ঈদ আনন্দে করোনার থাবা

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২০, ০০:০০

মাহবুবুল আলম

বাঙালি মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর আসে এ উৎসব। ফলে অন্য ১০টা উৎসবের চেয়ে তা সম্পূর্ণ অলাদা। এই ঈদকে ঘিরে খাদ্যসামগ্রী, পোশাক, ফ্যাশন, বিনোদন, পরিবহনসহ সব সেক্টরেই থাকে সাজসাজ রব। ঈদুল ফিতরকে ঘিরে যে বাজার গড়ে ওঠে তাতে আমাদের অর্থনীতিতে প্রায় সোয়া লাখ কোটি থেকে দেড় লাখ কোটি টাকার অবদান রাখে। কিন্ত এবারের ঈদে পরিস্থিতি পুরোটাই পাল্টে গেছে।

প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে সবচেয়ে বড় প্রস্তুতি নিয়ে থাকে দেশের পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা। কারণ ঈদ মানেই নতুন পোশাক। বাঙালির ঘরে ঘরে ছেলে-বুড়ো, তরুণ-তরুণী, মা-বোন সবার জন্য চাই নতুন জামা কাপড়। তাই ঈদের এক মাসেই বছরের বাকি ১১ মাসের সমান বেচাকেনা হয়। ১৭ কোটি মানুষের দেশে ঈদ উপলক্ষে কয়েক হাজার কোটি টাকার পোশাকের চাহিদা থাকে। শবেবরাত থেকে শুরু হয়ে এই বেচাকেনা চলে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত। এ জন্য ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীদের হাসিও বাড়তে থাকে। তবে এ বছর করোনাভাইরাসের কারণে ঈদবাজারের পরিবেশ ঠিক উল্টো। লকডাউনের বন্দিদশায় আটকা পড়েছে ঈদের কেনাবেচা। তবে কোরবানির ঈদেও পেিবশের উন্নতি হবে কিনা এই নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।

ঈদুল ফিতরের জন্য মানুষের প্রস্তুতির কমতি ছিল না। সব খাতের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন পণ্যসামগ্রী তোলার প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছিলেন। ফ্যাশন হাউসগুলো নতুন কালেকশনও ঘরে তুলতে শুরু করেছিল। কিন্তু করোনার কারণে বন্ধ করে দিতে হয়েছে সব আয়োজন। অপেক্ষা ছিল পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার। কিন্তু উন্নতি তো দূরের কথা, পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটছে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। এরই মধ্যে অনলাইনে ঈদের বিকিকিনি শুরু করে দিয়েছে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস। যদিও মোট বিক্রির তুলনায় অনলাইনে বিক্রির পরিমাণ খুবই কম্য। তাছাড়া করোনার এই সময়ে অনলাইনের পণ্য ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী সংকট একটা বড় সমস্যা। কারণ এ সময় বাইরে বের হলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বিষয়টিও ভাবতে হচ্ছে।

ঈদ মানে টেলিভিশনে নতুন নতুন গল্প আর টিভি তারকাদের রাজত্ব। বাংলাদেশের টেলিভিশনগুলো সাত দিন ব্যস্ত থাকে শুধু ঈদকে ঘিরে। আর এমন আয়োজন পৃথিবীর কোনো স্থানেই দেখা যায় না। কিন্তু এবারের দৃশ্যটা একেবারেই ভিন্না। শুটিং হাউসগুলো যাচ্ছে একেবারে ফাঁকা। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের ঈদে প্রায় ৫০ কোটি টাকার একটি কোঠা খালি যাচ্ছে ঈদ নাটকে। বর্তমানে বাংলাদেশে অনুমোদিত ৪৫টি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মধ্যে ৩০টি পূর্ণ সম্প্রচারে আছে। নিউজ চ্যানেল বাদ দিলে ২২টি চ্যানেল কাজ করে বিনোদন নিয়ে। সারা বছর নানা আয়োজন থাকলেও শুধু ঈদকে ঘিরে থাকে টানা সাত দিনের আয়োজন। ঈদের লম্বা ছুটিকে বিনোদনে রাঙিয়ে তুলতে প্রায়

