ঈদের ছুটিতে দেখে আসুন

কুমিল্লার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মনসুর হেলাল

ঢাকা থেকে কুমিল্লার দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। মহাসড়কে যানজটের বিপাকে না পড়লে মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে আপনি পৌঁছে যাবেন। ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে ভ্রমণপিয়াসীরা দেশ-বিদেশের নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান। তবে এমন অনেকেই আছেন ইচ্ছা থাকলেও সময় স্বল্পতার কারণে দেশের বাইরে যেতে পারেন না, আবার তার সঙ্গে আর্থিক সামর্থ্যরে বিষয়টিও যুক্ত। তাই অনেকে স্বল্প খরচে ও দিনে গিয়ে সব দেখে-শুনে আবার ওইদিনই ফিরে আসতে পারেন এমন জায়গা পছন্দ করেন। হ্যাঁ, তাদের জন্য বলছি। আপনার জন্য কুমিল্লা একটি আদর্শ স্থান। যেখানে দেখার, জানার ও রসনাবিলাসের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত উপাদান। যাতায়াত সুবিধা তো আছেই, থাকারও রয়েছে সুন্দর পরিবেশ। প্রশ্ন করতে পারেন এই সুবিধা তো ঢাকার আশপাশে আরো অনেক রয়েছে, কিন্তু কুমিল্লা যেতে হবে কেন? এবার এই কেনর উত্তরে বলি, কুমিল্লা হচ্ছে দেশের একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধশালী জেলা। এ জেলার প্রাকৃতিক ও ঐতিহ্যবাহী অনেক কিছুই আছে দেখার মতো, বিশেষ করে এই জেলার প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো একেকটার সৌন্দর্য একেক রকম। যার কোনোটা দেখে আপনি বিস্মিত হবেন, আবার কোনোটা দেখে হবেন পুলকিত। তাই ঈদের ছুটিতে দেখে আসুন কুমিল্লার প্রতœতাত্তিক নিদর্শনগুলো।

প্রথমে জেনে নিন কীভাবে যাবেন

প্রতিদিন রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে কুমিল্লার উদ্দেশে অনেক বাস ছেড়ে যায়। আপনি যদি কুমিল্লা শহরে নামতে চান তা হলে উঠতে হবে এশিয়া লাইন, এশিয়া ট্রান্সপোর্ট, তিশা, প্রিন্স ইত্যাদি বাসে। পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড নামতে চাইলে এশিয়া ট্রান্সপোর্টে চড়ে বসবেন। আর যদি ক্যান্টনমেন্ট নামেন তা হলে এশিয়া লাইন বা এশিয়া ট্রান্সপোর্ট, তিশা যেকোনো একটা দিয়ে এলেই নামতে পারবেন। সায়েদাবাদ থেকে প্রতি ২০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ে। ভাড়া নেবে ২০০ টাকা। আর এসি বাসে আসতে চাইলে ভাড়া পড়বে ২৫০ টাকা। এ ছাড়া কমলাপুর থেকে রয়েল কোচে আসতে পারেন। ভাড়া নেবে ২৫০ টাকা। আর যারা চট্টগ্রাম থেকে আসবেন, তাদের তিশা বা সৌদিয়ায় করে আসতে হবে। তিশায় ভাড়া নেবে ২৫০, সৌদিয়ায় ২৪০ টাকা। এ ছাডা কুমিল্লার অনেক লোকাল বাস পাবেন। তবে সিটিং বাসে ওঠাই ভালো। নামবেন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। ফেরার সময়েও যেকোনো স্থান থেকেই ঢাকার বাস পাবেন। ট্রেনে কুমিল্লা যেতে চাইলে বিষয়টি আরো সহজ। ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, নোয়াখালী ইত্যাদি সব জায়গা থেকে কুমিল্লার ট্রেন আছে। কুমিল্লায় এসে পর্যটন স্পটগুলোতে যেতে সিএনজি, অটো ও মাইক্রোবাস পাবেন। যারা ঢাকা থেকে আসবেন তারা কুমিল্লা ক্যান্টমেন্ট নেমে যেতে পারেন। বলতে গেলে এখান থেকেই আপনার ভ্রমণ শুরু। এবার দলে-বলে ঘুরে দেখতে শুরু করেন আপনার কাক্সিক্ষত সব দর্শনীয় স্থান।

