয়ার হলে ল্যান্ড করে। তাদের মতে, দুটি কারণে বিমানটি বিধ্বস্ত হতে পারেÑ অবতরণের আগেই বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিল ও পাইলটের দক্ষতার অভাব ছিল।

প্রশ্ন উঠেছে দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত বিমানের ফিটনেস নিয়েও। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলার ড্যাস-৮ কিউ ৪০০ বিমানটি এর আগেও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল। ২০১৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর একবার যান্ত্রিক ত্রুটির জন্য বিমানটি রানওয়ে থেকে ছিটকে ঘাসের ওপর পড়ে। সে সময় যাত্রীরা ভয়ঙ্কর আতঙ্কিত হলেও কর্তৃপক্ষ একটি ব্রিফ দিয়ে দায় সেরেছিল। এরপর থেকে বিমানটি বারবার যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শিডিউল বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তারপরও কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এমনকি ইউএস-বাংলার ড্যাস-৮ কিউ ৪০০ এই বিমানটি চলাচলের উপযোগী কোনো ফিটনেস ছিল না। গতকাল সিভিল অ্যাভিয়েশনের একাধিক কর্মকর্তা এ অভিযোগ স্বীকার করেন। সেই বিমানটিই আড়াই বছর পর বিধ্বস্ত হয়ে অর্ধশতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিল।

এমনকি ইউএস-বাংলার বিমান পরিচালনায় গাফলতির অভিযোগ উঠেছে। সূত্র মতে, মাত্র সাতটি বিমান দিয়ে বর্তমানে অভ্যন্তরীণ এসব রুটে দৈনিক ৩২টি ফ্লাইট চলাচল করছে সংস্থাটি। এছাড়া ৭টি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রুটেও ফ্লাইট চালু করেছে এই এয়ারলাইনস। বিমানের তুলনায় রুটের সংখ্যা বেশি হওয়ায় ফ্লাইট শিডিউল প্রায়ই বিপর্যয় ঘটছে। বেশির ভাগ বিমানগুলোই পুরনো হওয়ায় কারিগরি ত্রুটি বেড়েছে। যাত্রী বোঝাই করে নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়াল দেওয়ার পর আকাশেও বিমানে মাঝে মাঝে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এমনকি দেশে মাঝে মধ্যেই বিমান দুর্ঘটনা কেন ঘটছেÑ সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিমান কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, গত ৩৪ বছরে অন্তত ৩৫টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির বড় ঘটনা ঘটল ৩৪ বছর পর গত সোমবার। এর আগে প্রথম বড় দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে ১৯৮৪ সালে। সেটা ছিল বাংলাদেশ বিমানের একটি বিমান। তাতে নিহত হন ৪৫ জন যাত্রী ও ক্রু। ওইদিন বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইনসের একটি ফকার বিমান (এফ-২৭) চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় আসার পথে বিধ্বস্ত হয়। তাতে যাত্রী, ক্রুসহ ৪৫ জন নিহত হন।

প্রশ্ন উঠেছে নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিমান উড্ডয়নের উপযোগিতা নিয়েও। কেননা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৩৩৮ মিটার বা ৪ হাজার ৩৯০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই বিমানবন্দরে ১৯৫৬ সাল থেকে গতকাল সোমবারের দুর্ঘটনার আগ পর্যন্ত ১০টি বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ৩৫৬ জন নিহত হন। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত হওয়ায় প্রায়শই কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে এই বিমানবন্দটি। এ কারণেই ত্রিভুবন এতটা দুর্ঘটনাপ্রবণ বলে মনে করে নেপালের অ্যাভিয়েশন সেফটি। এজন্য এখানে সবচেয়ে দক্ষ পাইলটকেই পাঠানো হয়। যদিও ইউএস-বাংলা বলছে, তাদের পাইলট ছিলেন দক্ষ। কিন্তু নিহত ওই ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন আবিদকে জোর করে ডিউটিতে পাঠানো হয় বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। সূত্র মতে, তিনি ছিলেন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। রোববার রাতে তিনি ইউএস-বাংলার চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। সোমবার নেপালের ফ্লাইট অপারেট করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করার পরও তাকে বাধ্য করা হয়।

এমন প্রেক্ষাপটে করণীয় কীÑ জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক এয়ার কমডোর (অব.) ইশফাক ইলাহী চৌধুরী বলেন, ইউএস-বাংলার পাইলটের সঙ্গে ত্রিভুবন বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ারের কথোপকথনের রেকর্ড প্রকাশের পর প্রশ্ন আরো জটিল হয়েছে। যারা সবকিছু খুলে বলতে পারতেন, সেই তিন পাইলটই মারা গেছেন। বিমানের ব্ল্যাকবক্সই কেবল ভরসা। গাফিলতি কার তা জানা গেলে অন্তত ভবিষ্যতে সতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকবে।

 

"