বিএনপির সহায়ক সরকারের ফর্মুলা আগামী মাসে

প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

বদরুল আলম মজুমদার

আগামী নির্বাচনের পথে আনুষ্ঠানিকভাবে না নামলেও ভেতর ভেতর ঠিকভাবেই চলছে বিএনপির নির্বাচনী প্রস্তুতি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও মূল ‘ফোকাস’ আগামী নির্বাচনী রাজনীতির কর্মকৌশল থেকে সরেনি বিএনপি। সেই লক্ষ্যে খালেদা জিয়া সামনের মাসের শেষ দিকে সহায়ক সরকার ফমুর্লা উপস্থান করতে পারেন জাতির সামনে। বিএনপির একাধিক সূত্র এমনই বলছে।

দলীয় প্রধানের মামলা ছাড়াও বিএনপির সকল পর্যায়ের নেতারা প্রায় ৭৮ হাজার ফৌজদারি মামলার আসামি। গত সোমবার জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের এক অনুষ্ঠানে এমন দাবি করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রায় ৭৮ হাজার মামলা করা হয়েছে বিরোধী দলের নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। আর এসব মামলায় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ আসামি করা হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। আমাদের বক্তব্য খুব পরিষ্কারÑ এসব মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদেরকে কারাগারে রেখে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে কোনো নির্বাচন এখানে হবে না।’

সূত্র জানায়, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে সমঝোতা অথবা রাজপথের আন্দোলন এমন কৌশল মাথায় রাখছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, সরকার অনড় হলেও সমঝোতার পথ এখনো ফুরিয়ে যায়নি। বিএনপি সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতা কিংবা আলোচনার টেবিলে ক্ষমতাসীন দলকে বসার আহ্বান জানিয়ে যাবে। সরকার সে আহ্বানে সাড়া না দিলে আন্দোলনের পথই বেছে নেওয়া হবে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর অথবা ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে একাদশ সংসদ নির্বাচন। বিএনপি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করায় আগামী নির্বাচন নিয়ে নানা শঙ্কা ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে।

অন্য দিকে সরকারের তরফ থেকে বিএনপির আলোচনায় বসার আহ্বান নাকচ করে দেওয়া হচ্ছে বার বার। সরকারের চতুর্থ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেছেন, নির্বাচন হবে সংবিধান অনুযায়ী। অর্থাৎ বর্তমান সরকারই হবে নির্বাচনকালীন সরকার। আর ওই সরকারের প্রধান থাকবেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর বিএনপি আগামী দিনে কী করবে, তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে দলটি বেশ সতর্ক। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে অতি উৎসাহী নয় দলের নেতারাও। কোনোরকম দাবি আদায় না করে নির্বাচনে যাওয়া মানে আত্মহত্যা করা। দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে সকলের এমন ভাবনা থাকলেও ভেতর ভেতর চলছে নির্বাচনী প্রস্ততিও। তবে, সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পর্যবেক্ষণ করেই কৌশল নির্ধারণ করবে দল। বিএনপি আগামী নির্বাচনের আগে নির্বাকালীন সরকার নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরতে চায়। সেই প্রস্তাবনা তৈরির কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। এখন যে কোনো সময় সেই রূপরেখা ঘোষণা করবে বিএনপি। আর নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কোনো সমঝোতা না হলে নির্বাচনের ছয় মাস আগে ‘অল আউট’ আন্দোলনের পথ বেছে নেওয়া হতে পারে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধরীও এমন কথাই বলছেন। তিনি বলেন, বিএনপি যে রূপরেখা দিবে তাতে আলোচনার একটি ক্ষেত্র তৈরির চেষ্টা করা হবে। এতে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন থাকবে। এটিকে ভিত্তি ধরে জাতীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি নির্বাচনী ব্যবস্থায় পৌঁছানোও যাবে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এখন চলমান রয়েছে ৩৭টি মামলা। এর মধ্যে চারটি মামলা করা হয় বিগত সেনা-সমর্থিত ১/১১র সরকারের সময়ে। বাকি ৩৩টি মামলা করা হয় বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। হত্যা, সহিংসতা, রাষ্ট্রদ্রোহ, দুর্নীতি, আদালত অবমাননাসহ নানা অভিযোগে এসব মামলা করা হয়। ১৭টি মামলায় ইতোমধ্যে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার গতি অতি দ্রুত।

দলটির নেতারা বলছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন, এমনই আশা তাদের। তবে সরকার যদি এ মামলাকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাজা দিয়ে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে, তাহলে দলীয় কৌশল পাল্টে যাবে নিশ্চিতভাবে।

আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রতিদিনের সংবাদকে বলেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। এ প্রস্তাবে সরকার রাজি না থাকলেও শেষ পর্যন্ত তারা সব দলকে নিয়ে সংলাপে বসতে বাধ্য হবে। কারণ এবার আর ২০১৪ সালের পরিস্থিতি এক নয়। বিষয়টি ক্ষমতাসীনরাও উপলব্ধি করছেন বলে আমরা মনে করি।

বিএনপির নির্বাচন প্রস্তুতির কার্যক্রমও থেমে নেই। সময় মতো সে প্রস্তুতির বিষয়টি সামনে তুলে আনবে দল। বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, সময় বুঝে রাজনৈতিক দলকে সিন্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এসব সিদ্ধান্তের সব কার্যকর হয় বা হয় না। তারই রাজনৈতিক দল হিসেবে বসে থাকার সুযোগ নেই। একটি জনসম্পৃক্ত ও গতিশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সে সক্ষমতা রয়েছে। বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী, সক্রিয় এবং কোন্দল কমাতে এক নেতা এক পদ নীতিসহ দলের গঠনতন্ত্রে ব্যাপক সংশোধনী আনা হয় কাউন্সিলে। ইতোমধ্যে সেসব নীতির বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পুনর্গঠন করা হয়েছে দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ চারটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন। এসব পুনর্গঠনেও রয়েছে দলটির নির্বাচনমুখী রাজনীতি। যার ধারাবাহিকতায় সামনের কয়েক মাসে মধ্যে ঢাকা মহানগর, সারা দেশে জেলা ও মহানগরসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন পুনর্গঠন সম্পন্নের লক্ষ্যে কাজ চলছে। আগামী নির্বাচনের প্রচারণা বা আন্দোলনে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখতেই নানা প্রতিকূলতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলেও বসে নেই বিএনপি।

"