স্বাগতম ২০১৮

প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০

হাসান শান্তনু

মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নিয়েছে বহু ঘটন-অঘটনের খ্রিস্টীয় বছর ২০১৭। ভোরের সূর্যোদয় ঘটেছে নতুন আরেকটি বর্ষপরিক্রমায়। শীতের কুয়াশা সরিয়ে উঁকি দিয়েছে উজ্জ্বল রোদ। অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে আজকের ভোরের আলো যেন বেশি মায়াময়। নতুন স্বপ্নের কথা বলছে। বলছে সামনের দিনগুলোতে অনিশ্চয়তা কেটে গিয়ে শুভময়তা ছড়িয়ে যাবে সর্বত্র। স্বাগত ২০১৮। অভিবাদন নতুন সৌরবর্ষ। সাদর সম্ভাষণ নতুন বছরকে।

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির দোলাচলে কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরেকটি বছর। নতুন স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে যাত্রা শুরু হলো নতুন বছরের। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হলো নতুন বছরের সূর্য। বিশ্বজুড়ে এক অস্থির সময়কালে আগমন ঘটল নতুন বছরের। তবু নতুনের মধ্যেই নিহিত থাকে অমিত সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে সুযোগ করে দেবে নতুন বছর।

‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবু শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এ কথার মতোই দুঃখ ও কষ্ট সবকিছু কাটিয়ে নতুন জীবনের দিকে যাত্রার প্রেরণা নেবে মানুষ। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বিভিন্ন উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে বরণ করে নিয়েছে নতুন বছরকে। খ্রিস্টীয় বছরকে স্বাগত জানাতে গোটা বিশ্বের মতো এদেশেও ছিল বিভিন্ন আনন্দ আয়োজন।

সুখবর যেমন মানুষকে আন্দোলিত করে, তেমনি খারাপ খবরও করে তোলে ব্যথিত ও বেদনার্ত। প্রতিবছরের মতো সদ্য বিদায়ী বছরেও আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশার দোলায় দুলেছি আমরা। সুখকর ঘটনায় হৃদয় পুলকিত হওয়ার চেয়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় হৃদয় যেন ভারাক্রান্ত হয়েছে বেশি। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের মানবতা ও উদারতা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রশংসা পেয়েছে। মাত্র চার মাসে ৬ লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্য সত্ত্বেও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের নজিরবিহীন আতিথ্য বিশ্ববাসীকে হতবাক করে।

২০১৭ সাল ছিল জঙ্গি দমনের বছর। ২১টি জঙ্গিবিরোধী অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় এ বছর নিহত হয়েছে ৪১ সন্দেহভাজন জঙ্গি। নিহত হয়েছে অন্তত ৮ শিশুও। সীতাকুন্ডের প্রেমতলায় শুরু হয়েছিল বছরের প্রথম অভিযান। শেষ হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জের আলাতুলি ইউনিয়নের পদ্মার চরে। জঙ্গি দমনের ঘটনায় সরকার প্রশংসিত হয়েছে, তবে জঙ্গিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলা যায়নি।

বিদায়ী বছরে দেশে ৯১ জন নিখোঁজ হয়েছিলেন। তার মধ্যে ৬৫ জনের সন্ধান এখনো মেলেনি। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদনে এ পরিসংখ্যান দিয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বছরের শেষ দিন গতকাল রোববার বলেছে, ‘সার্বিক পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক।’ গুম আর জঙ্গি অভিযান ছাড়াও বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল ধর্ষণ, পারিবারিক সংকট আর কিশোর অপরাধ। এসব অপরাধের নৃশংসতার মাত্রা দেশের মানুষের মূল্যবোধ ও মানবিকতাবোধকে নতুন করে প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে।

