জনসভার জনস্রোতে যৌন হয়রানি

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

নিজস্ব প্রতিবেদক
ama ami

ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে গত বুধবার ছিল রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগের জনসভা। এজন্য রাজধানী ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে সোহরাওয়ার্দীগামী জনস্রোত ছিল চোখে পড়ার মতো। ঐতিহাসিক দিবসটিতে নামা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভিড়ে কোথাও দেখা দিয়েছিল অসহনীয় যানজট, আবার কোথাও যানবাহন না থাকার দুর্ভোগ। অভিযোগ উঠেছে, এই ভিড়ের মধ্যেই রাজধানীর বাংলামোটর, শাহবাগসহ ছয়টি এলাকায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে কয়েকজন নারী। এরই মধ্যে এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ৭ মার্চের সমাবেশকে কেন্দ্র করে নারীদের শ্লীলতাহানির ভিডিও ফুটেজ হাতে এসেছে। ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না। এদিকে ডেপুটি কমিশনার (জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান বলেন, আমরা তদন্ত শুরু করেছি।

নারীনেত্রীরা বলছেন, এখনকার জমায়েতে আদর্শিক প্রকাশ নেই বরং এক ধরনের হিরোইজমের প্রকাশ ঘটানোর প্রবণতা আছে। যার অংশ নারী নিপীড়ন। অভিযোগকারী নারীরা বলছেন, নানা কাজে বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। অশ্রাব্য ভাষায় গালি থেকে শুরু করে গায়ে বোতলের পানি ছিটিয়ে দেওয়া, বোতল ছুড়ে মারা এবং ঘিরে ধরে শারীরিকভাবে হেনস্তা করার মতো ঘটনাগুলো ঘটেছে। বেশিরভাগ ঘটনার সময় দুপুর ১২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা। অভিযোগকারী নারীদের মধ্যে কেউ কেউ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে অভিযোগ জানালেও অনেকে মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন।

তারা বলছেন, বিভিন্ন উৎসব উদ্যাপনে ভিড়ের মধ্যে কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষের মধ্যে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও ফাঁকা রাস্তায় কিংবা জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকা রাস্তায় একদল জনসভাগামীদের হাতে এ ধরনের হেনস্তার ঘটনায় তারা স্তম্ভিত। এদিকে বুধবার সন্ধ্যা থেকেই নারীদের ওপর যৌন হয়রানির অভিযোগের খবর ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ঘটনাগুলো সত্য নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়রানির শিকার এক কলেজছাত্রী বলেন, আমার সঙ্গে যা ঘটেছে তা আমি বলতে গেলে সেটা রাজনৈতিক কোনো দলের বিরুদ্ধে ভেবে নেওয়াটা দুর্ভাগ্যজনক। আমি তখন লজ্জায় কাঁদছি। তার মধ্যেও আমার মনে হচ্ছিল, আমার দোষটা কী, কেন এরা আমার সঙ্গে এরকম করছে। আমি তাদের আটকাতে চেষ্টা করছিলাম, চিৎকার দিচ্ছিলাম। কিন্তু একজনও এগিয়ে আসেনি। আমি দুঃখে কাঁদিনি, ঘেন্নায় কেঁদেছি। কোনো মতে বাসায় এসে আমি ফেসবুকে লিখেছি বটে কিন্তু তাতেও আসলে পরিস্থিতি বদলাবে না। পরিস্থিতি বদলানোর হলে এতদিন বদলাতো।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার পর ৭ মার্চ ও একটি রাজনৈতিক দলকে গালাগালি শুরু করায় ভুল বার্তা যাচ্ছে ভেবে পোস্টটি তুলে নেন এক অভিযোগকারী। পরে আরেকটি স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি লেখেন, ‘ভালো আছি, সুস্থ আছি। পোস্টটা অনলি মি করেছি কারণ পোস্টটা রাজনৈতিক উসকানিমূলকভাবে শেয়ার করা হচ্ছিল। আমি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পোস্টটা দেইনি। প্লাস আমার কলেজকে জড়ানো হচ্ছিল এ ব্যাপারে। ব্যাপারটার সঙ্গে আমার কলেজের সম্পর্ক নেই।’

এক নারী শিক্ষার্থী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘হল থেকে বের হয়ে কোনো রিকশা পাইনি। কেউ শাহবাগ যাবে না। হেঁটে শহীদ মিনার পর্যন্ত আসতে হয়েছে। রাস্তাজুড়ে ৭ মার্চ পালন করা দেশভক্ত সোনার ছেলেরা একা মেয়ে পেয়ে ইচ্ছামতো টিজ করছে। নোংরা কথা থেকে শুরু করে যেভাবে পারছে টিজ করছে।’

