বাঙালি চেতনার বাতিঘর আনিসুজ্জামান

প্রকাশ : ২৩ মে ২০২০, ০০:০০

সালাম সালেহ উদদীন

আনিসুজ্জামান একটি চেতনার নাম। নিরহঙ্কার ও নীতির প্রশ্নে আপসহীন আলো ছড়ানোর একজন অধ্যাপকের নাম। তিনি আলো ছড়িয়েছেন ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে, সমাজের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। ছড়িয়েছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলো। বাঙালির মানস গঠনেও তার ভূমিকা উজ্জ্বল। তিনি ছিলেন নীতি ও প্রজ্ঞার সাধক। তার গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চেতনা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র।

এ দেশের জাতীয়তাবাদী ও প্রগতিশীল আন্দোলনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ও অবদান জাতি কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণে রাখবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সংবিধান প্রণয়নেও তিনি যুক্ত ছিলেন। সেই সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন। এ জন্য মৌলবাদীরা তাকে হুমকিও দিয়েছে।

১৯৫৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও ১৯৫৭ সালে এমএ পাস করেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে ঢাবির বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। আবার ঢাবিতে ফিরে আসেন। ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাবিতেই ছিলেন। তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক, নিষ্ঠাবান গবেষক। আনিসুজ্জামানের রচিত ও সম্পাদিত বহু বাংলা ও ইংরেজি বই, শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্ব বহন করে। তিনি ইতিহাস ও সময়কে দেখেছেন সমান্তরালে এবং সেভাবে চলার চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য, ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাটে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ৪৭ সালের দেশভাগের পর তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে চলে আসেন। মারা যান ১৪ মে ২০২০।

ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল বেশ উজ্জ্বল। রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপনে বাধা প্রদান ও রবীন্দ্রনাথের গান নিষিদ্ধের তৎকালীন সরকারের অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন। ঐতিহ্যের মূল ভিত্তিতে থেকে তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিন খন্ডে লিখেছেন তার জীবন-স্মৃতি। কাল নিরবধি, আমার একাত্তর ও বিপুলা পৃথিবী। এখানে স্থান পেয়েছে বাঙালির ইতিহাস ঐতিহ্য এবং তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন।

তার এ স্মৃতিভাষ্য বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। ইতিহাস রচনার জন্য যে সব উপাদান দরকার, তা তার আত্মজীবনীতে রয়েছে। তরুণ বয়স থেকেই তিনি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। ফলে তৎকালীন পূর্ব বাংলার অনেক খ্যতিমান ব্যক্তির সাহচার্যে আসার সুযোগ ঘটে তার।

তার উদার মানসিকতা উন্নত রুচি ও সংযত আচরণ বিচিত্র পথ ও মতের মানুষকে আকৃষ্ট করেছে। দেশভাগ থেকে শুরু করে সব ধরনের রাজনৈতিক আন্দোলনে এ দেশের মানুষ যে মুক্তি খুঁজছিলেন, সেসব আন্দোলনে তিনি দ্বিধাহীনচিত্তে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। বাঙালি মুসলমানদের মানসিকতার বিবর্তনের রূপরেখা তার গবেষণায় চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। তার আলোচিত গ্রন্থ মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য। বাংলা সাহিত্যের গবেষণা জগতে একটি অনন্য দলিল। অনেক গবেষকই গবেষণা করতে গিয়ে বাহুল্য শব্দ বাক্য তথ্য ব্যবহার করেন। তাদের গবেষণায় ভাষার আড়ষ্টতা দৃশ্যমান হয়। এ ক্ষেত্রে আনিসুজ্জামান ছিলেন ব্যতিক্রম। তার গবেষণা গ্রন্থটি একটি সরস রচনা। তিনি বিষয়ের গভীরে গিয়ে তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন, যা গবেষণা সাহিত্যের অনন্য দলিল, আকর গ্রন্থ।

তিনি তার কাজের মাধ্যমে মননশীলতা ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে ধ্রুবতারার মতো। তিনি সত্য ও সুন্দরের আরাধনা করেছেন সব সময় এবং তা ছড়িয়ে দিয়েছেন মানুষের মাঝে। তার প্রজ্ঞার দৃষ্টি এমনভাবে ছড়িয়ে দিয়েছেন যে, তা সমাজে আলো ফেলেছে।

তার আরেকটি গ্রন্থ বাঙালি নারী : সাহিত্য ও সমাজ। এই গ্রন্থে তিনি নারীর শারীরিক ও মানসিক অবরুদ্ধতার বিষয়টি চমৎকারভাবে আলোকপাত করেছেন।