ওয়ার সিমেট্রি

ঢাকা-কুমিল্লা-সিলেট সংযোগ সড়কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী টিপড়া বাজার। এখান থেকে সামান্য দূরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ময়নামতি ওয়ার সেমিট্রি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত কমনওয়েলথ যোদ্ধাদের সমাধিস্থল। ১৯৪৫ সালে তাদের সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হেলিকপ্টারে কুমিল্লায় নিয়ে আসা হয়। এখানে ৭৩৭ জন যোদ্ধার কবর রয়েছে। সুনসান নীরবতা আর অসম্ভব সুন্দর প্রাকৃতিক পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এটি সকাল ৭টা থেকে ১১টা ৪৫ মিনিট ও বেলা ২টা থেকে বিকাল ৪টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।

শালবন বৌদ্ধ বিহার

প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শনের এক মহিমামন্ডিত নাম ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার বা শালবন বিহার। বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম এই বৌদ্ধ বিহার। আগে এ প্রতœতত্ত্বটি শালবন ‘রাজার বাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। প্রতœতাত্ত্বিক খননে বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ উন্মোচিত হওয়ায় একে ‘শালবন বিহার’ নামে আখ্যায়িত করা হয়। তবে এর আসল নাম ছিল ‘ভবদেব মহাবিহার’। খ্রিস্টীয় সাত শতকের মধ্যভাগ হতে আট শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেব বংশের শাসকরা এই অঞ্চল শাসন করেন। ওই বংশের চতুর্থ রাজা ভবদেব কর্তৃক এই মহাবিহার নির্মিত হয়। বর্গাকার বিহারটির প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৫৫০ ফুট। চার বাহুতে মোট ১১৫টি সন্ন্যাস কক্ষ, মধ্যভাগে একটি উন্নত বৌদ্ধ মন্দির এবং মূল মন্দিরের চারপাশে ছোট ছোট ১২টি মন্দির ও ৮টি স্তূপ উন্মোচিত হয়েছে। বিহারের মূল ফটকের পূর্বপাশে খননের ফলে একটি প্রাচীন কূপের কাঠামো উন্মোচিত হয়েছে। ধারণা করা হয়, তৎকালীন বৌদ্ধ শাসকগোষ্ঠী এ কূপের পানি আহরণের মাধ্যমে যাবতীয় প্রয়োজন পূরণ করতেন। মন্দির ও মন্দিরের আশপাশে কয়েক দফা প্রতœতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পোড়া মাটির ফলক, ব্রোঞ্জের মূর্তি, নকশাকৃত ইট ও মুদ্রাসহ বিভিন্ন মূল্যবান প্রতœতত্ত্ব পাওয়া গেছে। পুরো বিহারটিতে রয়েছে দেশি-বিদেশি অসংখ্য বিচিত্র বর্ণিল ফুলের সমারোহ; যা ভ্রমণপিয়াসীদের হৃদয়ে দোলা

