মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০

বিনোদন প্রতিবেদক
ama ami

বাংলাদেশের সুস্থধারার চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে একটি বড় অংশজুড়ে আছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র। এ চলচ্চিত্রগুলোর অনেকগুলোয় যেমন সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহতা উঠে এসেছে, তেমনি আবার কিছু চলচ্চিত্রে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধকে উপস্থাপন না করে পরোক্ষভাবে এর ভয়াবহতাকে তুলে ধরা হয়েছে। তবে এ কথা সত্য, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক যত চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে, তা আমাদের ইতিহাসের সম্পদ হয়ে থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরু ১৯৭১ সাল থেকেই। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হচ্ছে শহীদ বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান পরিচালিত ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর কথা। মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় তিনি এই তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ‘স্টপ জেনোসাইড’-এর পর জহির রায়হান নির্মাণ করেন তথ্যচিত্র ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’। ১৯৭২ সালে চাষী নজরুল ইসলাম নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। ১৯৭৩ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘সংগ্রাম’। ১৯৯৭ সালে তিনি সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেন ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’। ১৯৭২ সালে আরো নির্মিত হয় আনন্দ পরিচালিত ‘বাঘা বাঙালি’, ফখরুল আলম পরিচালিত ‘জয় বাংলা’, মমতজ আলী পরিচালিত ‘রক্তাক্ত বাংলা’ এবং সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। ‘জয় বাংলা’ ছবিটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৭১ সালেই। কিন্তু পাকিস্তান সরকার ছবিটি আটকে দেয়। ১৯৭৩ সালে নির্মিত ছবিগুলোার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলমগীর কবিরের ‘ধীরে বহে মেঘনা’, আলমগীর কুমকুমের ‘আমার জন্মভূমি’।

একই বছরে খান আতাউর রহমান পরিচালিত ‘আবার তোরা মানুষ হ’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক হলেও মূলত তা যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের সামাজিক অবস্থা তুলে ধরে। একই ধারার চলচ্চিত্র ছিল নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ (১৯৭৪), আনন্দের ‘কার হাসি কে হাসে’ (১৯৭৪), হারুন-উর-রশিদের ‘মেঘের অনেক রঙ’ (১৯৭৬)। ১৯৭৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘বাংলার ২৪ বছর’ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি। সে সময়ই মুক্তি পায় কবীর আনোয়ারের ‘স্লোগান’। ১৯৭৭ সালে আবদুস সামাদের ‘সূর্য গ্রহণ’ ছবিতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৮১ সালে মুক্তি পায় এজে মিন্টুর ‘বাঁধন হারা’, শহীদুল হক খানের ‘কলমীলতা’, এবং মতিন রহমানের ‘চিৎকার’। আশির দশকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবির ওপর নেমে খড়্গ। তবে নব্বইয়ের দশকে আবার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু এসব ছবির অধিকাংশই ছিল বিকল্পধারার চলচ্চিত্র। এ সময় মুক্তি পায় নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত ‘একাত্তরের যীশু’ (১৯৯৩), তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘নদীর নাম মধুমতী’ (১৯৯৪)। ১৯৯৫ সালে তারেক মাসুদ এবং ক্যাথরিন মাসুদ নির্মাণ করেন দুটি চলচ্চিত্র ‘মুক্তির গান’ এবং ১৯৯৯ সালে ‘মুক্তির কথা’। ১৯৯৫ সালে আরো মুক্তি পায় হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘আগুনের পরশমণি’। মোস্তফা কামালের ‘প্রত্যাবর্তন’, আবু সাইয়িদের ‘ধূসর যাত্রা’।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুতোষ চলচ্চিত্রের মধ্যে দেবাশীষ সরকারের ‘শোভনের একাত্তর’, রফিকুল বারী চৌধুরীর ‘বাংলা মায়ের দামাল ছেলে’, জাঁ-নেসার ওসমানের ‘দুর্জয়’, হারুনুর রশিদের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’, বাদল রহমানের ‘ছানা ও মুক্তিযুদ্ধ’, ছটটু আহমেদের ‘মুক্তিযুদ্ধ ও জীবন’, মান্নান হীরার ‘একাত্তরের রঙপেন্সিল’ উল্লেখযোগ্য।

২০০২ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদ পরিচালিত ‘মাটির ময়না’। তৌকির আহমেদ পরিচালিত ‘জয়যাত্রা’ এবং হুমায়ূন আহমেদ পরিচালিত ‘শ্যামল ছায়া’। মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘খেলাঘর’ (২০০৬) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উল্লেখযোগ্য বিকল্পধারার ছবি। ২০০৯ সালে মুক্তি পায় তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত ‘রাবেয়া’। ২০১০ সালে মুক্তি পায় মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাহিনি অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। কিশোরদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চমৎকার ছবি এটি। সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ অবলম্বনে নাসিরউদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত ‘গেরিলা’ মুক্তি পায় ২০১০ সালে। আলমগীর কবিরের ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’, ‘লিবারেশন ফাইটার্স, মোরশেদুল ইসলামের ‘আগামী’, ‘আত্মদান’, ‘সূচনা, আবু সাইয়িদের ‘আবর্তন’, খান আতাউর রহমানের ‘এখনও অনেক

রাত’, ইলজার ইসলামের ‘দীপ নিভে যায়’,

চাষী নজরুল ইসলামের ‘ধ্রুবতারা’, তানভীর মোকাম্মেলের ‘স্মৃতি ৭১’, ‘জীবন ঢুলি’ (২০১২), সোহেল আরমানের ‘এই তো প্রেম’, আনিসুল হকের জননী সাহসিনী অবলম্বনে শাহ আলম কিরণ পরিচালিত ‘একাত্তরের মা জননী’ (২০১৪) মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

কবি নির্মলেন্দু গুণের কবিতা অবলম্বনে মাসুদ পথিক পরিচালিত ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়াণ’ (২০১৪) একটি আলোচিত ছবি। এ ছবিতে নির্মলেন্দু গুণসহ বাংলাদেশের নবীন-প্রবীণ অনেক কবি অভিনয় করেছেন। ২০১৪ সালে ভারতীয় পরিচালক মৃত্যুঞ্জয় দেবব্রত নির্মাণ করেন ‘চিল্ড্রেন অব ওয়ার’ যা ‘যুদ্ধশিশু’ নামে বাংলাদেশে মুক্তি পায়। ২০১৫ সালে মুক্তি পায় সোহেল আরমানের ‘এই তো প্রেম’, মানিক মানবিকের ‘শোভনের স্বাধীনতা’, মোরশেদুল ইসলামের ‘অনীল বাগচীর একদিন’, মান্নান হীরারা ‘একাত্তরের ক্ষুদিরাম’ এবং রিয়াজুল রিজুর ‘বাপজানের বায়োস্কোপ’। ২০১৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এগুলো হলো ‘লাল সবুজের সুর’ ও ‘ভুবন মাঝি’। তবে এর বাইরে কিছু সিনেমা নির্মাণ হয়েছে।

"