ব্যাংক খাত-চালের মূল্যে ম্লান অর্থনীতির সাফল্য

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

বিশেষ প্রতিনিধি

অর্থনীতির বেশির ভাগ সূচকই ছিল উন্নতির দিকে। দেশ স্বাধীনের পর বিদায়ী বছরেই প্রথম সর্বোচ্চ উচ্চতায় উঠেছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধির পথেই ছিল রাজস্ব আদায়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, রফতানি আয় ও প্রবাসী আয়। অর্থনীতির অন্যতম অনুষঙ্গ রাজনৈতিক পরিবেশও ছিল স্থিতিশীল। তারপরও আশানুরূপ সফলতার মুখ দেখেনি সার্বিক অর্থনীতি। অর্থনৈতিক সাফল্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে লাগামহীন চালের বাজার ও ব্যাংক খাতের বিশৃঙ্খলার কারণে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কয়েক দফা আগাম বন্যায় দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে চাল মজুদ তলানিতে ঠেকেছিল। খাদ্য ঘাটতি মেটাতে ও মজুদ বাড়াতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীদের চাল আমদানির ওপর শুল্ক কমাতে হয়েছে।

চালের এমন মূল্যবৃদ্ধি ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের অভাবই মূলত অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে এই দুই সংকট কাটিয়ে উঠতে পারলে নতুন বছরে দেশের অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর অধ্যাপক খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এই মুহূর্তে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটা দাগে ভালো। অর্থনীতি অগ্রগতির দিকেই যাচ্ছে। গত দু’বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের বেশি। মাথাপিছু আয়সহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন সূচকে গেল বছর আমরা বেশ ভালো করেছি। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুসহ অনেকগুলো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত উল্লেখযোগ্য কিছু সামাজিক ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে। চীন, রাশিয়া ও ভারতসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য এগিয়ে চলছে। এগুলো আশার খবর। ফলে অর্থনৈতিক বিচারে বিদায়ী বছর ভালো গেল। পরিস্থিতি এমন থাকলে নতুন বছরে অর্থনৈতিকভাবে আমরা আরো দ্বিগুণ গতিতে অগ্রসর হব।

তবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সার্বিক অর্থনীতি ভালো গেলেও চালের বাড়তি দামের কারণে সাধারণ মানুষের খুব কষ্টে কেটেছে। অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের বাজারও অস্থিতিশীল ছিল। বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের দক্ষতার অভাব ছিল। এর নেতিবাচক প্রভাব ছিল অর্থনীতিতে। আগামী বছর এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে না পারলে অর্থনৈতিক সাফল্যের গতিতে বাধা পড়তে পারে।

বিদায়ী বছরে সার্বিক অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অর্থনীতির মূল পরিমাপক মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ভালো। এই জিডিপির ওপরই নির্ভর করে দেশের উন্নতি বা অবনতি। গত নভেম্বরে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রবৃদ্ধির চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের অর্থনীতির ইতিহাসে এই প্রথম এত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হলো, যা ছিল নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এর আগে স্বাধীনতার পর ১৯৭৩-৭৪ থেকে ১৯৭৯-৮০ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। পরের ১০ বছর জিডিপি বেড়েছে প্রায় ৫ শতাংশ হারে। এরপর থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেছে ৬ শতাংশ। তবে অর্থনীতিবিদদের মত, এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব মানুষ সমানভাবে পাচ্ছে না। সমাজে বৈষম্য বেড়েছে। এই সংকটের সমাধান দরকার।

একইভাবে গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডার বিদায়ী বছরের জুনে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে তিন হাজার ৩০০ কোটি (৩৩ বিলিয়ন) ডলার ছাড়ায়। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এক লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। ওই অঙ্ক ছিল আগের বছরের চেয়ে প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

একইভাবে খরা কেটেছে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে। দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বিদেশে থাকা কর্মীদের অর্থ পাঠানোর পরিমাণ বেড়েছে। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ কম। তবে চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে ৫ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স দেশে এসেছে। এই অঙ্ক গত ২০১৬ সালের একই সময়ের চেয়ে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি। আর বিদায়ী ডিসেম্বরের ২২ দিনে (১ ডিসেম্বর থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত) এসেছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