দিয়ে যায়।

রূপবান মুড়া

কুমিল্লার যতগুলো প্রতœতত্ত্ব রয়েছে তার মাঝে অন্যতম এটি। তবে লোকমুখে খুব একটা প্রচলন না থাকায় এ প্রতœতত্ত্বটির সন্ধান অনেক ভ্রমণপিয়াসী পর্যটকের কানে পৌঁছায়নি। কুমিল্লা-কালীর বাজার সড়কের দক্ষিণে বর্তমান বার্ড এবং বিজিবি স্থাপনার মাঝখানে একটি টিলার ওপর এ মুড়া অবস্থিত। পাহাড়ে ওঠার মতোই উঁচু পথ পাড়ি দিয়ে উঠতে হয় রূপবান মুড়ায়। দর্শনার্থীদের জন্য সুখবর হলো, এখানে প্রবেশ করতে কোনো ফি লাগে না। খননকাজের পর এখানে মাঝারি আকারের (পূর্ব-পশ্চিমে ২৮.২ মিটার এবং উত্তর-দক্ষিণে ২৮ মিটার) প্রায় ক্রুশাকৃতি একটি আকর্ষণীয় সমাধি মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। এর সঙ্গে আরো পাওয়া গেছে অষ্টাকোনাকৃতি স্তূপ এবং বর্গাকৃতির ভেতের ওপর আর একটি স্তূপসহ বেশসংখ্যক সাহায্য কাঠামোসমূহ। আয়তাকার স্তূপ অঙ্গনের মধ্যে প্রাচীর দেয়াল এগুলোকে বেষ্টন করে রেখেছে। প্রথানুযায়ী পূর্বদিকে প্রবেশ পথ আছে এবং এর সম্মুখে আছে মঠের প্রবেশদ্বার। গভীর খননকার্যের ফলে দেখা যায় যে, এর নির্মাণ, সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের তিনটি স্তর আছে। প্রাচীনতম স্তরটি ছিল ছয়-সাত শতকে।

লতিকোট মুড়া

স্থানীয়ভাবে এই প্রতœতাত্ত্বিক স্থাপনাটি লতিকোট মুড়া নামে পরিচিত। কিন্তু খননের ফলে এখানে ৩৩টি ভিক্ষু কক্ষবিশিষ্ট ৪৭.২৪ মিটার ঢ৪৪.৮০ মিটার পরিমাপের একটি বৌদ্ধ বিহারের নকশা উন্মোচিত হয়। ফলে এটিকে লতিকোট বিহার নামে অভিহিত করা হয়। বিহারটিতে দুটি নির্মাণ যুগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় নির্মাণ যুগে পূর্ব বাহুর মাঝামাঝি স্থানে একটি মন্ডপ নির্মাণ করা হয়। বিহার প্রবেশের প্রধান তোরণ উত্তর দিকে ছিল। দর্শনীয় স্থানটি দেখতে এখানে অনেকেই ছুটে আসেন। তবে ভ্রমণপিয়াসী মানুষদের অনেকের কাছেই স্থানটি এখনো অচেনা।

ইটাখোলা মুড়া

কুমিল্লা জেলার আরেকটি দর্শনীয় স্থান ইটাখোলা মুড়া। এটি কুমিল্লা সদর হতে পশ্চিম দিকে ৮ কিলোমিটার দূরে কোটবাড়ী সড়কের ওপারে, রূপবান মুড়ার উল্টোদিকে অবস্থিত। অনেকেই মনে করেন, একসময় ওই স্থানটি ইট পোড়ানোর খনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর এজন্যই ওই স্থানটির নাম ইটাখোলা মুড়া বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। স্থাপত্যশৈলীটিতে প্রবেশ করতে কোনো প্রবেশ ফি দিতে হয় না।

ময়নামতি জাদুঘর

কুমিল্লার সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানের একটি এই জাদুঘর। এখানে দেখতে পাবেন অষ্টম শতাব্দীর শ্রী ভবদেব মহাবিহার, রানির বাংলো মহাবিহার, কোটিলা মুড়া, চাপত্র মুড়া, রূপবান মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, আনন্দ বিহার, রানির বাংলো ও ভোজ রাঙার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা নানা মূল্যবান পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন। ব্রোঞ্জ আর পাথরের মূর্তি, অলঙ্কারের ভাঙা অংশ, প্রাচীন মুদ্রা, পোড়া মাটির ফলকÑ এসব কিছুই প্রতিনিধিত্ব করছে সেই প্রাচীন সময়ের যা অনেক আগেই মিশে গেছে মাটির নিচে। ম্যাপ তৈরি করে দেখানো হয়েছে ভাঙা স্থাপনাগুলো কেমন ছিল দেখতে, কোথায় ছিল ইত্যাদি। নিদর্শনগুলোর মধ্যে আকর্ষণীয় একটি হলো ৫০০ কেজি ওজনের একটি বিশাল ঘণ্টা। জাদুঘরে প্রবেশ ফি মাত্র ২০ টাকা।