মৌলবাদ-সাম্প্র্রদায়িকতার বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দীর্ঘদিন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে গেছেন। মধ্যবিত্ত বাঙালির সংস্কৃতির আন্দোলনের অগ্রগণ্য পথিকৃৎ তিনি। দেশের প্রতিটি সংকটকালে তার বক্তব্য, মন্তব্য এবং ভূমিকা দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করেছে।

তার রচিত ও সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক পদে সম্মানিত করে। এছাড়া শিক্ষাক্ষেত্রে, শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত পুরস্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার। এছাড়া তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি. লিট সম্মাননা পেয়েছেন। তার বিসর্জনের চেয়ে অর্জনের পাল্লা অনেক ভারী। দাম্ভিকতা ঈর্ষা পরশ্রীকাতরতা কোনো নেতিবাচক দিকই তার জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি। তাই তিনি হয়ে উঠেছেন জাতির অভিভাবক, বিবেকের কণ্ঠস্বর, বাঙালি চেতনার উজ্জ্বল বাতিঘর। কেবল শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে নয় শিক্ষা কমিশনে যুক্ত থেকে দেশের শিক্ষা বিকাশে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন। বহু অভিধায়ই তাকে অভিহিত করা যায়। শিক্ষাবিদ অধ্যাপক গবেষক প্রাবন্ধিক সমাজহিতৈষী, সমাজ-সংস্কৃতি বিকাশের পুরোধা কত কী। কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন বাঙালি চেতনার উজ্জ্বল সারথী। যারা প্রতিভাবান এবং সমাজ রাষ্ট্রের উচ্চস্তরে রয়েছেন তাদের একটি প্রধান দিক হচ্ছে সাধারণ মানুষকে অবজ্ঞা করা, পাত্তা না দেওয়া। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন তিনি। তার পান্ডিত্য প্রখর কিন্তু রুক্ষতা অহংবোধ অসহিষ্ণুতা তাকে গ্রাস করেনি। তিনি গবেষণা করতে গিয়ে যেসব পত্র-পত্রিকার নাম উল্লেখ করেছেন, যা ছিল মুসলমান কর্তৃক সম্পাদিক ও পরিচালিত, ওইসব পত্রিকার নাম এদেশের অনেকেরই ছিল অজানা। একজন সফল গবেষক হিসেবে তিনি প্রতিটি বিষয়ের গভীরে যেতে পছন্দ করতেন। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে যখনই কোনো বিতর্ক দেখা দিয়েছে তিনি বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছেন। তিনি ইতিহাস-সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ছিলেন গভীরভাবে অনুসন্ধিৎসু। তিনি কখনো মানুষকে শ্রেণি-পেশা মর্যাদা বিত্ত-ভৈবব দেখে বিচার-বিশ্লেষণ করেনি। বুদ্ধির শাসনের মাধ্যমে তিনি তার আবেগকে সংযত করেছেন, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। আমরা কেবল তাকে গবেষক প্রাবন্ধিক হিসেবেই জানি, কলেজ জীবনে তিনি বেশ কয়েকটি গল্প লিখেছেন। ওই গল্পগুলো অসাধারণ।

ভাষা আন্দোলন থেকে এমন কোনো আন্দোলন নেই যাতে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পরে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে তিনি বিশ্বজনমত তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি শিল্পকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘যামিনী’ এবং বাংলা মাসিকপত্র ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও দেশের বহু সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের সভাপতি-উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। অসংখ্য সভা-সেমিনারে করেছেন সভাপতিত্ব।

এ দেশের মুক্ত বুদ্ধি চর্চার বরেণ্য পথিকৃত তিনি। তিনি আমাদের সামনে এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতির নানা ক্রান্তিলগ্নে তাকে দেখা গেছে সামনের সারিতে। তিনি ছিলেন বহুমুখী এক বিরল প্রতিভা। তার শূন্যতার জায়গাটি শূন্যই থেকে যাবে কিনা এটা গভীর ভাবনার বিষয়। আমাদের সংস্কৃতির ভেতরের শক্তিগুলো তিনি আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, শনাক্ত করেছেন, এটা যদি আমরা সফলভাবে অনুসরণ করতে পারি তা হলে বাঙালি সংস্কৃতি একদিকে যেমন আরো বিকশিত হবে অন্যদিকে আমরাও সমৃদ্ধ হব।

লেখক : কবি কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

"