কারাগারে খালেদা

রাজনীতিতে নানা গুঞ্জন

প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজাকে কেন্দ্র করে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে দেশের রাজনীতিতে। সামনে জাতীয় নির্বাচন। ঘুরে ফিরে আসছে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রসঙ্গটি। দলীয় চেয়ারপারসনের সাজাতে একদিকে যেমন বিএনপিকে নিয়ে মুখর রাজনীতি; তেমনি এই সাজা জাতীয় রাজনীতি, বিশেষ করে নির্বাচনী রাজনীতিতে ও নির্বাচনে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে-সে নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ। বিএনপি কি ভেঙে যাবে, নাকি সংকটের সময় ঐক্যবদ্ধ থাকবেন দলের নেতারা-সে প্রশ্ন যেমন আসছে; আবার খালেদা জিয়ার সাজার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যমান রাজনীতিকে কিভাবে দেখছে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের রাজনীতিইবা কেমন হবেÑসেদিকেও তাকিয়ে সবাই।

প্রশ্ন উঠছে-খালেদা জিয়া কি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন? না পারলে বিএনপি সেই নির্বাচনে যাবে কিনা এবং গেলেও কোনো প্রক্রিয়ায় ও কিভাবে যাবে? সেক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন প্রশ্নে সরকারইবা কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে? জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটবে কিনা?

এমন প্রশ্নও উঠছে, দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ায় জনগণ বিশেষ করে সমর্থকরা খালেদা জিয়া ও তার দল বিএনপিকে কিভাবে দেখবে? এতিমদের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ক্ষুণœ দলীয় ভাবমূর্তি ও দলের প্রতি সাধারণ মানুষের নষ্ট হওয়া আস্থা কি ফিরিয়ে আনতে পারবে বিএনপি? নাকি ক্ষুব্ধ মানুষ নির্বাচনে বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করবে? এমন পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীনরাই বা কী ধরনের রাজনৈতিক কৌশল নেবেÑসে নিয়েও আলোচনা চলছে।

খালেদা জিয়ার সাজা ও রায় পূর্ববর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এখন পর্যন্ত ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রায়ের আগে ও পরে এবং রায়ের দিন পর্যন্ত সরকার ও বিরোধীপক্ষ দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, রায়ের আগে ও পরে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আচরণ লক্ষ্য করা গেছে। যদিও বিএনপি রায়কে ‘প্রতিহিংসার’ উল্লেখ করে রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এ নিয়ে আপত্তিকর কোনো মন্তব্য করেননি। রায়ে সরকারের কোনো হাত নেই বলে আগের অবস্থানেই রয়েছেন।

এমনকি বিশ্লেষকরা এ কথাও বলছেন, খালেদা জিয়ার সাজার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সুযোগ নেই। কারণ বিএনপির রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়, নির্বাচন সামনে রেখেই তারা সতর্ক ও সমঝোতার কর্মসূচি দিয়েছে। তবে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে সেক্ষেত্রে দল কী করবে, তা নিয়ে এখন পর্যন্ত দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। সেক্ষেত্রে নির্বাচনের ভবিষ্যত কী হবেÑসেটি নির্ভর করবে আগামী নির্বাচনকে সরকার কিভাবে দেখে, তার ওপর।

তবে বিশ্লেষকরা বেশি শঙ্কিত বিএনপির সাংগঠনিক প্রেক্ষাপট নিয়ে। তাদের মতে, মাঠপর্যায়ে সমর্থক থাকলেও বিএনপির নেতারা সবার মত নিয়ে কিভাবে কাজ করবেন, সেটা এখনকার বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে কয়েকটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করায় এবং নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়া নিয়ে দলের মধ্যে ভাঙন বা বিরোধ জোরালো হতে পারে।

বিদেশ থেকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে আসা ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গত বৃহস্পতিবার পাঁচ বছরের কারাদন্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে এই মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পাঁচজনের ১০ বছরের সাজা হয়েছে। রাজধানীর বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ আদালতে খালেদার উপস্থিতিতে ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আখতারুজ্জামান এই রায় ঘোষণা করেন। রায়ের পর পরই খালেদা জিয়াকে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার সাজার ঘটনায় উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুইপক্ষই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এমনকি রায় নিয়ে কথাবার্তায়ও সতর্ক দলের নেতারা। বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার সাজা নিয়ে আপাতত কম কথা বলতে নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। সে নিদের্শ অনুযায়ী দল সিদ্ধান্ত নিয়েছে খালেদা জেলে থাকা অবস্থায় এই ইস্যুতে বিএনপি জনগণের সহানুভূতি পেতে পারেÑএমন কোনো বক্তব্য বা আচরণ করা যাবে না।

আওয়ামী লীগ মনে করছে, বিএনপি চাইবে তার (খালেদার) মামলার রায় রাজনীতিকরণ করে সুবিধা আদায় করতে। কিন্তু সেই সুবিধা তাদের দিতে নারাজ ক্ষমতাসীনরা। সেক্ষেত্রে দলের অবস্থান হবে সাধারণ মানুষকে এটা বোঝানো যে, এটি বিচারিক বিষয়। এই মামলা গত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের করা। রায় দিয়েছেন আদালত। এখানে সরকারের কিছুই করার ছিল না। সেটা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

