সংকট সফলতা নিয়েই নতুন বছরে সরকার

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

প্রতীক ইজাজ

দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে অতটা ভাবতে হয়নি সরকারকে। তবে রোহিঙ্গা ইস্যু কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি সামলাতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। চালের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের ঊর্ধ্ব মূল্য ও ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ছিল বটে; তার পরও বিচক্ষণ অর্থনৈতিক ভাবনা ও প্রয়োগের কারণে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির মূলসূচকগুলোর অগ্রগতি অব্যাহত ছিল। আগাম বন্যায় ফসলের ক্ষতি ও পাহাড়ধসে মানুষের মৃত্যুসহ নানা প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ বারবার চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। গুম-অপহরণসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সরকারের ব্যাপারে এক ধরনের স্বস্তি এনেছে মানুষের মাঝে। বিশেষ করে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণাধীন পদ্মা সেতু ও রাশিয়া, চীন, ভারতসহ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিÑভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ইঙ্গিত বহন করেছে।

এ ছাড়া দেশের মানুষের কল্যাণে নেওয়া নানা উদ্যোগ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অসাম্প্রদায়িক ও কল্যাণকর সরকারের পথেই রেখেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত রাষ্ট্রের যে স্বপ্ন, বছরের শেষ দিন পর্যন্ত সরকারের বিভিন্ন কর্মকান্ডে সে রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে।

তবে বিদায়ী বছর ছিল সরকারের জন্য বেশ ঘটনাবহুল। নতুন ও জটিল অভিজ্ঞতার বছরও। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে কেন্দ্র করে বিচার ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সম্পর্কের টানাপড়েন ও শেষ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছে সরকারকে। এ নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চেষ্টাও চলেছে। কিন্তু বিচক্ষণতার সঙ্গে সে সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান এসেছে।

এমনকি সবচেয়ে বড় যে ঘটনা ও সরকারের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা রোহিঙ্গা ইস্যুÑরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতানের কারণে সমাধান এসেছে সেখানেও। দেশের ভেতর তো বটেই, রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেশ সুনাম কুড়িয়েছে বাংলাদেশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতি সামাল দিয়ে বিশ্বকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড় করানোর মতো বিরাট সাফল্যÑএ অঞ্চলে এই প্রথম। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং মিয়ানমারের মিত্র রাশিয়া ও চীনসহ অন্য মিত্রশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অক্ষুণœ রেখেই শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে সম্মত হতে বাধ্য করেছে সরকার।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ইউনেসকো স্বীকৃতি পেয়েছে বিদায়ী বছর। ভাষণটি বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেসকোর ‘ইন্টারন্যাশনাল মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টারে’ যুক্ত হয়েছে। একইভাবে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ও রোহিঙ্গাদের মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সোচ্চার থাকায় যুক্তরাজ্যের টেলিভিশন ‘চ্যানেল ফোর’ বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ আখ্যা দিয়েছে। দুবাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম খালিজ টাইমস তাকে ‘স্টার অব দ্য ইস্ট’ (প্রাচ্যের তারকা) ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘এশিয়ান এজ’ প্রধানমন্ত্রীকে হিটলারের নাৎসি বাহিনীর হাত থেকে ইহুদির রক্ষাকারী রাউল ওয়ালেনবার্গের সঙ্গে তুলনা করেছে। উভয় ঘটনায় বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু হয়েছে বাংলাদেশের।

এমন নানা ঘটনা, ঘাত-প্রতিঘাত ও সংকট পেরিয়ে বেশ সফলভাবেই বছরটি পার করল টানা দুই দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার। পা দিল নতুন বছরে। নতুন সম্ভাবনায়। বিদায়ী বছরের অমীমাংসিত অনেক ইস্যু যেমন রয়েছে, তেমনি পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আচমকা দেখা দিতে পারে নতুন অনেক ইস্যু। নতুন বছর একাদশ জাতীয় নির্বাচনের বছর। রাজনৈতিক উত্তাপ দেখা দেবে। নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে মরিয়া হয়ে মাঠে নামবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি। রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে হবে সরকারকে। জনগণকে আস্থায় রেখে অব্যাহত রাখতে হবে উন্নয়ন কর্মকা-। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে মন্ত্রী ও দলীয় সংসদ সদস্যসহ নেতা ও সুবিধাভোগীদের। কেননা ক্ষমতার শেষ বছরে এসে রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠার সংস্কৃতি এই দেশে পুরোনো।

এ ব্যাপারে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, বিদায়ী বছরটি মোটামুটি সফলভাবেই পার করেছে সরকার। নতুন বছর হবে নির্বাচনী বছর। রাজনৈতিক উত্তেজনা থাকবে। গণতন্ত্র চর্চার মূল হচ্ছে ভোট। সেই ভোটের বছর। সে ক্ষেত্রে সহনশীল রাজনৈতিক আচরণের প্রকাশ ঘটাতে হবে সরকারকে। কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয় সরকার, সেটার ওপর নির্ভর করবে বিদায়ী বছরের অর্জন কতটুকু কাজে লাগল।

