গেট ভেঙে ঢাবি ভিসিকে ঘেরাও শিক্ষার্থীদের পেটাল ছাত্রলীগ

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

ঢাবি প্রতিনিধি

ছাত্রী নিপীড়নের অভিযোগে যে সংগঠনের নেতাকর্মীদের বহিষ্কারের দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অবরোধে চার ঘণ্টার বেশি আটকে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানÑ সেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাই তার উদ্ধারে এগিয়ে এসেছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে নিজের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ থাকার পর বিকেলে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইনের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে মুক্ত করতে এগিয়ে যায়। এ সময় উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামানের কার্যালয়ের সামনে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন।

ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মাসুদ আল মাহাদী, ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের প্রগতি বর্মণকে মারধর করে ছাত্রলীগের বিভিন্ন হল শাখার নেতাকর্মীরা। তবে ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ দাবি করেছেন, তারা কেবল অছাত্রদের হামলা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে উদ্ধার করতে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ এখানে হস্তক্ষেপ বা মারামারি করতে যায়নি। ছাত্রদল এবং জামায়াত-শিবির এবং কিছু বাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অবরুদ্ধ এবং তার উপর হামলা করেছে শুনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়ে সেখানে গিয়েছিল ছাত্রলীগ। এসময় ফটক ভাঙচুরকারী শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের দাবিও জানান তিনি।

রাজধানীর সরকারি সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ব্যানারে গত ১৫ জানুয়ারির আন্দোলন কর্মসূচিতে ছাত্রীদের ওপর ছাত্রলীগের ‘নিপীড়নের’ প্রতিবাদে বর্তমানের ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দের’ ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়।

অধিভুক্তি সমস্যার সমাধান ছাড়াও নিপীড়নে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের বহিষ্কার ও প্রক্টরের অপসারণসহ চার দফা দাবিতে গত সপ্তাহ থেকে এই আন্দোলন চালিয়ে আসছে তারা। গতকাল দুপুর ১২টায় উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে এসে অন্তত তিনটি ফটক একে একে ভেঙে বেলা দেড়টার দিকে উপাচার্যের দরজার সামনের করিডোরে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তিন ঘণ্টার বেশি অবরুদ্ধে থাকার পর বিকেল সোয়া ৩টার দিকে বোর্ড অব এডাভান্সড স্টাডিজের একটি সভায় অংশ নিতে সিনেট ভবনে যেতে নিজের কার্যালয়ের পেছনের ফটক দিয়ে বের হন উপাচার্য; পথে উপাচার্যের চার পাশ ঘিরে অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।

এ সময় আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র মাসুদ আল মাহাদী উপাচার্যের কাছে তাদের দাবিগুলো তুলে ধরে পূরণের দাবি জানান।

জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে এ বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরে আন্দোলনকারীরা প্রক্টরের পদত্যাগ এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যাহারের দুটি দাবি তৎক্ষণাৎ ঘোষণা দিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাদের ভাষ্য, এটার জন্য কোনো প্রক্রিয়ার দরকার নেই। এর মধ্যেই বেলা পৌনে ৪ টার দিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি আবিদ আল হাসানসহ ছাত্রলীগের ২০-২৫ জন নেতাকর্মী ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ সেøাগান দিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। তারা উপাচার্যকে মুক্ত করে ফের তার কার্যালয়ে নিয়ে যান। এ সময় উপাচার্যের কক্ষের সামনের করিডোরে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের রড নিয়ে তাড়া করে কয়েকজনকে মারধরও করেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এরপর কিছুক্ষণের জন্য অবরোধকারীরা উপাচার্যের দরজা সামনে থেকে সরে গেলেও বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিভিন্ন হল থেকে বিপুল সংখ্যক ছাত্রলীগ নেতাকর্মী এসে রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।

হামলার পর উপাচার্য কার্যালয় থেকে সিনেট ভবনের দিকে যাওয়ার ফটক দিয়ে চলে যেতে চাইলেও সেখানে আরেক দল ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর হামলার শিকার হয় আন্দোলনকারীরা। ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা তাদের ধাওয়া করলে প্রশাসনিক ভবনের ভেতর দিয়ে মূল ফটক হয়ে বেরিয়ে যেতে চান আন্দোলনকারীরা। কিন্তু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ধাওয়া করে আন্দোলনকারীদের মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দীকে বেধড়ক মারধর করা হয়।

এর আগে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী দাবি করেছেন, প্রক্টর অফিস থেকে কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেই কোনো মামলা করা হয়নি।

নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীদের ৪ দফা দাবি ও তা না মানার বিষয়ে ঢাবি উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। তাদেরকে দ্রুত প্রতিবেদন জমা দেয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।’

অবশ্য ৫০-৬০ জন অজ্ঞাতনামা শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলার বিষয়ে প্রক্টর বলেন, ‘প্রক্টর অফিস থেকে কোনো শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়নি।’ শিক্ষার্থীদের ৪ দফা দাবি মেনে না নেওয়ায় পূর্ব কর্মসূচি অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করে শিক্ষার্থীরা

"