গতি এসেছে বিনিয়োগে। দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ অর্ধেক শেষ হয়েছে। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার চালু করা হয়েছে। রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজও এগিয়ে চলছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস দুই খাতে সরকার প্রচুর বিনিয়োগ করায় উৎপাদন বেড়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের কাজ সম্পন্নসহ আরো কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি অর্থনীতির জন্য সুখবর।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরো সুখবর হচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়ে প্রায় ১৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদায়ী জুন-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্য ধরা ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছরের অক্টোবর শেষে তা ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্যাংক ঋণের সুদের হারও কমতির দিকে।

গত অর্থবছরে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হার ছিল ৯০ শতাংশের ওপরে। চলতি অর্থবছরের পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) এডিপি বাস্তবায়নের হার ২৫ শতাংশের মতো। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশে প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছিল, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশ।

অন্যদিকে রফতানি আয়ে ইতিবাচক ধারা ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারলেও গতি খুবই ধীর। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ পণ্য রফতানি থেকে মোট ৩৪ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে মাত্র ১ দশমিক ৭২ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে অর্থাৎ বিদায়ী বছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এই হার বছরের শেষ পর্যন্ত একই রকম ছিল।

তবে বছর জুড়ে ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা গোটা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন দেওয়া ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগ সরকারের অনেক অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে আর্থিক অবস্থার অবনতির তালিকায় রয়েছে ১৩টি। বেসরকারি ফারমার্স ব্যাংক ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক ধুঁকছে; বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের অবস্থাও খারাপের দিকে। বিদায়ী বছরের শেষের দিকে ফারমার্স ও এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ঢেলে সাজানো হয়েছে। সরানো হয়েছে দুই ব্যাংকের এমডিকেই। শুধু বেসিক ব্যাংক নয়, সরকারের অন্য বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর অবস্থাও বেশ খারাপ।

নিয়মনীতি না মেনে ঋণ দেওয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে আর্থিক খাতে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নয় বছরে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা হয়েছে। বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭৩০ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ১০ দশমিক ৬৭ শতাংশ ঋণই খেলাপি। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ২০১৮ সালে ব্যাংকের দিকেই সরকারের সবচেয়ে বেশি সতর্ক এবং নজর দেওয়া উচিত।

একইভাবে মূল্যস্ফীতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখার লক্ষ্য ধরেছে সরকার। বাজেট ঘোষণার পর বেশ কিছুদিন মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও কিন্তু বিদায়ী বছরের শেষ দিকে এসে তা বেড়ে ৬ শতাংশ অতিক্রম করে। সবশেষ গত অক্টোবরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৬ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। আর ১২ মাসের গড় হিসাবে এই হার ছিল ৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের কম দামের কারণে গত দুই বছর সামগ্রিক আমদানিতে ধীরগতি দেখা গেলেও ২০১৭ সালের পুরো সময় ধরেই আমদানিতে বেশ চাঙ্গাভাব ছিল। দুই দফা বন্যায় উৎপাদন কমায় চাল আমদানি বেড়েছে লাফিয়ে লাফিয়ে, যা বছরের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এখনো অব্যাহত আছে। এর সঙ্গে জ্বালানি তেল, মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিও বেশ বেড়েছে।

অস্থিরতা ছিল মুদ্রা বাজারে। আন্তব্যাংক মুদ্রা বাজারে প্রতি ডলারের দর প্রায় ৮৩ টাকায় উঠেছিল বছরের শেষ দিনে। ব্যাংকগুলো এর থেকেও দেড়-দুই টাকা বেশি দামে ডলার বিক্রি করেছে। ২০১৬ সালের ২০ ডিসেম্বর আন্তব্যাংক মুদ্রা বাজারে ১ ডলার কিনতে ৭৮ টাকা ৮৫ পয়সা খরচ করতে হয়েছিল। বিদায়ী বছরের একই দিনে সেই এক ডলারের জন্য লেগেছে ৮২ টাকা ৭০ পয়সা। এভাবে ডলারের বিপরীতে টাকার দর কমায় রেমিট্যান্স ও রফতানি খাত লাভবান হলেও আমদানি খরচ বাড়ছে।

"