ভোজ রাজার বাড়ি

এই প্রত্মকেন্দ্রটি কুমিল্লা শহর হতে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে কোটবাড়ী-টিপরা বাজার ক্যান্টনমেন্ট সড়কের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। স্থানীয়ভাবে এটি ভোজ রাজার বাড়ি নামে পরিচিত। সম্প্রতি খননের ফলে একটি বৌদ্ধ বিহারের আংশিক কাঠামো আবিষ্কৃত হয়েছে। বিহারটি বাহ্যিক পরিমাপ ১৭৩.৪৩ মিটার ঢ১৭৩.৪৩ মিটারের দক্ষিণ বাহু সম্পূর্ণ খননের ফলে দুই প্রান্তে দুটি কক্ষ ছাড়াও ৩১টি কক্ষ উন্মোচিত হয়েছে। ফলে সিঁড়ি কক্ষ ছাড়া বিহারে ১২৪টি কক্ষ আছে বলে অনুমিত হয়। বিহারের উত্তর বাহুর মধ্যভাগে মূল ফটকটির আংশিক নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে এবং এর কেন্দ্রস্থলে প্রদক্ষিণ পথসহ একটি ক্রুশাকার চতুর্মুখী মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে। ক্রুশাকার মন্দিরটির পরিমাপ ৪৬.৩৩ মিটার ঢ৪৬.৩৩ মিটার। এই প্রতœস্থানে খননের ফলে কেন্দ্রীয় মন্দির হতে একটি ব্রোঞ্জের বৃহদাকার বুদ্ধমূর্তি, দুটি স্থানীয় নরম পাথরে তৈরি বুদ্ধমূর্তি এবং একটি রৌপ্য মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া অনেকগুলো পোড়া মাটির ফলক পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত খননের ফলে মোট চারটি নির্মাণ যুগের নিদর্শন পরিলক্ষিত হয়। আবিষ্কৃত স্থাপত্য কাঠামো এবং প্রতœসম্পদের বিবেচনায় এ নিদর্শনটির সময়কাল অষ্টম হতে ১২০০ শতাব্দী নিরূপণ করা যেতে পারে।

আনন্দ বিহার

কুমিল্লা শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম এবং লালমাই ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব প্রান্তঘেঁষে অপেক্ষাকৃত নিচু ও সমতল ভূমিতে আনন্দ বিহার প্রতœস্থলটি অবস্থিত। ১৯৭৫ খ্রি. থেকে এখানে প্রতœতাত্ত্বিক খনন কাজ শুরু করা হয়। আয়তনে এ বিহার শালবন বিহার থেকে অনেক বড়। বর্গাকারে নির্মিত এ বিহারের প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য ৬২৫ ফুট। প্রতি বাহুতে বৌদ্ধভিক্ষু কক্ষ উন্মোচিত হয়েছে। বিহারের মধ্যবর্তী স্থানে ক্রুশাকার কেন্দ্রীয় মন্দির উন্মোচিত হয়েছে। খননের ফলে এখানে বৃহদাকার একটি ব্রোঞ্জের মূর্তিসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতœবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে।

কোটিলা মুড়া

কুমিল্লা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার এবং আনন্দ বিহার থেকে ১ কিলোমিটার উত্তরে ময়নামতি পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতœস্থলটি অবস্থিত। খননের ফলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা ৩টি স্তূপের নির্দশন উন্মোচিত হয়েছে। বুদ্ধধর্মের ত্রিরতœ (বৌদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ) তিনটি স্তূপ বাংলাদেশে আর কোথায়ও পাওয়া যায়নি। প্রতœতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন। ত্রিরতœ স্তূপের সঙ্গে লাগোয়া পশ্চিম পাশে আরো ৯টি স্তূপ এবং পূর্ব পাশে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বালম্বি ৩টি হলঘরের নির্দশন পাওয়া যায়। এগুলোর সময়কালকে খ্রিস্টীয় সাত থেকে তেরো শতক বলে অনুমান করা হয়।

