রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আটকাতেই ভীতি ছড়ানোর মহড়া সেনাদের

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

বিবিসি বাংলা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের আলোচনা যখন এগিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমারের দিক থেকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির ঘটনা ঘটছে। নতুন করে আরো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। এসব রোহিঙ্গা জানিয়েছে, রাখাইনে সেনা নির্যাতনের কারণেই তারা বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে। এসব ঘটনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অনেকে সংশয় প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গারা যাতে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার চিন্তা না করে সেজন্য তাদের মনে ভীতি ছড়ানোর মহড়া দিয়েছে সে দেশের বাহিনী। বিবিসির এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হলে সীমান্তের জিরো লাইনে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের প্রথমে ফিরিয়ে

নেওয়ার কথা বলেছিল বাংলাদেশ। যেহেতু যেসব রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশের ভেতরে ঢোকেনি সেজন্য তাদের পরিচয় যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সেখান থেকে রোহিঙ্গাদের সরে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে মিয়ানমার বুঝিয়ে দিল প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তারা কতটা অনাগ্রহী। এমটাই মনে করছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস এন্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান।

এ এন এম মুনিরুজ্জামান বলেন, ‘মিয়ানমারের এ ধরনের পদক্ষেপ অসহযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা এমনিতেই মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে ভীত। তার ওপর এ ধরনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি তাদের মনে আরো ভয় তৈরি করবে।’

গত আগস্ট মাসে রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর বাংলাদেশ নানা কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় প্রত্যাবাসন সমঝোতা করে বাংলাদেশ। গত নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের পর সে চুক্তি হয়। চীনের আগ্রহ এবং কূটনৈতিক মধ্যস্থতায় সে সমঝোতা হয়েছিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। চীন বরাবরই চেয়েছিল রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিকীকরণ না করে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার দ্বিপক্ষীয়ভাবে সেটি সমাধান করুক। বাংলাদেশও সে পথেই হেঁটেছে।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন মনে করেন, সীমান্তের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও জানান দিল যে, দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধানের চেষ্টা মোটেও সফল হচ্ছে না। তাহলে বাংলাদেশের সামনে আর বিকল্প আছে কী?

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এক পক্ষের আগ্রহে কখনো দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে সমাধান হবে না। আমাদের উচিত বহুপক্ষীয়ভাবে চেষ্টা করা। বাংলাদেশ তো দ্বিপক্ষীয়ভাবে মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারছে না।’ অপরদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর নানা ধরনের চাপ তৈরির চেষ্টা করছে আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের পাশে দাঁড়িয়েছে বড় শক্তি চীন, রাশিয়া এবং আঞ্চলিক শক্তি ভারত। আন্তর্জাতিকভাবে নানা বিবৃতি এবং সমালোচনা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান মনে করেন, শুধু সমালোচনা কিংবা বিবৃতি দিয়ে মিয়ানমারের ওপর কোনো চাপ তৈরি করতে পারবে না বাংলাদেশ।

১৯৯০’র দশকে বলকান যুদ্ধের সময় বসনিয়ার মুসলমানদের জাতিগত নিধনযজ্ঞে মেতে উঠেছিল সার্বিয়ার বাহিনী। প্রায় তিন বছর পর আমেরিকার নেতৃত্বে ন্যাটো সার্বিয়ার বাহিনীর ওপর সামরিক হস্তক্ষেপ করেছিল। অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান মনে করেন, পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, যখন মিয়ানমারের ওপর সামরিক হস্তক্ষেপই হতে পারে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান।

অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান মনে করেন, ‘যদি সামান্য পরিমাণও সামরিক হস্তক্ষেপ করা যায় তাহলে এর মাধ্যমে মিয়ানমার বাহিনীকে বাধ্য করা যাবে।’ রোহিঙ্গা সংকট শুরুর পর থেকে মিয়ানমারের দিক থেকে সীমান্তে সামরিক উসকানি ছিল বলে বাংলাদেশ অভিযোগ করেছে। মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বেশ কয়েকবার বাংলাদেশের আকাশ সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে বাংলাদেশ।

এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছেন, সীমান্তে সংঘাত তৈরির জন্য উসকানি দিয়েছিল মিয়ানমার, কিন্তু বাংলাদেশ সংযম দেখিয়েছে।

মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান মনে করেন সীমান্তে বাংলাদেশ যদি কোনো পাল্টা জবাব দিতে চায় তাহলে পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার আশা ভেস্তে যেতে পারে। মিয়ানমারের ফাঁদে পা দেওয়া বাংলাদেশের উচিত হবে না। সীমান্তে সংঘাতময় পরিস্থিতির তৈরি হলে সেটি কোনো সময় বাংলাদেশের স্বার্থে যাবে না।

মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী কতটা কঠোর অবস্থান নিয়েছে সেটি তাদের কর্মকা- পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়। বিবিসির বার্মিজ ভাষা বিভাগ বলছে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বা ‘জিরো লাইন’ শব্দগুলো যাতে ব্যবহার না করা হয় সেজন্য মিয়ানমারের গণমাধ্যমকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিবিসির বার্মিজ ভাষা বিভাগের বো মও ব্যাখ্যা করছিলেন, সীমান্তে শক্তি বৃদ্ধির পেছনে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরছে মিয়ানমার। বো মও বলেন, ‘বার্মার কর্তৃপক্ষ মনে করে সীমান্তে আরসার (আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি) সদস্যরা অবস্থান নিয়েছে।’

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের সংশয় থাকলেও মিয়ানমার সে ব্যাপারে নির্লিপ্ত।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার কি সত্যিই আগ্রহী?

ভারতের সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক নিয়মিত মিয়ানমারে আসা-যাওয়া করেন। সেখানকার সরকার এবং সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে সুবীর ভৌমিক কথা বলেন।

সুবীর ভৌমিক বলেন, ‘সেনাবাহিনীর একটি অংশ চায় না এ প্রত্যাবাসন ঘটুক। মিয়ানমার আর্মির মধ্যে একটি ভেস্টেড ইন্টারেস্ট আছে যারা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আটকাতে চায়।’

বাংলাদেশের সাবেক কূটনীতিকরা মনে করেন, ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে যখন প্রায় ৮৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল তখন বাংলাদেশের উচিত ছিল বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে তুলে ধরা।

মিয়ানমারের প্রতিবেশী চীন চেয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুটি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান হোক।

চীন বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার যাতে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকে সেটাই চেয়েছে চীন, এ কারণে এ ধরনের দ্বৈত নীতি নিয়েছে বলে ধারণা করেন অধ্যাপক এম শাহিদুজ্জামান।

অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলেন, ‘চীনের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাসে এ ধরনের আচরণ নতুন কিছু নয়। মানবাধিকারের প্রশ্নটি চীনের কাছে গুরুত্ব পায় না।’ বিশ্লেষকদের অনেকেই বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের ছয় মাস পার হলেও এ সংকট সমাধানের কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

এ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ঘাড়েই চেপে গেল কি না সেটি নিয়েও অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

"