হঠাৎ সরকারের সমালোচনায় এরশাদ নানা গুঞ্জন

প্রকাশ : ১০ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

সামরিক স্বৈরশাসনের পতনের পর গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে সক্রিয় রয়েছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। সংসদীয় রাজনীতির ধারায় নিজেকে ঝানু খেলোয়াড় হিসেবে মনে করছেন তিনি। একেক সময় একেক কথা বলে যেমন আলোচনায় থাকতে পছন্দ করেন। আবার নিজ স্বার্থেই উল্টো পথে হাঁটতেও পিছপা হননা তিনি। সরকারে থেকে আবার সরকারের সমালোচনা করে মুখরোচক আলোচনায় থাকেন তিনি। দ্বিমুখী রাজনীতির বরপুত্র এরশাদ এখন আবারও সরকারের কড়া সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। গুঞ্জন রয়েছে, আগামী নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের নেতা হতে চান তিনি। কিংবা পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে, নিজে উল্টে গিয়ে ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে ভিড়ে রাষ্ট্রপতির পদ অলঙ্কৃত করার লক্ষ্য রয়েছে তার। এ দুই চিন্তা নিয়ে রাজনীতির মাঠে ক্রমাগতই নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে নড়েচড়ে বসেছেন এরশাদ।

মানুষ মনে করে, এরশাদ অনেক কৌশলী রাজনীতিক। কোনোভাবেই থাকতে চান না ক্ষমতার বাইরে। ভাঁড়ামোর আড়ালে নানা কৌশলের পথে হাঁটছেন তিনি। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সময় সাবেক স্বৈরশাসক যাই বলুক, মানুষ তার কথা বিশ্বাস করে না। দেশের মানুষ মনে করে, যেখানে সুবিধা সেখানেই এরশাদ।

বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ও সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এরশাদের অবস্থান বোঝা মুশকিল। তার সব কিছুতেই সুবিধার বিষয় থাকে। এ বিষয়ে তিনি প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, দেশের মানুষ মনে করে এখন সরকার একটু বেকায়দায় আছে, বিধায় তার মন্ত্রীদের সংসদ থেকে বের করে আনতে চায়। তবে কোনোভাবেই তা সরকারের অখুশিতে হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া রওশন এরশাদ সংসদে যেভাবে কথা বলেছেন, তাতে জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ এরশাদের হাতে কতটা আছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তবে যাই করুক না কেন, দেশের মানুষ এরশাদকে বিশ্বাস করে না। এরশাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খুব একটা ভালো বলে মনে হয় না।

বর্তমান সরকারের সময় একাধারে বিরোধী ও সরকারের অংশ হয়ে এরশাদ নানা নাটকীয় ঘটনার জন্ম দিয়ে চলেছেন। নিজে নির্বাচনে অংশ নিতে না চাইলেও এমপি হয়ে, মন্ত্রী মর্যাদায় হয়েছেন বিশেষ দূতও। আবার তার দলের তিনজন প্রভাবশালী এমপিকে বানিয়েছেন মন্ত্রী। সরকারের কাছ থেকে এত কিছু পাওয়ার পরও টানা চার বছর ধরে খানিক সরকারের প্রশংসা করলেও সুযোগ বুঝে কড়া সমালোচনা করতেও ছাড়েননি। এ নিয়ে দলের অনেকে বলছেন, কোনো কিছু পেতে চাইলেই এরশাদ কৌশলে সরকারের সমালোচনা শুরু করেন; আবার তাৎক্ষণিক বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভূয়সী প্রশংসাও করেন তিনি। নিজ এলাকা রংপুরে সরকারবিরোধী সেন্টিমেন্ট বেশি থাকায় সেখানে গিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন, আবার ঢাকায় এসে পক্ষে বলে সবটা পুষিয়ে দিচ্ছেন। এমন কথাই বলেছেন জাতীয় পার্টির এক ভাইস চেয়ারম্যান। তিনি জানান, এটা একমাত্র এরশাদের পক্ষেই সম্ভব। নাম না প্রকাশ করার শর্তে তিনি বলেন, এরশাদ এখন জাতীয় রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে তার পক্ষে দুই দিকেই সওদা করা সম্ভব। সেটা হলো, আগামী নির্বাচনে বিএনপি না এলে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল আসবে না। তাই সরকারকে আরেকবার ক্ষমতায় যেতে হলে অবশ্যই জাতীয় পার্টিকে প্রয়োজন। এমন বাস্তবতার মুখে সরকার থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা নিতে মোটেও ভুল করবেন না এরশাদ। আবার কোনো কারণে যদি বিএনপি বিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব না হয় অথবা বিএনপি নির্বাচনে আসে তাহলে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়ায়ও যেতে পারেন তিনি। এমন রাজনৈতিক সুবিধার বিষয়গুলো মাথায় রেখেই এরশাদ আগামী নির্বাচনের ঘুঁটি সাজাচ্ছেন।