চারপত্র মুড়া

কোটিলা মুড়া থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে ময়নামতি সেনানিবাস এলাকায় একটি উঁচু সমতল পাহাড়ের চূড়ায় এই নির্দশনটি অবস্থিত। এখানে খনন করে ছোট আকৃতির মন্দিরের ধবংসাবশেষ উন্মোচিত হয়েছে এবং তিনটি নির্মাণ যুগের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এ স্থাপত্য নিদর্শনটি নামকরণের যথার্থতা রয়েছে। খননের ফলে এখানে ৪টি তাম্রলিপি পাওয়া গেছে বিধায় ঢিবিটি চারপত্র মুড়া নামে অভিহিত করা হয়েছে। স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী এর সময়কালকে খ্রি. এগার-বার শতকে ন্যস্ত করা যায়।

রানি ময়নামতি প্রাসাদ ও মন্দির

এই প্রতœকেন্দ্রটি লালমাই ময়নামতি পাহাড় শ্রেণির সর্ব-উত্তর প্রান্তে বিচ্ছিন্ন একটি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। সমতল ভূমি হতে এর উচ্চতা ১৫.২৪ মিটার। স্থানীয়ভাবে এটি রানি ময়নামতি প্রাসাদ নামে পরিচিত। প্রতœতাত্ত্বিক খননের ফলে বুদ্ধ ধর্মীয় ক্রুশাকার মন্দিরসহ চারটি নির্মাণ যুগের স্থাপত্য নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে এবং এখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতœসম্পদ আবিষ্কৃত হয়েছে। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ও প্রতœসম্পদের বিশ্লেষণে এটিকে ৮ম থেকে ১২০০ শতাব্দীর প্রাচীন কীর্তি বলে অনুমিত হয়।

রানির কুঠি

রানির কুঠি কুমিল্লা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগরের উত্তর পারে ছোটরা মৌজায় অবস্থিত। এটি তদানীন্তন মহারাজা মানিক্য কিশোর বাহাদুরের স্ত্রী বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করতেন। শতাধিক বছরের পুরোনো এই বাড়িটির নাম ‘রানির কুঠি’ হিসেবে তদানীন্তন ত্রিপুরা রাজ্য বাংলাদেশের সব জেলায় সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ এপ্রিল প্রতœসম্পদ আইন ১৯৬৮ এর ১০ ধারার (১) উপধারার ক্ষমতাবলে রানির কুঠিকে সংরক্ষিত প্রতœসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

সতর রতœ মন্দির

কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার পূর্বদিকে জগন্নাথপুর গ্রামে এ মন্দিরটি অবস্থিত। ত্রিপুরার মহারাজা দ্বিতীয় রতœ মানিক্য ১৭ শতকে মন্দিরটির নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং ১৮ শতকে মহারাজা কৃষ্ণ মানিক্য এটি সমাপ্ত করেন। তিন তলা এবং ১৭টি রতœ বিশিষ্ট এ মন্দির অষ্টকোনাকার ভিত্তি ভূমির ওপর স্থাপিত। এর প্রতি বাহুর পরিমাপ ৭.০১ মিটার। এর ভেতর গাত্রে আস্তর করা এবং দেয়ালে চিত্র দ্বারা সজ্জিত।