অন্যদিকে, রায় প্রত্যাখ্যান করলেও বিএনপি এখনো নির্বাচনী পথেই হাঁটছে বলে দলের নীতিনির্ধারণী সূত্রগুলো জানিয়েছে। সূত্র মতে, বিএনপি মনে করছে আপিল বিভাগে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত হবে এবং তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল বিদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচন থেকে খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে দূরে রাখা সম্ভব হবে না। এই রায়ের মূল লক্ষ্য খালেদা জিয়া ও বিএনপিকে আগামী নির্বাচন থেকে দূরে রাখা। কিন্তু সেটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আমরা উচ্চ আদালতে এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। সরকার বাধা না দিলে তিনি প্রচলিত আইনেই বেরিয়ে আসবেন।

বিএনপি সূত্রগুলো বলছে, সাজা পরবর্তী রাজনীতিতে বিশেষ কৌশল নিয়েছে দলটি। দলের কাজ হবে জনগণকে বোঝানো যে, এই মামলায় সরকারের হাত ছিল। সরকার বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে ও নির্বাচনী রাজনীতিতে কোণঠাসা করতেই এই পথ বেছে নিয়েছে। সেক্ষেত্রে তারা সরকারকে দলের নেতাকর্মীদের দমনপীড়নের সুযোগ দেবে না। শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবে। দলের মূল কাজই হবে দলের মধ্যে যেন কোনো ধরনের বিরোধ বা ভাঙন দেখা না দেয়, সেদিকে খেয়াল রাখা। পাশাপাশি আইনিভাবে লড়ে কারাগার থেকে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা।

খালেদা জিয়ার সাজা পরবর্তী দেশের উদ্ভূত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গতকাল দেশের দুই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের সঙ্গে প্রতিদিনের সংবাদের কথা হয়। এ ব্যাপাারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ যুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খালেদা জিয়ার সাজায় বিএনপি দলীয় রাজনীতিতে শুভ প্রভাব পড়বে। জিয়া যাওয়ার পর বিএনপি সাধারণের দলে রূপ নিয়েছে। সেই সাধারণ মানুষ এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ। তাদের সমর্থন দলের ওপর পড়বে। অন্যদিকে, সরকার পুনরায় নির্বাচনে জয়ী হতে চায়। তারা সে চেষ্টা অব্যাহত রাখবে। সেজন্য তারা কৌশলের খেলা খেলবে। সেটাই স্বাভাবিক।

‘তবে সরকারকে মনে রাখতে হবে, খালেদা জিয়াকে সরিয়ে দিয়ে নির্বাচনের চিন্তা করলে ফল ভালো হবে না। অসুবিধা হবে। রাজনীতি ও গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকারও বিপদে পড়তে পারে’Ñএমন কথাও বলেন এমাজউদ্দীন আহমদ।

তবে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মীজানুর রহমান। তিনি বলেন, রাজনীতিতে প্রভাব পড়বে। সেটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে, সার্বিক রাজনীতিতে নয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে আবেগ কাজ করবে। সেটার সঙ্গে সাধারণ মানুষ জড়িত নয়। কারণ অতীতে বড় বড় রাজনৈতিক নেতাদের জেলে যাওয়া বা ইস্যুর সঙ্গে এই ইস্যুর কোনো মিল নেই। এটি জনস্বার্থের ইস্যু নয়। বিএনপি চাইলেও এই ইস্যুকে সার্বিক রাজনীতিতে কাজে লাগাতে পারবে না। খালেদা জিয়ার সাজায় সাধারণ মানুষের কিছু যায় আসে না।

এই বিশ্লেষক আরো বলেন, খালেদা জিয়ার সাজার ঘটনাকে আইনগতভাবেই মোকাবিলা করতে হবে বিএনপিকে। কারণ এর আগেও জ্বালাও পোড়াও রাজনীতি করে বিএনপির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জনগণ তাদের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করেছে।

‘তবে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দেবে দলের মধ্যে’Ñউল্লেখ করে অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, বিএনপির মধ্যে সংকট ঘনীভূত হবে। তারেক রহমান কয়েকটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত দন্ডিত আসামি। তার নেতৃত্বে এখন দল পরিচালিত হবে। এতে দল দুর্বল হওয়ার ক্ষেত্রে কাজ করবে। দলের মধ্যে সংকট দেখা দেবে। আশঙ্কা করা হচ্ছে দল ভাঙা-গড়ার বিষয়টি মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে। বিরোধ জোরালো হবে। কারণ তারেক রহমানকে অপেক্ষাকৃত উদারপন্থী নেতারা মেনে নিতে চাইবে না।

সেক্ষেত্রে সরকার কী ধরনের ভূমিকায় যেতে পারেÑজানতে চাইলে এই উপাচার্য বলেন, বিএনপিকে নির্বাচনে আনার চেষ্টা করবে সরকার। চাইবে বিএনপিসহ সব দল নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগ সে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর যদি বিএনপি না আসে, তা হলে ভিন্নভাবে অন্যদলগুলোকে নিয়েই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করবে সরকার। তাছাড়া দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকাই এবার বিএনপির লোকজনই নির্বাচনে আসতে চাপ দেবে। সেক্ষেত্রে বিএনপির নির্বাচনে আসার সম্ভাবনা আছে।

রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ প্রসঙ্গে অধ্যাপক মীজানুর রহমান বলেন, মেরুকরণ তো পড়বেই। দুর্নীতি করলে শাস্তি পেতে হয়-এই বার্তা গেল সবার কাছে। সবাই সতর্ক হবে এখন। সবাই এখন নির্বাচনের দিকেই হাঁটবে।

"