সম্প্রতি রওশন এরশাদের দেওয়া সংসদের বক্তব্যের পর দলের সকলেই প্রায় সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। গত সপ্তাহে বরিশালের এক সমাবেশে দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারও কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন সরকারের। সেই সমাবেশে এরশাদ সরকারের এক হাত নিয়েছেন। করেছেন নির্বাচন কমিশনের সমালোচনাও। এ সময় তিনি বলেন, মানুষ হত্যা, গুম ও মায়ের বুক খালি করে ক্ষমতায় টিকে থাকা যায় না। সরকারে থাকতে হলে মানুষের ভালোবাসা প্রয়োজন। তাদের ভালোবাসার মাধ্যমেই ক্ষমতায় টিকে থাকা যায়। এরশাদ আরো বলেন, সরকারের দৃষ্টি এখন মানুষের দিকে নয়, ক্ষমতায় কিভাবে টিকে থাকা যায় সেটাই লক্ষ্য। নাসিরনগর উপনির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি আমাদের কোনো আস্থা নেই। তবে নাসিরনগর নির্বাচনেই প্রমাণ হবে নির্বাচন কমিশন কতটা নিরপেক্ষ।

সূত্র জানায়, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গত কয়েক বছর ধরেই ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা বলে আসছেন। এ জন্য মাঝে নামসর্বস্ব ৬৮টি দল নিয়ে ‘বিশাল’ একটি জোট করে সাড়া ফেলার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নামসর্বস্ব দলের জোট নিয়ে হালে পানি পাননি। রাজনীতিতে কোনোরূপ প্রভাব ফেলতে পারেননি তিনি। তাই এখন তার নতুন কৌশলের দরকার হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের সিদ্ধান্ত হচ্ছে জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে। দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় আমাদের সমর্থক আছে, সংগঠন আছে এবং প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতাও আছে। এ অবস্থায় আমরা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুত হচ্ছি।’ সরকারের সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকায় আসতে চাই। তাই সরকারের টুকটাক সমালোচনা থাকতে পারে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। বেশ আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছে দলটি। এরই অংশ হিসেবে ২৪ মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহাসমাবেশ করতে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি। গুঞ্জন আছে সেই সমাবেশ থেকেই মন্ত্রীদের পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারেন এরশাদ। এছাড়া মহাসমাবেশ থেকে এককভাবে নির্বাচনের নির্দেশনা, ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়া ও আগামী নির্বাচনী রোডম্যাপও ঘোষণা করবেন এরশাদ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের প্রস্তুতি সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় এরশাদ নিজেই তত্ত্বাবধান করছেন। এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করছেন পার্টির মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার। এরই মধ্যে দলের এমপিদের যার যার নির্বাচনী এলাকায় আরো বেশি সময় দেওয়ার জন্য বলেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলাকায় যাতায়াত বাড়াতেও বলেছেন তিনি। দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি খসড়া তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন এরশাদ। এজন্য একটি রোডম্যাপও তৈরি করেছেন। এর অংশ হিসেবে দলের নেতারা কে কোন আসন থেকে নির্বাচন করতে চান, তা জানতে চেয়েছেন এরশাদ।

"