প্রতিটি চ্যানেল উঠেপড়ে লাগে। রিয়েলিটি শো, রান্না, নাচ-গান ও নানা আয়োজনে মুখর থাকে টিভি চ্যানেলগুলো। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজেট থাকে একক নাটক, ঈদ ধারাবাহিক ও টেলিফিল্মে। একটি সিঙ্গেল কিংবা একক নাটকের মূল্য ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে ২২টি টিভি চ্যানেলে সাত দিনে সাতটি একক নাটকের মূল্য দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮৫ হাজার টাকা। ঈদে একেকটি চ্যানেল একের অধিক একক নাটক প্রচার করে থাকে। সে ক্ষেত্রে এর আর্থিক লেনদেন দাঁড়ায় দ্বিগুণের বেশি। অন্যদিকে ঈদকে ঘিরে চার পর্বের ধারাবাহিক নাটকের চাহিদাও বেশ দেখা যায়। ধারাবাহিকের একটি পর্বের মূল্য ৯০ হাজার টাকা। তাহলে ২২টি টিভি চ্যানেলে সাত দিনে ৮৮টি পর্বে লেনদেন হয় প্রায় ৭৯ লাখ টাকা। অন্যদিকে সব চ্যানেলে টেলিফিল্ম প্রচার না হলেও প্রায় ১৮টি টিভি চ্যানেলে টেলিফিল্মের সংখ্যা কিন্তু কম নয়। সাত দিনে দুটি করে টেলিফিল্ম প্রচার হলে প্রায় ৮ কোটি টাকা লেনদেন হয় শুধু টেলিফিল্মে। জানা যায়, একেকটি টেলিফিল্ম কেনাবেচা হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকা লেনদেন হয় শুধু ঈদের নাটকের বাজারে। কিন্তু করোনাকালে এমন আয়োজন হয়তো এবার দেখা যাবে না। এই ক্ষতির বেগ পেতে হবে যৌথভাবে নাটকের সঙ্গে জড়িত মানুষ এবং টেলিভিশন ইন্ডাস্ট্রিকে। ঈদ মৌসুমে প্রতিবার তারকাদের যখন রীতিমতো ঘুম হারাম হয়ে যায় কাজের চাপে, আর এবার তারা সময় কাটাচ্ছেন একদম ঘরে বসে অলস ভঙ্গিতে। আলোচিত ও জনপ্রিয় নির্মাতাদের অনেকেই হাল ছেড়ে দিয়ে নির্ধারিত শিডিউল বাতিল করে ফেলেছেন এরই মধ্যে।

করোনার কারণে এবারের ঈদ নিয়ে পরিবহন ব্যবসায়ীরাও হতাশ। ঈদকে কেন্দ্র করে বিশ রোজার পর থেকেই পরিবহন (গণপরিবহন) সেক্টরে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। বিশেষ করে ঈদের ৪/৫ দিন আগেতো পরিবহনে ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই অবস্থা। ঈদে ঘরে ফেরা মানুষদের ভিড়ে ট্রেন বাসের ছাদেও উপছে পড়া মানুষ লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এবারের ঈদে পরিবহন বন্ধ থাকার অশঙ্কায় পরিবহন ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে। পরিবহন সেক্টরের নেতাদের মতে এ খাতে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। তারা ঈদের আশায় বসেছিলেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে সরকার ছুটি বন্ধ করে দেওয়ায় কারো আর গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ নেই। তাছাড়া গণপরিবহনের ওপর লকডাউন ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ আছে। তাই ব্যবসায়ীরা চরম হতাশ। তাদের কথা হলো এ অবস্থার কারণে তারা পথে বসে যাবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বিভিন্ন উৎসব ঘিরে নানা ধরনের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড অর্থনৈতিক গতি প্রবাহ বাড়িয়ে তোলে। বিপর্যস্ত, ঝিমিয়ে পড়া, স্থবির অর্থনীতিতে নতুন আশার আলো জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশে প্রায় তিন কোটির মতো মানুষ ছোট কিংবা বড় ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে তাদের ব্যবসা হয়ে উঠে রমরমা। ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের ব্যবসার আকার বেড়ে যাওয়ায় দেশে অর্থনীতিতে অধিক পরিমাণে অর্থের সঞ্চালন হয়। কিন্তু এবারে করোনার কারণে ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণিপেশার মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে চরম হতাশা। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ কারো জানা নেই। তাই সর্বত্রই ঢেকে রেখেছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। আর সব চেয়ে বড় কথা ঈদের যারা সব চেয়ে বেশি

আনন্দ করে সেই শিশু কিশোর যুবসমাজ তারাও কেমন মন মরা। তাদের মন থেকে সব আনন্দ কেড়ে নিয়েছে করোনা। মোদ্দাকথা, এবারের ঈদ আনন্দে পড়েছে করোনার কালো থাবা।

লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক, কলামিস্ট ও গবেষক

 

"