দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়ে বিদেশি নাগরিকদের

প্রকাশ : ১৩ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

অনিবার্য হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা। লাখো বাঙালির সশস্ত্র প্রস্তুতি শঙ্কিত করে তোলে পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে। সরব বিশ্ব রাজনীতি। সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় বিদেশি দূতাবাস ও মিশন অফিস। বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। দেশ ছাড়ার হিড়িক পড়ে বিদেশি নাগরিকদের। বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে আরো বেশি সোচ্চার হয়ে ওঠে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু সেসবের তোয়াক্কা না করে গোপনে বাঙালি হত্যাযজ্ঞের নকশা করতে থাকে পাকিস্তান সামরিক সরকার।

আজ ১৩ মার্চ। একাত্তরের এইদিনে আরো বেশি উত্তাল হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন। বিদেশি কূটনীতিকদের দেশত্যাগের গুজব শেষ পর্যন্ত সত্য হয়। বিশেষ বিমানে আজ ঢাকা ত্যাগ করেন ঢাকার জাতিসংঘ ও পশ্চিম জার্মানি দূতাবাসের কর্মচারী, তাদের পরিবার এবং ইতালি, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ২৬৫ জন নাগরিক।

মুক্তি আন্দোলনের মিছিল-সমাবেশে যুক্ত ছিলেন প্রতিরক্ষা বিভাগের যেসব বাঙালি বেসামরিক কর্মচারী আজ তাদের সতর্ক করে সামরিক কর্তৃপক্ষ। আগামী ১৫ মার্চ সকাল ১০টার মধ্যে তাদের কাজে যোগ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। নতুবা নির্দেশ অমান্যকারীদের চাকরিচ্যুত, অন্যান্য শাস্তি বা সর্বোচ্চ ১৪ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদ- দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দেয় সামরিক শাসন কর্তৃপক্ষ। এ নির্দেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা পূর্ব পাকিস্তান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে সামরিক নির্দেশ উপেক্ষা করে জনগণকে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। ভৈরবে এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, বাঙালি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার গঠনের অপেক্ষায়।

সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আফাজউদ্দিন ফকির এক বিবৃতিতে শিগগিরই পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব একজন বাঙালি জেনারেল ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সবকটি ব্যাটালিয়নের পরিচালনা কর্তৃত্ব বাঙালি অফিসারদের হাতে অর্পণ এবং বিগত এক মাসে আনা অতিরিক্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব ও আবদুল কুদ্দুস মাখন এক যুক্ত বিবৃতিতে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগকারীদের বাড়ি-গাড়ি-সম্পদ কিনে বাংলার অর্থ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচারে সহযোগিতা না করার জন্য জনতার প্রতি আহ্বান জানান। সকালে রমনা পার্কে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ বিক্ষোভ সমাবেশ করে। শীতলক্ষ্যায় দীর্ঘ নৌ মিছিল বের করে অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন।

চট্টগ্রামে বেগম উমরতুল ফজলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নারী সমাবেশ থেকে মুক্তি অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের বিলাসদ্রব্য বর্জন ও কালোব্যাজ ধারণের জন্য নারী-পুরুষ সবার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। বরেণ্য চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও সাবেক জাতীয় পরিষদ সদস্য আবদুল হাকিম পাকিস্তান সরকারের দেওয়া খেতাব ও পদক বর্জন করেন।

ন্যাপের সভাপতি খান আবদুল ওয়ালী খান ও ন্যাপ নেতা গাউস বক্স বেজেঞ্জো সকালে বিমানে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কিত শেখ মুজিবুর রহমানের দাবির প্রশ্নে আমি সম্পূর্ণ একমত।’

লাহোরে জাতীয় পরিষদের সংখ্যালঘিষ্ঠ পাঁচ দলের পার্লামেন্টারি পার্টির নেতারা এক সভায় মিলিত হয়ে অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানান। সভায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে এসে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের অনুরোধ জানানো হয়। সভায় কাউন্সিল মুসলিম লীগ, কনভেনশন লীগ, জামায়াতে ইসলামী, জমিয়তে ইসলাম ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতাসহ কয়েকজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য অংশ নেন।

"