‘তবে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও নেতাদের মধ্যে আচরণগত ব্যবহার নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। এই মনোবৃত্তি কঠোরভাবে দমন করতে না পারলে সরকার ও দলের জন্য বুমেরাং হবে। বিদায়ী বছরে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভোটের মাধ্যমে বদলা নেবে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। বিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ক্ষতি পুষিয়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। তা না হলে মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ভোটে প্রভাব পড়তে পারে’Ñবলেও মনে করেন অধ্যাপক মিজানুর রহমান।

এ ব্যাপারে সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘সরকার খুবই সতর্ক ও সংযত। এমন কোনো পরিস্থিতি হতে দেওয়া হবে না, যাতে সরকারের ভাবমূর্তি ও অর্জন নষ্ট হয়। কারণ সরকার যে উন্নয়ন কর্মকা- করেছে, তাতে আগামীতে মানুষ আবারও আওয়ামী লীগকেই ভোট দেবে।’

বিদায়ী বছরে সরকার ও ক্ষমতাসীনদের মূল সাফল্য ছিল রাজনীতিতে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খুবই কৌশলী ও সংযত রাজনীতি ছিল ক্ষমতাসীনদের। আর এই মূল নেতৃত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতায় আরোহণের শুরু থেকেই বিদায়ী বছর পর্যন্ত দেশের প্রাকৃতিক কিংবা মনুষ্যসৃষ্ট অথবা রাজনৈতিক সব সংকট সামনে থেকে সামলেছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এসব সংকটকালীন ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির সুফলও ঘরে তুলেছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

বিশ্লেষকদের মতে, দল ও দেশ পরিচালনায় বিচক্ষণতা ও নেতৃত্বের দৃঢ়তায় শেখ হাসিনা এক নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলছেন। তৃণমূলের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তার নাম উচ্চারিত হয়েছে। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতার মধ্যেও তার হাত ধরে সফলতা এসেছে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। কূটনীতি, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নের মতো সবক্ষেত্রেই ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। বিশ্বরাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশ।

রাজনীতি আর অর্থনীতির পাশাপাশি শেখ হাসিনা বেশি সফল হয়েছেন কূটনীতিতে। দূরদৃষ্টি সম্পন্ন নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে তিনি দুই প্রভাবশালী চীন ও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্ব সুদৃঢ় করেছেন। তার জাদুকরী নেতৃত্বেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক ও উন্নয়ন অংশীদারিত্বে স্থাপিত হয়েছে মাইলস্টোন।

সরকারি সূত্রগুলো বলছে, বিদায়ী বছরের মতো নতুন বছরেও উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। উন্নয়ন প্রকল্প যাতে দ্রুত বাস্তবায়ন হয়, তার জন্য সব রকম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বহু প্রকল্পে বিশ্বে সর্বোচ্চ ব্যয়ের রেকর্ড হয়ে গেছে বাংলাদেশ। চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। কর-শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। জিডিপি বেড়েছে। তার পরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার এ বছরও উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। সে আশায় বুক বেঁধেই নতুন বছরে পা দিল সরকার।

বিদায়ী বছরে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও জঙ্গিবাদের কারণে খানিকটা হোঁচট খেতে হয়েছে সরকারকে। সেখানেও কঠোর পদক্ষেপের কারণে সফলতা এসেছে। অপহরণ, গুমসহ সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ে অসন্তোষ ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ায় অনেকটাই স্বস্তিতে মানুষ। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণ ও মেট্রোরেলের কাজ শুরুসহ বড় বড় উন্নয়ন কর্মকা- বাস্তবায়ন করছে সরকার। রাজধানীর পাশাপাশি বদলে যাচ্ছে গ্রামের দৃশ্যপটও। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।

অবকাঠামো খাতে বেশ বড় কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। এসব প্রকল্পের কাজ শেষে দেশের চেহারা অনেকটাই পাল্টে যাবে। পদ্মা সেতু চালু হলে মোট দেশের আয় ১ শতাংশের বেশি বাড়বে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে ২০১৮-এর ডিসেম্বরের মধ্যে। জ্বালানি চাহিদা পূরণে মহেশখালীতে নির্মাণ হচ্ছে এলএনজি টার্মিনাল। পাঁচ বছরের মধ্যে পায়রা বিদ্যুৎ হাব থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায় সরকার। সেখানে কয়লাভিত্তিক ১৩২০ মেগাওয়াট তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। এই প্রকল্পের পাশেই একই ক্ষমতার আরো তিনটি কয়লাভিত্তিক ও ৩৬০০ মেগাওয়াট এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে ১৫টিরও বেশি বৃহৎ প্রকল্প চলমান রয়েছে।

তবে সার্বিকভাবে সরকারের সামনে এখন দুই ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিদায়ী বছর সরকার রাজনৈতিকভাবে সফল। কিন্তু ব্যাংক খাতে বিশৃঙ্খলা ও চালের দাম নিয়ে মানুষ ক্ষুব্ধ। এ ছাড়া দলীয় লোকজনের ক্ষমতার রাজনীতির নেতিবাচক প্রভাবও রয়েছে। নতুন বছরে এসব কাটিয়ে উঠতে না পারলে সরকারকে বিপদে পড়তে হতে পারে। বিশেষ করে নতুন বছরে অংশগ্রহণমুলক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানই সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ। এই নির্বাচনও যদি ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা হয়, তা হলে সব অর্জন বিসর্জন যাবে।

"