প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘ঐতিহাসিক ৭ মার্চের অনুষ্ঠানকে বিতর্কিত করতে কিছু অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কিংবা গল্পের কথা শোনা যাচ্ছে। সত্য-মিথ্যা কতটুকু জানি না। হয়তো শিগগিরই তা উদ্ঘাটিত হবে। উল্লিখিত ঘটনার আশপাশে সব খানেই সিসি ক্যামেরা আছে। ঘটনা ঘটলে কারা কারা দায়ী এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী তা খুঁজে বের করা কঠিন কিছু হবে না। না ঘটলেও হয়তো রটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হবে। উত্তেজিত হয়ে এখনি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে অপেক্ষা করাই ভালো।’

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন সালমা (ছদ্মনাম)। তিনি বলেন, ‘গাড়ি চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে খামারবাড়ির দিকে যাওয়ার সময় সামনে দুই-তিনটা ট্রাক ভর্তি ছেলে স্লোগান দিতে দিতে যাচ্ছিল। রাস্তা ফাঁকা কিন্তু তাদের ট্রাক চলছিল ধীরগতিতে এবং আমার গাড়িকে কোনোভাবেই সাইড দিচ্ছে না। এক দুইবার আমার গাড়ি তাদের পাশ কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করতেই গাড়ির দিকে বোতল ছুড়ে মারতে থাকে তারা। আমার চালক জানালার কাচ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে অশ্রাব্য গালি। তাদের বক্তব্য আমার গাড়ি তাদের পেছন পেছন যেতে হবে।’

নারীনেত্রী খুশি কবীর বলেন, এখনো রাস্তায় এ ধরনের নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন নারীরা, সেটা দুঃখজনক। জনসভায় যাওয়া ব্যক্তিরা রাস্তায় এরকম পরিস্থিতি ঘটানোর সাহস পায় কোথা থেকে? তারা নানাভাবেই একটা বার্তা দিতে চায়, নারীদের নিজেদের কাজে বের হতে তারা দেখতে চায় না। তারা প্রতিযোগী মনে করে দমানোর রাস্তা হিসেবে এই নিপীড়নকে বেছে নিচ্ছে এবং দলীয় আশ্রয় পাবে বলে ভেবে নিচ্ছে। আমি এই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও বিচার চাই।

উই ক্যানের এক্সিকিউটিভ কো-অর্ডিনেটর জিনাত হক বলেন, নারীর সঙ্গে সমানতালে পুরুষ এগিয়ে যেতে না পারায় সংঘাতটি মুখোমুখি হয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি যারাই ঘটিয়ে থাকুন না কেন এটি একক পুরুষ আকারে দেখলে হবে না। একই চিন্তার এ ধরনের দলবদ্ধ পুরুষ যখন একধরনের চিন্তা করে তখন তারা এসব ঘটায় এবং ভাবেÑ এইভাবে বুঝি মেয়েদের উচিত শিক্ষা দেওয়া যাবে।

তিনি আরো বলেন, খারাপ শক্তি খুব তাড়াতাড়ি এক হয়ে যায়। ওই পুরুষের সংঘবদ্ধ হওয়া থেকে শুরু করে তাদের পেছনে যে ক্ষমতার রাজনীতি সেটার কারণে এরকম পরিস্থিতি তৈরি করতে তারা ভয় পায় না। খেয়াল করে দেখবেন এখন সমাবেশে কর্মীরা কীভাবে যায়? সারা রাত মাইক বাজিয়ে জেগে থেকে, মোটরবাইকের মহড়া করে, ট্রাকে গাদাগাদি করে সমাবেশস্থলে যায়। তাদের কোনো আদর্শিক জায়গা নেই এবং আদর্শিক জায়গা যখন না থাকে সেখানে পুরুষ আধিপত্যের প্রকাশ পায়। এরই অংশ নারীকে নিপীড়ন করা। গেঞ্জি খুলে মাথায় বাঁধা, খালি গায়ে স্লোগান দিতে দিতে যাওয়া, যারা যাচ্ছে তাদের যদি দলগুলো পরিচর্যা করতে থাকে তাহলে এ ধরনের ঘটনাগুলো আরো বাড়তে থাকবে। আদর্শের ধারাবাহিকতায় আসতে হলে আদর্শের অনুগামী হতে হবে। তাদের মধ্যে সেই বোধ নেই।

"