নিভে গেল বাংলা গানের আরো একটি নক্ষত্র

শাহনাজ রহমতউল্লাহকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করলেন তারা

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | আপডেট : ২৫ মার্চ ২০১৯, ০২:১৬

অনলাইন ডেস্ক

কষ্ট বুকে নিয়েই তার জন্য দোয়া করি

গাজী মাজহারুল আনোয়ার

মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা সংগীত ছিল ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটি। এই গানের গীতিকার আমি, প্রথম সুরকার ছিলেন আনোয়ার পারভেজ, শাহনাজের বড় ভাই। মূল শিল্পী ছিলেন আব্দুল জব্বার ও শাহনাজ। পরে সুরকার হিসেবে আনোয়ার পারভেজের উদ্যোগে আলতাফ মাহমুদ, আলাউদ্দিন আলীও সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তো, সেই ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানের শিল্পী শাহনাজ রহমতউল্লাহ চলে গেলেন। তার এই চলে যাওয়ায় যেখানে দেশের সব শিল্পী, নির্বিশেষ সব রাজনীতিবিদের উপস্থিতি থাকাটা জরুরি ছিল, সেখানে আব্দুল হাদী, কুমার বিশ^জিৎ, কনকচাঁপা ছাড়া আর কাউকেই চোখে পড়েনি। এটা কতটা কষ্টের, দুঃখের তা বলার নয়। ভারত-সমৃদ্ধ গানে, কেন? কারণ তাদের একজন লতা মুঙ্গেশকর আছে। তো বাইরে যখন রুনা, সাবিনা, শাহনাজ রহমতউল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়, তখন বোঝা যায় যে, তারা বাংলাদেশের শিল্পী। তারা বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হিসেবেই তখন পরিচিত হন। কিন্তু দেশের মধ্যে শিল্পীদের রাজনৈতিক কারণে কোণঠাসা হতে হয়। শাহনাজকে আমি খুব কাছে থেকে চিনি-জানি। এত কিছু করার পরও যখন দেখল রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে মূল্যায়ন করা হয় না, তখন সে নিজেই নিজেকে নির্বাসনে নিয়ে যায়। নির্বাসে নিয়ে সেই যে একা হয়ে গেল, কষ্ট বুকে নিয়েই শাহনাজ চলে গেল। কষ্ট আমার বুকেও রয়ে গেল। কষ্ট বুকে নিয়েই তার জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তার আত্মাকে শান্তি দেন, তাকে বেহেশতবাসী করেন।

 

আমাদের মাটির নক্ষত্ররা সব আকাশের নক্ষত্র হয়ে যাচ্ছে

রুনা লায়লা

শাহনাজের হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরটা শুনে আমি ভীষণ আপসেট হয়ে পড়েছি। কত বছর ধরে শাহনাজকে চিনি, জানি। তার সঙ্গে কত যে স্মৃতি, এর কোনো হিসাব নেই। খবরটা শুনে আমি কোনোভাবেই বিশ^াস করতে পারছিলাম না। গত বছর একটি ঘরোয়া অনুষ্ঠানে শাহনাজের সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে। আমাদের সংগীতাঙ্গনে একের পর এক এভাবে এমন দুঃখজনক ঘটনা চলছেই। শাহনাজের চলে যাওয়ায় যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তাতে সত্যিই আমি ভাষাহীন হয়ে পড়েছি। আমাদের মাটির নক্ষত্ররা সব আকাশের নক্ষত্র হয়ে যাচ্ছে। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন।

 

