সিডিএর হাতে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প

জলাবদ্ধতা সামাল দেওয়াই চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

কাজী আবুল মনসুর, চট্টগ্রাম ব্যুরো

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার কারণে মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ। জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে মানুষ দোষারোপ করে সিটি করপোরেশনকে। বৃষ্টি হলেই পানিতে ভাসে চট্টগ্রামের অধিকাংশ এলাকা। মেয়রকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায় নগরবাসী। কারণ, জলাবদ্ধতার দায়ভার ছিল মেয়রের ওপর। জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়ে নির্বাচনেও। এবার মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন জলাবদ্ধতার এ খড়গ থেকে মুক্ত। কারণ চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার নিরসনের দায়িত্ব পড়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ওপর। মেয়র আগেভাগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন, এবারও নগরীতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য ৫ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার প্রকল্পটি ২০১৭ সালে একনেকে পাস হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিডিএকে। সেনাবাহিনী প্রকল্প বাস্তবায়নে সিডিএকে সহযোগিতা করবে। ২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়। জানুয়ারি মাসের প্রথম দিকে প্রকল্পের কাজ শুরুর কথা থাকলেও তা মার্চে এসে ঠেকেছে। এই পরিবর্তনের ফলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। অতীতের মেগা প্রকল্পগুলোর মতো এ প্রকল্পটিও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যাচ্ছে কি না, এ নিয়ে সংশয়ে রয়েছে চট্টগ্রামবাসী।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়টি সরাসরি দেখছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তিনি বলেন ‘বর্ষা মৌসুম আসতে আরো দুই-তিন মাস সময় আছে। বৃষ্টি শুরুর আগে ১৬টি খাল সংস্কার করতে চাই। খালগুলো পরিষ্কার করা হবে এমনভাবে যাতে পানি দ্রুত বেগে নেমে যায়। আগামী তিন মাসে এটা সম্ভব হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চান জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রাম শহরের মানুষকে মুক্তি দিতে। এজন্য তিনি প্রাথমিকভাবে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর শিগগিরই এ প্রকল্পের কাজ শুরু করবে।’

জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সিডিএ) মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। তবে তারা এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। এমন অবস্থায় খাল খনন কার্যক্রম পরিচালনা করা সিডিএর দায়িত্ব উল্লেখ করে এসব কাজ বন্ধ করে দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। বর্তমানে অবস্থা এমন পর্যায়ে রয়েছে, দুই সংস্থার সমন্বয়হীনতার ফলে এবারও বর্ষায় দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কায় আছেন চট্টগ্রামবাসী। আর মাসখানেক পরেই শুরু বর্ষা মৌসুম। জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি সামাল দেওয়াই হবে এবার সিডিএর চ্যালেঞ্জ। গত ৭ মার্চ চসিককে একটি চিঠি দিয়েছে সিডিএ। এতে খাল ও ড্রেন পরিষ্কার রাখা চসিকের নিয়মিত কাজের অংশ বলে উল্লেখ করা হয়। এ পরিষ্কার কাজ চলমান রাখা হলে তা আগামী বর্ষায় জলাবদ্ধতা লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে সিডিএর ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘খাল ও ড্রেন’ পরিষ্কার খাতে সিডিএর প্রকল্পে কোনো অর্থ বরাদ্দের সংস্থান নেই।

তবে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলছেন, সিডিএর নেওয়া ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পের আওতায় খাল খনন বা পরিষ্কার করার বরাদ্দ আছে। ফলে খাল খননের দায়িত্ব এখন থেকে সিডিএর। তাই আগামী বর্ষাকে সামনে রেখে এতদিন ধরে যে খনন কার্যক্রম চসিক পরিচালনা করে আসছিল তা বন্ধ করা হবে। অর্থাৎ সিটি করপোরেশন খনন কার্যক্রম আর পরিচালনা করবে না। অবশ্য শহরের ভেতরের যে সব ড্রেন আছে সেগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করা হবে।’

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নগরীর ১৬টি খাল পরিস্কারের কাজ দ্রুত শুরু করার পরিকল্পনা নিয়েছে সিডিএ। গতকাল রোববার সিডিএর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মনিটরিং কমিটির বৈঠকের পরই যে কর্মপন্থা নির্ধারণ হয়, তাতে খাল উদ্ধারের ওপর জোর দেওয়া হয়। সিডিএর ইতিহাসে এর আগে কোনোদিন এভাবে কোনো প্রকল্পের জন্য বৈঠক হয়নি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনকে টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল হক মাহমুদকে সদস্য করে চসিক, সিডিএ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি নিয়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ কবে থেকে শুরু হবে তার কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। গতকাল বৈঠকে সেবা সংস্থাগুলোর প্রধানরা প্রায় সবাই উপস্থিত থাকলেও উপস্থিত হননি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। তবে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রেজাউল মজিদ, ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ, পিডিবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী প্রবীর কুমার সেন, সিডিএর প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ শাহীনুল ইসলাম খান, প্রকল্প পরিচালক সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মাঈনুদ্দিন, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী মো. আল মামুন প্রমুখ সভায় উপস্থিত থেকে মতামত দেন।

