রুপা ধর্ষণ ও হত্যায় ৪ আসামির ফাঁসি

সেই বাসটি সাত দিনের মধ্যে পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

রেজওয়ান শরিফ, টাঙ্গাইল

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্তবাসে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে চারজনকে ফাঁসি ও একজনকে সাত বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক মো. আবুল মনসুর মিঞা এই রায় দেন। ফাঁসির আসামিরা হলোÑ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার নন্দিবাড়ী গ্রামের খোরশেদ আলমের ছেলে বাসের সহকারী মো. শামীম (২৭), একই জেলার কোতয়ালী থানার মির্জাপুর গ্রামের মৃত কামাল হোসেনের ছেলে আকরাম (৩৫), মৃত এমদাদুল হকের ছেলে মো. জাহাঙ্গীর আলম (১৯), ও মৃত শহিদুল ইসলামের ছেলে বাসের ড্রাইভার মো. হাবিব (৩০)।

এদিকে যে বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল, সেই ‘ছোঁয়া’ পরিবহনের বাসটি নিহত রুপার পরিবারকে সাত দিনের মধ্যে

হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে বাসের সুপারভাইজার মো. সফর আলীকে (৫৫) সাত বছরের সাজা ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রায়ে বলা হয়েছে, ফাঁসিপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ২০০০ সনের ৮নং আইন এর ৯(৩)/৩০ ধারা এবং অন্যজনের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সনের ২০১ ও ১৮৯৮ সনের ৫৪৫ ধারা প্রমাণিত হওয়ায় এই রায় দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, জরিমানার অর্থ মামলা নিষ্পত্তির খরচ বাদ দিয়ে বাকি টাকা রুপার পরিবারকে দেওয়া হবে। তবে আসামিপক্ষ সাত দিনের মধ্যে রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করতে পারবেন।

মাত্র ১৪ কার্য দিবসের মধ্যে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটির নিষ্পত্তি হয়েছে। অতি দ্রুত সময়ে মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ায় আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও নিহতের পরিবারের সদস্যরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। রায়ের পর রুপার পরিবারের সদস্যরা আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

বাদী পক্ষের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী আতাউর রহমান আজাদ বলেন, চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ায় আমরা আনন্দিত। এত দ্রুত সময়ে মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ায় আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বড়বে এবং নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সহায়ক হবে। আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. শামীম চৌধুরী দয়াল বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি। তাই এই মামলার রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। ন্যায়বিচারের জন্য আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে জাকিয়া সুলতানা রুপাকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে ‘ছোঁয়া’ নামের একটি বাসের কয়েকজন পরিবহন শ্রমিক। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার গড়াঞ্চলের পঁচিশ মাইল এলাকায় ফেলে রেখে যায়। পুলিশ ওই রাতেই তার লাশ উদ্ধার করে। ময়নাতদন্ত শেষে পরদিন বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে রুপার ভাই হাফিজুর প্রামাণিক ২৮ আগস্ট মধুপুর থানায় এসে লাশের ছবি দেখে রুপাকে শনাক্ত করেন। পরে পুলিশ ছোঁয়া পরিবহনের চালক হাবিবুর রহমান, সুপারভাইজার সফর আলী, সহকারি শামীম, আকরাম ও জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার করে। আটকরা টাঙ্গাইল সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি প্রদান করে।

গত ২৫ অক্টোবর অভিযোগপত্র গ্রহণ এবং ১৩ নভেম্বর চার্জগঠন করেন আদালত। ৩ জানুয়ারি মামলার বাদী নিহতের ভাই হাফিজুর প্রামাণিকের সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্যদিয়ে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরে মামলায় জব্দ তালিকা, সুরতহাল রিপোর্ট, চিকিৎসক, পাঁচ আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণকারী চারজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৭ জন সাক্ষীর স্বাক্ষ্য ও জেরা ১৩ কার্যদিবসে সমাপ্ত হয়। গত ৩১ জানুয়ারি এবং ১ ফেব্রুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থান করা হয়। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি আইনজীবীরা মামলার আইনগত দিক তুলে ধরার মধ্যদিয়ে মামলার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। পরে বিচারক ১২ ফেব্রুয়ারি মামলার রায়ের দিন ঠিক করেন।

"