বিদেশিদের কর ফাঁকি ধরতে অভিযানে এনবিআর

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০

শাহ্জাহান সাজু

বাংলাদেশে কর্মরত যেসব বিদেশি নাগরিক কর ফাঁকি দিচ্ছেন তাদের ধরতে অভিযানে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরই ধারাবাহিকতায় মাঠ পর্যায়ের কর অফিসগুলো থেকে বিদেশি কর্মীরা কর্মরত আছেন এমন প্রতিষ্ঠান পরির্দশনের জন্য এনবিআরের অনুমোদন চেয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢাকা কর অঞ্চল-২ থেকে বিদেশি নাগরিকরা নিয়োজিত আছেনÑ এমন দুইটি কোম্পানি পরির্দশনের জন্য এনবিআরে নাম পাঠানো হয়েছে। এর একটি হলো এস কিউ সেলসিয়াস লিমিটেড; যার ই-টিআইএন নম্বর-১২০৩৭৭৩০০১৩২। অন্যটি হলো এক্সপো ফ্রেইট লিমিটেড; যার ই-টিআইএন নম্বর-৩৮৩২৬৬২৭৫৭৮১।

সূত্র জানায়, এর আগে বিদেশি কর ফাঁকিবাজদের করের আওতায় আনতে অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে এনবিআরের সব কর অঞ্চলে এরই মধ্যে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বিদেশি নাগরিকরা কর্মরত রয়েছে, এমন দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা এনবিআরে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরই ধরাবাহিকতায় মাঠ পর্যায়ের কর অফিসগুলো থেকে এনবিআরে তালিকা আসতে শুরু করেছে। এনবিআরের অনুমোদনসাপেক্ষে পরবর্তীতে এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাবে এনবিআর গঠিত টাস্কফোর্স। একই সঙ্গে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ডাটাবেজের কাজও সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে সঠিকভাবে আয়কর আদায় করতে ২০১৬ সালে টাস্কফোর্স গঠন করে এনবিআর। ওই টাস্কফোর্সের সদস্য হিসেবে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), এসবি, ডিজিএফআই, এনএসআই, বাংলাদেশ ব্যাংক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বেপজা, পাসপোর্ট অধিদফতর, এনজিও ব্যুরো ও এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে। পরবর্তীতে কাজের সুবিধার্থে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলভিত্তিক টাস্কফোর্সকে ভাগ করা হয়।

সূত্র জানায়, বর্তমানে বাংলাদেশে কি পরিমাণ বিদেশি নাগরিক কর্মরত আছেন বা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন; তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বরাত দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সম্প্রতি জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বৈধভাবে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত আছেন ৪৪ দেশের ৮৫ হাজার ৪৮৬ জন বিদেশি নাগরিক। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৮৮৫ জনই নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সবচেয়ে বেশি আছেন ভারতের নাগরিক। প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির ৩৫ হাজার ৩৮৬ জন এ দেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু এনবিআরের কর অঞ্চল-১১ তে বাংলাদেশে কর্মরত মাত্র ১১ হাজার বিদেশি নাগরিক গেল করবর্ষে তাদের আয়কর বিবরণী জমা দিয়েছেন। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের সঙ্গে অসামজস্যপূর্ণ। কারণ কেবল ভারতেই প্রতি বছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি কর্মীদের করের আওতায় আনতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, অধিকাংশ বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশের ক্ষেত্রে টুরিস্ট ভিসা ব্যবহার করে থাকেন। এরপর বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। আবার বিভিন্ন কোম্পানির ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে আসা বিশেষ করে এনজিও, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্ট, মার্চেন্ডাইজিং, পরামর্শকসহ বিভিন্ন পেশায় কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের বেতন-ভাতা গোপন রাখা হচ্ছে সমঝোতার ভিত্তিতে। মূলত কর ফাঁকি দিতেই এ কৌশল অবলম্বন করছেন কিছু দেশীয় নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি গোপন চুক্তি অনুযায়ী, বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে মানিলন্ডারিংয়ের আশ্রয় নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া অবৈধভাবে আসা বিদেশিরা মাদক চোরাচালান ও জাল মুদ্রা পাচারের মতো অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। আবার অনেক বিদেশি নাগরিক অন অ্যারাইভাল ভিসা নিয়ে দেশে প্রবেশের পর ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলছেন। ফলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না।

এ বিষয়ে টাস্কফোর্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করতে একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ চলছে। যেখানে বিদেশি কর্মীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, কর্মস্থলের ঠিকানা, বাংলাদেশে বসবাসের স্থায়ী ঠিকানা, কাজের ধরন, বেতন-ভাতাদির তথ্য ও আয়কর পরিশোধের তথ্য উল্লেখ থাকবে।

সূত্র জানায়, দেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের করজালের আওতায় আনতে এরই মধ্যে তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও একটি স্থলবন্দরে আয়কর বুথ খুলেছে এনবিআর। ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত, সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরে আয়কর বুথের দায়িত্বে সহকারী কর কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়েছে। এসব বন্দর দিয়ে বাংলাদেশ ত্যাগের আগে অবশ্যই বিদেশি নাগরিকদের আয়কর প্রত্যয়নপত্র দেখাতে হচ্ছে। প্রত্যয়নপত্র দেখাতে ব্যর্থ হলে বিদেশ গমনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এনবিআরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরই মধ্যে গঠিত টাস্কফোর্স বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে অনিবন্ধিত ১৭ জন বিদেশি নাগরিককে চিহ্নিত করেছে। এদের করজালের আওতায় আনতে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চলকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই অভিযান ক্রমান্বয়ে আরো বিস্তৃত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

"