যেসব বরেণ্য ব্যক্তিকে হারিয়েছে দেশ

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

জুবায়ের চৌধুরী

গেল বছর বেশ কয়েকজন বরেণ্য ব্যক্তিকে হারিয়েছে দেশ। রাজনীতি, চলচ্চিত্র, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক গুণীজন চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তবে তারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন দেশবাসীর মনের গহিনে। নতুন বছরের শুরুতে আরো একবার শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিদিনের সংবাদ পাঠকদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হলো মৃত্যুঞ্জয়ীদের।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত : দেশের একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। সুনামগঞ্জ থেকে সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সত্তরের নির্বাচনেও তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে তার মতো প-িত ব্যক্তি ছিলেন হাতেগোনা। নতুন আইন তৈরি, আইনের সংস্কারÑসবখানে ছিল তার দক্ষ হাতের ছোঁয়া। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তাকে হারিয়েছে দেশ।

মহিউদ্দিন চৌধুরী : চট্টগ্রামের মাটি আর মানুষের প্রাণের নেতা ছিলেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। ১৯৯৪ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। ২০০৫ সালে মেয়র নির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপির এক মন্ত্রীকে পরাজিত করে তৃতীয়বারের মতো চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হন। আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা রেখে তিনি বছরের বিদায়লগ্ন ১৫ ডিসেম্বর পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

ছায়েদুল হক : দেশের রাজনীতিবিদের সততা সহজে চোখে পড়ে না। কিন্তু মৃত্যুর পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কৃতী সন্তান ছায়েদুল হকের সততা সবার সামনে এসেছে। তিনি প্রয়াত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক। মৃত্যুই যেন চোখে আঙুল দিয়ে তার সরল-সাধারণ জীবনযাপনের কথা জানিয়ে গেল। জনপ্রিয় এই রাজনীতিবিদ থাকতেন পুরাতন দুই টিনের ঘরে। জেলার সার্কিট হাউসের এক দিনের ভাড়াও বাকি রেখে যাননি। নির্লোভ এই মানুষটি বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর চলে যান না ফেরার দেশে।

আনিসুল হক : বিটিভির অনুষ্ঠান সঞ্চালক হিসেবে জনপ্রিয়তা পান। যারা আনিসুল হককে সেই সময় দেখেছেন, তারা জানেন সেই জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়েছিল। এরপর শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা হয়েও সমান জনপ্রিয়। তবে সব জনপ্রিয়তা ছাপিয়ে গেছে মেয়র আনিসুল হকের কাছে। অল্প দিনেই তিনি যা করেছেন, অনেকে বহু দিন চেষ্টা করেও তা করতে পারেননি। গত ৩০ নভেম্বর প্রিয় মানুষটি চিরবিদায় নেন।

এম কে আনোয়ার : বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ খোরশেদ আনোয়ার। তিনি এমকে আনোয়ার নামে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান আমলে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশেও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারের অর্থসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৯০ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর এমকে আনোয়ার রাজনীতির মাঠে নামেন এবং যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর কুমিল্লার হোমনা থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এমকে আনোয়ার খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারে দুই দফা মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। গত ২৪ অক্টোবর জীবনের ৮৪ বছর বয়সে চলে যান না ফেরার দেশে।

জিয়াউদ্দিন আহমেদ : একাত্তরে সুন্দরবন অঞ্চলে মুক্তি বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মেজর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ২৮ জুলাই সিঙ্গাপুরে মারা যান। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর সুন্দরবনে আশ্রয় নেন। পরে গ্রেফতারও হন। কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝোলানোর পাশাপাশি জিয়াউদ্দিনকে ১২ বছরের কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। ১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মুক্তি পান। স্থানীয়ভাবে তাকে ডাকা হতো সুন্দরবনের ‘মুকুটহীন স¤্রাট’ নামে। মুক্তিযুদ্ধকালীন সুন্দরবনের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে তিনি ?‘সুন্দরবন সমরে ও সুষমায়’ নামে একটি বইও লিখেছেন।