শাহ সুজা মসজিদ

বাংলার ইতিহাসে মোগল অধ্যায়ের একটি উজ্জ্বল নাম শাহ সুজা। তিনি মোগল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় ছেলে। তিনি বাংলার সুবাদার ছিলেন ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। স্থাপত্য প্রেমের জন্য শাহজাহানের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। তাজমহলের মতো আশ্চর্য স্থাপনা যে খ্যাতির প্রাণরস জুগিয়ে যাচ্ছে যুগ যুগ ধরে। পিতার এ স্থাপত্য প্রেম পুত্র সুজার মাঝেও কিছুটা বিরাজিত ছিল। এর নমুনা ছড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গা তীরের বড় কাটারা থেকে শুরু করে ধানমন্ডি ঈদগাহ হয়ে সুদূর কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে শাহ সুজা মসজিদ পর্যন্ত। প্রাচীন এ মসজিদ কুমিল্লা শহরের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ হিসেবে খ্যাত। এর বয়স ৩০০ বছরের বেশি। এ মসজিদের প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ কৈলাসচন্দ্র সিংহ তার রাজমালা বা ত্রিপুরার ইতিহাস গ্রন্থে বলেন, ‘গোমতী নদীর তীরে কুমিল্লা নগরীতে সুজা মসজিদ নামক একটি ইষ্টক নির্মিত বৃহৎ মসজিদ অদ্যাপি দৃষ্ট হয়ে থাকে। এ মসজিদ সম্পর্কে দুই ধরনের প্রবাদ শ্রুত হওয়া যায়। প্রথমত. সুজা ত্রিপুরা জয় করে বিজয়বৃত্তান্ত চিরস্মরণীয় করার জন্য এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয়ত. মহারাজ গোবিন্দ মানিক্য সুজার নাম চিরস্মরণীয় করার জন্য নিমচা তরবারি ও হিরকাঙ্গুরীয়ের বিনিময়ে বহু অর্থ ব্যয় করে এ মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। দ্বিতীয় প্রবাদ অপেক্ষা প্রথমোক্ত প্রবাদ সত্য বলে ধারণা করা হয়। (রাজমালা : পৃষ্ঠা ৯৩-৯৪, ২য় ভাগ অধ্যায় : ৭)।

এ ছাড়া আরো রয়েছে কর্নেলের মুড়া, বৈরাগী মুড়া, বালাগাজীর মুড়া, চন্ডী মুড়া, ছিলা মুড়া, হাতিগাড়া মুড়া, পাক্কা মুড়া, উজিরপুর টিলা, রূপবানী মুড়া, কোটবাড়ী মুড়া, ভোজ রাজার বিহার, চিতোড্ডা মসজিদ, অর্জুনতলা মসজিদসহ আরো অনেক প্রাচীন নিদর্শন কুমিল্লার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে। সম্ভব হলে সময় সুযোগমতো সে সব স্থান থেকেও ঘুরে আসতে পারবেন। এতে আপনার অজানা অনেক রহস্যের উন্মোচন ঘটবে। বিশেষ করে শিশুদের জন্য কাজে দেবে আপনার এই ভ্রমণ।

কোথায় খাবেন

কোথায় খাবেন, সেটা নির্ভর করছে আপনি লাঞ্চ টাইমে কোথায় অবস্থান করছেন তার ওপর। যদি কোটবাড়ীতে থাকেন, তা হলে কোটবাড়ী বাজারে এসে ঝাল বাংলা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করতে পারেন। কুমিল্লা শহরে থাকলে বাংলা রেস্টুরেন্ট, ইউরো কিং রেস্টুরেন্টসহ বেশ কিছু বিলাসবহুল রেস্টুরেন্ট পাবেন। আপনার পছন্দমতো যেকোনো একটায় খেতে পারেন। আর যদি পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে থাকেন, তা হলে লাঞ্চ করতে হবে হোটেল নূরজাহানে। এটি দেশের প্রথম থ্রিস্টার হোটেল। আর হ্যাঁ কুমিল্লা এসে প্রিয়জনদের জন্য ঐতিহ্যবাহী রসমালাই ও খাদি কাপড় নিতে ভুলবেন না। আসল খাদি পাবেন কান্দিরপাড়ের রামঘাটে। আর রসমালাই পাবেন মনোহরপুরে। রাস্তার পাশে শত শত মাতৃভান্ডার দেখবেন। এদের একটিও আসল নয়। অতএব কেনার আগে সতর্ক থাকবেন।

খরচ হবে কত

এত জায়গার নাম দেখে আপনি হয়তো টাকার পরিমাণের কথা ভাবছেন। না অত খরচ করতে হবে না। স্পট বেশি হলেও সবগুলো প্রায় কাছাকাছি দূরত্বে। এটাই কুমিল্লার সুবিধা। কম সময় ও কম খরচে অনেক কিছু দেখা যায়। যাতায়াত ও খাওয়া মিলিয়ে সর্বসাকুল্যে ২-৩ হাজার টাকা হলেই কুমিল্লায় ঘোরা যাবে।

 

"