মৃত্যুই চরম সত্যি, এক দিন সবাইকে চলে যেতেই হবে

ববিতা

শাহনাজ আপার খবরটা সুদূর আমেরিকাতে বসে শুনে খুব কষ্ট পেয়েছি। গতকাল এখানকার দিনের বেলায় একজন সাংবাদিক ফোন করে যখন আমাকে খবরটি দিলেন, তখন আমি বিশ^াসই করতে পারছিলাম না। কিন্তু মৃত্যুই চরম সত্যি, এক দিন না এক দিন সবাইকে চলে যেতেই হবে। কাউকে আগে যেতে হবে, কাউকে পরে যেতে হবে। আমাকেও এক দিন এমনি করেই হঠাৎ চলে যেতে হবে। শাহনাজ আপা চলে গেছেন, আমাদের সংগীতাঙ্গনের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হলেও তিনি তার গানের মধ্য দিয়ে যুগের পর যুগ বেঁচে থাকবেন। বিশেষত আমাকে বলতেই হয় যে, তিনি দেশের গানের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকবেন যত দিন বাংলাদেশ থাকবে। শাহনাজ আপার গাওয়া আমার লিপে তিনটি গান বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। গান তিনটি হচ্ছে, ফুলের কানে ভ্রমর এসে, এক নদী রক্ত পেরিয়ে এবং পারি না ভুলে যেতে। শাহনাজ আপা বাংলাদেশের এমনই একজন কণ্ঠশিল্পী, যার মতো এক্সপ্রেশন দিয়ে বাংলাদেশের আর কোনো নারী সংগীতশিল্পীই গাইতে পারতেন না। দোয়া করি, আল্লাহ যেন শাহনাজ আপাকে বেহেশত নসিব করেন।

 

আদর, শাসন এবং দুঃখকষ্টে মানসিক শক্তির আশ্রয়টুকু হারালাম

কুমার বিশ্বজিৎ

আদর, শাসন এবং দুঃখ-কষ্টে মানসিক শক্তির আশ্রয়টুকু হারালাম আমি। আমি দোয়া করি, মা শাহনাজ রহমতউল্লাহকে যেন আল্লাহ বেহেশত নসিব করেন। এটা খুবই দুঃখজনক, আমাদের দেশের এমন অনেক কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আছেন, যাদের নানাভাবে রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। আমরা তাদের মূল্যায়ন করতে জানি না, তাদের কিছু দিতেও পারি না, তাদের কাছ থেকে কিছু নিতেও পারি না। এটা খুবই বেদনার বিষয়। মা শাহনাজ এমনই একজন শিল্পী ছিলেন যার কণ্ঠের মডিউলিশন, ব্রেথ কন্ট্রোল, থ্রোয়িং, এক্সপ্রেশন বাংলাদেশের আর কোনো শিল্পীর মধ্যে নেই। তার এসব বিষয় এবং তার আদর্শকে ফলো করলেই শিল্পী হওয়া যেতে পারে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সব শিল্পীর প্রিয় শিল্পী মা শাহনাজ রহমতউল্লাহ।

 

তাকে খুব ভালোবাসতাম, এখনো বাসি

শবনম

আমার স্বামী রবিন ঘোষ একজন সংগীত পরিচালক ছিলেন। তার সুর সংগীতে শাহনাজ অনেক সিনেমাতে গান গেয়েছে। রবিন যখন চলে যায় তখন শাহনাজই আমাকে বেশি সান্ত¡না দিয়েছিল। সেই শাহনাজই এখন আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি কতটা যে কষ্ট পেয়েছি, তা বলে বোঝাতে পারব না। আমার এখনো বিশ^াসই হচ্ছে না যে, শাহনাজ নেই। শাহনাজকে নিয়ে রবিন একটি কথা প্রায়ই বলত, শাহনাজের মতো সংগীতশিল্পী এই পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি জন্মাবে না। আমার তাই মনে হয়, একজন শাহনাজ রহমতউল্লাহর যে অসাধারণ কণ্ঠ, তা যেমন কোনোভাবে কান থেকে দূরে থাকার মতো নয়, তার গান, গানের মধ্যে আবেগও দূরে রাখার মতো নয়। শাহনাজ চলে গেছে সত্যি, কিন্তু সে আমার হৃদয়ের মাঝে বেঁচে থাকবে। কারণ আমি তাকে খুব ভালোবাসতাম, এখনো বাসি।

 

তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না, এটাই ছিল তার বড় গুণ

আলম খান

শাহনাজের বড় ভাই সংগীত পরিচালক আনোয়ার পারভেজ আমার ঘনিষ্ঠ একজন বন্ধু ছিল। যে কারণে তাদের বাসায় আমার নিয়মিত যাওয়া-আসা ছিল। কিন্তু আমার সুর সংগীতে শাহনাজ কোনো গানে কণ্ঠ দেয়নি। এটা যখন আজ বসে বসে ভাবছিলাম তখন নিজেই অবাক হলাম। কী অপূর্ব কণ্ঠ ছিল তার। দেশের গান, আধুনিক গান, গজলে তার অসাধারণ গায়কিতে মুগ্ধ হয়েছে এ দেশের গানপ্রেমী মানুষ। একজন সত্যিকারের সংগীতশিল্পীর যেমন ভদ্র হওয়া উচিত শাহনাজ ঠিক তেমনি ছিল। সংগীতশিল্পী হিসেবে শাহনাজ শতভাগ সফল একজন শিল্পী ছিলেন। তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না, এটাই ছিল তার বড় গুণ। দোয়া করি, মহান আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন।

 

যত দিন বেঁচে থাকব তত দিন আমার আফসোস থেকে যাবে

ফরিদ আহমেদ

শাহনাজ আপা চলে গেলেন, কিন্তু যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন আমার আফসোস থেকে যাবে, যে আফসোসের কোনো শেষ নেই, ইতি নেই। কারণ আমার সুর সংগীতে বাংলাদেশের প্রায় সব কিংবদন্তি শিল্পীই গান গেয়েছেন। কিন্তু আমি যখন পেশাগতভাবে ব্যস্ত হয়ে উঠেছি, তখন শাহনাজ আপা গান গাওয়াই ছেড়ে দিয়েছেন। তাই তাকে দিয়ে গান করানোর সৌভাগ্যই আমার হয়ে উঠেনি। এমন সৌভাগ্য থেকে কোনো সংগীত পরিচালকই দূরে থাকতে চান না। কিন্তু আমাকে আপার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে সারা জীবন দূরেই থাকতে হবে। এই কষ্টটা আসলে মেনে নেওয়ার মতো নয়। দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাকে বেহেশতবাসী করেন, আমিন।

 

তার স্নেহ, মায়ামমতার কথা ভুলব না

তারিন

শ্রদ্ধেয় শাহনাজ রহমতউল্লাহর হঠাৎ এভাবে চলে যাওয়াটা আমাদের জন্য সত্যিই অনেক কষ্টের, বেদনার। শাহনাজ আপার ছেলে ফয়সালের সঙ্গে ছোটবেলায় আমি বাদল রহমানের ‘কাঁঠাল বুড়ি’ শর্টফিল্মে অভিনয় করেছিলাম। তিনি সেসময় শুটিংয়ে আসতেন। কয়েক বছর আগে একটি গানের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন পর তার সঙ্গে কুশলাদী বিনিময় করি। তারপর ২০১৭ সালের এক দিন তিনি আমাকে তার সঙ্গে মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণের জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। আমি গেলাম। তিনি আমাকে তার পাশে বসিয়ে বসিয়ে তার গান শোনালেন। আমি মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তার গান শুনলাম। আমি নিজ হাতে তাকে খাইয়ে দিলাম। সবশেষে তিনি আমাকে পার্লের একটি মালা উপহার দিলেন। আমি বুঝতে পারিনি তিনি কেন আমাকে এতটা মায়া করেছিলেন, ভালোবেসেছিলেন। সারা জীবন সুখের স্মৃতির চাদরে জড়িয়ে রাখবেন বলেই কি কাছে ডেকেছিলেন? জানি না আমি। তবে যত দিন বেঁচে থাকব, তত দিন তার স্নেহ মায়া মমতার কথা ভুলব না। আল্লাহ যেন শাহনাজ আপাকে বেহেশত নসিব করেনÑ এই দোয়াই করি।

 

"