পুরো বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান আবদস ছালাম প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, আমরা দেখেছি গত বর্ষায় নগরীর হালিশহর, আগ্রাবাদ, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, দেওয়ানবাজার, সাবএরিয়া, বৃহত্তর বাকলিয়া, চকবাজার, মুরাদপুর, শুলকবহর, বহদ্দারহাট এসব এলাকায় বেশি জলাবদ্ধতা হয়েছে। আমরা প্রাথমিকভাবে যে ১৬টি খাল চিহ্নিত করেছি, সেগুলো সংস্কার হলে এসব এলাকা জলাবদ্ধতা থেকে কিছুটা মুক্ত হবে। নগরীর খালগুলোর সীমানা আরএস মূলে নির্ধারণ করে তারপর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে নামবে। এই প্রস্তাব সভায় সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। কখন কাজ শুরু হবে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ৩৬টি খালের জন্য নিজ অর্থায়নে পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে ডিটেল প্ল্যানসহ গ্রাউন্ড ওয়ার্ক সম্পন্ন করে রেখেছে সিডিএ। সেনাবাহিনীও মাঠের কাজ শেষ করে মূল কাজ শুরুর অপেক্ষায় আছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা স্বাক্ষর, তারপরই শুরু হবে কর্মযজ্ঞ।

এদিকে গতকাল রোববারের বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় যাদের মতামত নেওয়া হয় তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে ঐক্যমতে পৌছানো ছিল কঠিন। কারণ, খালের মধ্য থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য সাতদিন আগে নোটিশ দিতে হবে বলে সভায় উল্লেখ করেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য জাফর আলম। সভায় উপস্থিত নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মাসুদ-উল-হাসান এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, নোটিশ দিলে তারা হাইকোর্টে যাবে। তখন মন্ত্রী মোশাররফ বলেন, খালের মধ্যে যদি অবৈধ স্থাপনা থাকে, তাহলে নোটিশ দেওয়ার কোনো দরকার নেই। সরাসরি উচ্ছেদে যেতে হবে। সিডিএর জরিপ অনুযায়ী প্রকল্পের কাজের প্রস্তাবনায় সেনাবাহিনী যদি বড় কোনো ত্রুটি না পায় তবে সমঝোতা স্বাক্ষর হবে। কাজ দ্রুত শুরু করতে প্রস্তুত সেনাবাহিনী। তবে পরিকল্পনায় যদি বড় কোনো ত্রুটি বা সংশোধন আনতে হয় সে ক্ষেত্রে অপেক্ষা করতে হতে পারে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালের সিডিএর মাস্টারপ্ল্যান ও ২০১৬ সালের ওয়াসার মাস্টারপ্ল্যানকে ভিত্তি করে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে এ মেগা প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেক সভায় ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকার অনুমোদন দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রকল্পের সমন্বয়ের জন্য চসিক, চট্টগ্রাম ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে সংযুক্ত করা হয় এবং সমন্বয়ের জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটিও গঠন করা হয়। সুপারিশমালা অনুযায়ী প্রকল্পের প্রধান কাজগুলো সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। প্রকল্পের ডিজাইন সুপারভিশন, ভূমি অধিগ্রহণ ও যন্ত্রপাতি ক্রয় ইত্যাদি কাজ করবে সিডিএ।

এদিকে চট্টগ্রামের নাগরিক সমস্যা নিয়ে বিভিন্ন সময় আন্দোলনে সরব রয়েছেন নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন। গত ৪ মার্চ দুপুরে সিডিএ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে যান সুজন। এ সময় সিডিএ চেয়ারম্যান আবদুস ছালামের কাছে জলাবদ্ধতা নিরসনের ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন সুজন। জানতে চাইলে সুজন বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রামবাসীকে রক্ষার জন্য এতবড় একটি প্রকল্প সিডিএকে দিয়েছে। আমরা আশা করি প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাসের মূল্য সিডিএ চেয়ারম্যান দেবেন। সেদিন সিডিএ চেয়ারম্যানকে বলেছি, সামনে বর্ষা মৌসুম। জলাবদ্ধতা নিয়ে মানুষ আতঙ্কিত। কাজ দ্রুত শুরু করুন। অন্যথায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সিডিএ ভবন ঘেরাও করব।

"