নায়করাজ রাজ্জাক : নায়করাজ একজনই। তিনি হচ্ছেন বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজ রাজ্জাক। তিনি একাধারে অভিনেতা, প্রযোজক ও পরিচালক। বেহুলা, আগুন নিয়ে খেলা, এতটুকু আশা, নীল আকাশের নিচে, জীবন থেকে নেয়া, ওরা ১১ জন, অবুঝ মন, রংবাজ, আলোর মিছিল, অশীতি, ছুটির ঘণ্টা, বড় ভালো লোক ছিল, বাবা কেন চাকরসহ তিন শতাধিক বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন। তার সাবলীল অভিনয়শৈলী সবাইকে ছাপিয়ে অনন্য উচ্চতার আসনে বসিয়েছে তাকে। গত ২১ আগস্ট বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রিয় ব্যক্তিত্বকে হারিয়েছে দেশ।

বারী সিদ্দিকী : ‘শুয়া চান পাখি আমি ডাকিতেছি তুমি ঘুমাইছো নাকি?’ সত্যিই শুয়া চান পাখি শেষ ঘুম ঘুমালেন। সবাইকে কাঁদিয়ে গত ২৪ নভেম্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে যান না ফেরার দেশে। বারী সিদ্দিকীর মতো এত সুন্দর বাঁশি কে কবে বাজিয়েছে তা কে-ই বা বলতে পারেন। কী বাঁশিতে, কী সুরে সমান জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। তার বাঁশি আর কেঁদে উঠবে না এবং তার সুর আর হৃদয় রাঙাবে না।

আবদুল জব্বার : সালাম সালাম হাজার সালাম, লাখো শহীদ স্মরণে আমার হৃদয় রেখে যেতে চাই তাদের স্মৃতির চরণেÑএখান থেকে ওরে নীল দরিয়া আমায় দে রে দে ছাড়িয়া, বন্দি হইয়া মনোয়া পাখি হায়রে কান্দে রইয়া রইয়া। আবদুল জব্বারের অমর এই গানের শ্রোতা বাংলাদেশের সবাই। জয়বাংলা বাংলার জয় কোটি প্রাণ একসঙ্গে জেগেছে অন্ধ রাতে নতুন সূর্য ওঠার এইতো সময়Ñআবদুল জব্বারের এই গানে মুক্তিযুদ্ধের মতো আজও উজ্জীবিত হয় কোটি প্রাণ। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও তার কণ্ঠের জাদুতে মোহিত হয়েছেন শ্রোতামাত্রই। এখনো মুখে মুখে ফেরে পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি তার সাথে এই মনটারে বেঁধে নিয়েছিÑএমন অসংখ্য গান আর সুর বহুকাল বেঁচে থাকবে। গত ৩০ আগস্ট সুরের মায়া কাটিয়ে চলে যাওয়া আবদুল জব্বারকে আমরা খুঁজব সুরে-গানে।

লাকী আখন্দ : আমায় ডেকে না-ফেরানো যাবে না, ফেরারি পাখিরা কোলায় ফেরে নাÑসত্যিই শতবার ডেকেও আমরা তাকে আর ফেরাতে পারিনি। সুর¯্রষ্টা কোটি ভক্তের হৃদয় ভেঙে গত ২১ এপ্রিল চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আর কোনো দিন তিনি গাইবেন না এই নীল মনিহার, আবার এলো যে সন্ধ্যার মতো জনপ্রিয় গানগুলো। দেশের অনেক বরেণ্য শিল্পীর গানের সুর আর কথায় লাকী আখন্দ অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন আমাদের হৃদয়ের মনিহারে।

দ্বিজেন শর্মা : যান্ত্রিকতা মানুষকে গ্রাস করেছে। কোন গাছের কী নাম। ঘাসফুল কেন এত সুন্দর হয়, কেন সেথায় চোখ হারায় উদাসী পথিকেরÑএসব ভাবার যেন সময় নেই। এ অস্থিরতা আর দূষণের মধ্যেও যে মানুষটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে প্রকৃতিকে চেনাতেন, জানাতেন তিনি দ্বিজেন শর্মা। গত ১৫ সেপ্টেম্বর আমরা হারাই এই নিসর্গ সখাকে।

এ ছাড়া ২৯ সংসদ সদস্য চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬ জন সাবেক। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের। দলটির সাবেক ও বর্তমান মিলে ১৩ সংসদ সদস্য মারা গেছেন। আর দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির ১১ সাবেক সংসদ সদস্য মারা গেছেন। তাদের মধ্যে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিও রয়েছেন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির চারজন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের একজন সাবেক সংসদ সদস্য মারা যান।

"