জামিন পেলেন খালেদা জিয়া

অন্য মামলায় গ্রেফতার না দেখালে মুক্তিতে বাধা নেই

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

আদালত প্রতিবেদক

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছর কারাদ-প্রাপ্ত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ জামিনের এই আদেশ দেন। হাইকোর্ট বলেছেন, খালেদা জিয়া বয়স্ক নারী। তার শারীরিক নানা জটিলতা আছে। এসব বিবেচনা করে তাকে চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেওয়া হলো। তবে অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার না দেখানো হলে খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন।

জামিনের এই আদেশে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী আবদুর রেজাক খান বলেন, ‘বিচারিক নিয়মে জামিন হওয়ায় আমরা সন্তুষ্ট।’

এর আগে বেলা সোয়া ২টার দিকে বিচারক আদালত কক্ষে আসেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীনের কাছে জানতে চান, তাদের কিছু বলার আছে কিনা। তখন তিনি বলেন, জামিন আবেদনের শুনানি তো শেষ হয়েছে। আমরা আদেশের জন্য অপেক্ষা করছি।

খালেদা জিয়ার আইনজীবী জয়নুল আবেদীন জামিন মঞ্জুরের পর এজলাস থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের বলেন অন্য কোনো মামলায় গ্রেফতার না দেখানো হলে খালেদা জিয়ার মুক্তিতে বাধা নেই ।

এর আগে দুপুরে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ খালেদা জিয়ার চার মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দেন।

জয়নুল আবেদীন বলেন, গণতান্ত্রিক নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার চার মাসের জামিন মঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট। তবে অন্য কোনো মামলায় তাকে গ্রেফতার না দেখানো হলে শিগগিরই তিনি মুক্তি পাবেন।

তিনি বলেন, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের পাঁচ বছরের সাজা হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে আমরা আপিল ও জামিন আবেদন করেছিলাম। গত রোববার এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রেকর্ড না আসায় সোমবার জামিন দেওয়া হয়েছে।

জয়নুল আবেদীন আরো বলেন, খালেদা জিয়ার জামিন আদেশের ওপর আরো দুই মাস স্থগিতাদেশ চেয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল। কিন্তু আদালত তা মঞ্জুর না করে খালেদা জিয়াকে জামিন দেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, ‘এ মামলাটি স্পর্শকাতর। বিচারিক আদালত খালেদা জিয়ার বয়স ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে ৫ বছর কারাদ- দিয়েছেন।’

গত ২০ ফেব্রুয়ারি সাজার রায় হওয়ার পর জামিন চেয়ে আপিল করেন খালেদা জিয়া। জামিন আবেদনের শুনানির পর নিম্ন আদালতের নথি এলে আদেশ দেবেন বলে জানান হাইকোর্ট। আজ দুপুরের ওই বেঞ্চে ৫ হাজার ৩২৮ পৃষ্ঠার নথি পৌঁছায়।

সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গত ৮ ফেব্রুয়ারি পাঁচ বছরের কারাদ- দেন বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ মামলার অপর পাঁচ আসামির প্রত্যেককে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়। চার আসামি হলেন সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের ভাগনে মমিনুর রহমান। এর মধ্যে পলাতক আছেন তারেক রহমান, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান।

এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশ্যেই বিদেশ থেকে পাঠানো ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করার অভিযোগে খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুদক এই মামলা করে। তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট ছয়জনের বিরুদ্ধেই অভিযোগপত্র দেন দুদকের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ। অন্য আসামিরা হলেন সাবেক সাংসদ ও ব্যবসায়ী কাজী সালিমুল হক কামাল, সাবেক মুখ্যসচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ ও জিয়াউর রহমানের বোনের ছেলে মমিনুর রহমান। মামলায় শুরু থেকে পলাতক আছেন কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমান। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আদালত খালেদাসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৩২ জনের সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন আদালত।

মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে অন্যায়ভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে পরস্পর যোগসাজশে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করেছেন, যা দ-বিধির ৪০৯ ও ১০৯ ধারার অপরাধ।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্রে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংক থেকে ১২.৫৫ লাখ মার্কিন ডলার আসে যা বাংলাদেশি টাকায় তৎকালীন ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই অর্থ দেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো এতিমখানায় না দিয়ে অস্তিত্ববিহীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন। অথচ কোনো নীতিমালা তিনি তৈরি করেননি, করেননি কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থাও। অথচ খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল থেকে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা অস্তিত্ববিহীন জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে পাঠান। পরে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন যার জন্য তিনি দায়ী। তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে বলেন, খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় থেকে নিজের পদমর্যাদা বলে সরকারি এতিম তহবিলের আর্থিক দায়িত্ববান বা জিম্মাদার হয়ে বা তহবিল পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হয়ে অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ করে দন্ডবিধির ৪০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ করেছেন।

"