২০১৭ সাল জুড়ে রাজনীতির মাঠ ছিল নিস্তরঙ্গ। ছিল বিগত বছরগুলোর তুলনায় অনেকটাই শান্ত। রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাওয়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দেখতে যাওয়া দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ‘বাধা’ দেওয়ার মতো দুয়েকটি ঘটনা খানিক উত্তাপ ছড়ালেও নিরুত্তাপই ছিল রাজনীতির অঙ্গন। ভোটের আগের বছরের পুরোটা সময়ই দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা পরস্পরের প্রতি বাক্-আক্রমণ চালিয়ে গেছেন। দুই প্রধান নেত্রীও পরস্পরকে ধরে কথা বলেছেন, যার একটি ঘটনা উকিল নোটিস পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেষ্টা ছিল নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ঘর গোছানোর। কর্মসূচি পালনে ক্ষমতাসীনদের বাধা পাওয়ার অভিযোগ আগের মতোই করে এসেছে বিএনপি। জাতীয় পার্টির ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ অবস্থান আগের মতোই ছিল। বছর শেষে রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থীর জয়ে অনেকটাই ফুরফুরে হয়ে ওঠেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। এর বাইরে বাম দলগুলো মোর্চা বেঁধে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামলেও সার্বিক রাজনীতিতে তার কোনো প্রভাব দেখা যায়নি। নিবন্ধনহীন জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মপন্থী অন্য সংগঠনগুলোর সক্রিয়তাও আগের বছরগুলোর তুলনায় কম দেখা গেছে।

গেল বছর বিএনপি কোনো হরতাল ডাকেনি। দলের শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের প্রতিবাদে একদিন পূর্ণদিবস হরতাল দেয় জামায়াত। তবে এতে বিএনপি সমর্থন দেয়নি। হরতালে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক ছিল। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে কয়েকটি বাম দল আধাবেলা করে দুবার হরতাল ডাকে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ডাকা আধাবেলা হরতালে বিএনপি সমর্থন দেয়। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রতিবাদে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকা আধাবেলা হরতালেও বিএনপি সমর্থন দেয়। বাম দলগুলোর হরতালে পুলিশ কিছুটা চড়াও হয়।

বিদায়ী বছর অতি আলোচিত ছিল তিনটি প্রাকৃতিক দুর্যোগে। গত মার্চে পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ১৪২টি হাওরের ফসল ডুবে যায়। ক্ষয়ক্ষতি হয় হাওরের মানুষের জীবন ও সম্পদের। উত্তরাঞ্চলে বন্যায় মারা যায় ১৫০ জন। ৩২ জেলার ২০৮টি উপজেলা প্লাবিত হয়। জুন মাসে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে মারা যায় ১৫৮ জন। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বজ্রপাতে নিহত হন ১৭০ জন।

কয়েক বছর ধরে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগকে গুজব বলে উড়িয়ে দিলেও গত বছর পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বীকারোক্তির মুখে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে অসহায়ত্তের কথা বলেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ছাত্র সংগঠনগুলোর কারণে ২০১৭ সালে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থির অবস্থা তৈরি না হলেও বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্বে জড়াতে দেখা গেছে শিক্ষকদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের মধ্যে উত্তাপ ছিল উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে।

২০১৮ সালে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সরকারি ও বেসরকারি, এমপিওভুক্ত ও বহির্ভূত, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার সব শিক্ষক নিজ নিজ দাবি নিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর ও নোট-গাইডে শ্রেণিকক্ষের লেখাপড়া যখন লাটে ওঠার পথে, শিক্ষকদের এ অসন্তোষ তাতে হয়ে উঠবে বোঝার উপর শাকের আঁটি। আগামী বছর কেমন যাবে, তার একটি ইঙ্গিত মিলছে এ ছবি থেকে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগের বছরটি নিরুত্তাপ কাটলেও সামনে অস্থিরতার ইঙ্গিত যথেষ্ট রয়েছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। জাতীয় পরিস্থিতি কী রূপ নেবে নতুন বছরে, তা এ মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে জনগণের আশা, নতুন বছরটি দেশবাসীর জন্য নিয়ে আসবে স্বস্তিদায়ক ও আনন্দের সব খবর। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নতুন বছরে শুভবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে বছরটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলবেন-এটাই প্রত্যাশা।

"