চাঁদের মাটিতে চাষাবাদ

প্রকাশ | ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

রাখি রায়হান

চাঁদে মানুষের পদচারণা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। সেই ইতিহাস আমরা সবাই জানি। এবার পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ কোটি কিলোমিটার দূরে চাঁদের মাটিতে চাষাবাদের চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি এ সুখবর দিয়েছে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম ‘সিনহুয়া’। মাটিতে নামা চীনা ল্যান্ডারে বীজ ফেটে বেরিয়ে আসা রাশি রাশি তুলার ছবি প্রকাশ করেছে এই বিখ্যাত সংবাদমাধ্যমটি। ক্যাপশন করেছে, ‘চাঁদে এই প্রথম মানবসভ্যতা জীববিজ্ঞানের পরীক্ষাটা সফলভাবে শেষ করতে পারল।’ অথচ একসময় আমরা চাঁদকে বলতাম ঝলসানো রুটি। কিন্তু আজ সেখানে মানুষের প্রচেষ্টায় বেড়ে উঠছে প্রাণ। ভাবতে পারা যায়?

চেষ্টা করলে কি না হয়? মানুষের অদম্য প্রচেষ্টা তা আবার প্রমাণ করল। অনেক দিন ধরেই চাঁদে মানুষের বসবাস নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু গেলে খাবে কী? না খেয়ে তো আর থাকা যাবে না। বেঁচে থাকার জন্য তো রসদ দরকার। তাই প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে তুলা ফলাল পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহে। চাঁদেরই সেই তাপমাত্রায় তুলার বীজ ফেটে বেরিয়ে এলো রাশি রাশি তুলা। আরো মজার বিষয়, সেটা ঘটল চাঁদের এমন এক প্রান্তে, যে দিকটা কোনো দিনই দেখা যায় না পৃথিবী থেকে। যেদিকে দিন কয়েক আগে এই প্রথম ‘পা’ রেখেছে সভ্যতা। নেমেছে চীনা ল্যান্ডার ‘চাঙ্গে-৪’। গত ৩ জানুয়ারি। তার নতুন একটা নামও

হয়েছে। ‘ইউতু-২’।

এবার চাঁদে মহাকাশচারীদের জন্য আর লেটুস পাতা বা নানা রকমের পুষ্টিকর শাকপাতা পৃথিবী থেকে নিয়ে যেতে হবে না। সেসব নিয়ে যাওয়ার জন্য পাঠাতে হবে না ‘রিসাপ্লাই মিশন’। সে কারণে বলা যায়, চাঁদ বা মঙ্গলে সভ্যতার দ্বিতীয় উপনিবেশ গড়ে তুলতে গেলেও ফসল উৎপাদনের ভাবনাটা আর ভাবতে হবে না। এ কথা বলেছেন চাঁদের মাটিতে নামা চীনা ল্যান্ডারে ওই সফল পরীক্ষার মূল ‘কারিগর’ চিফ ডিজাইনার অধ্যাপক শি গেংশিন। তার কথায়, ‘যেখানে মাধ্যাকর্ষণ বল প্রায় নেই বললেই চলে, সেখানেও কীভাবে গাছপালা বেড়ে ওঠে, বেড়ে উঠতে পারে এই প্রথম আমরা তা বুঝতে পারলাম। যা আগামী দিনে মহাকাশে সভ্যতার দ্বিতীয় উপনিবেশ গড়ে তোলার পথে বড় দিশা দেখাবে।’

চাঁদে কী পরীক্ষা করা হয়েছিল? চীনা সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ‘চাঙ্গে-৪’ ল্যান্ডারে চাপিয়ে চাঁদে পাঠানো হয়েছিল তুলা, আলু, ইস্টের বীজ। আর ফ্রুট ফ্লাইয়ের ডিম। চাঁদের তাপমাত্রায়, পরিবেশে উদ্ভিদ আর প্রাণীর বিকাশ হয় কি না, দেখতে। বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন, উদ্ভিদের বাড় বৃদ্ধির জন্য যেটা সবচেয়ে বেশি জরুরি, সেই সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াটা চাঁদে হয় কি না। দেখতে চেয়েছিলেন, শ্বাস নিয়ে ফ্রুট ফ্লাইয়ের ডিম ফেটে বাচ্চা বেরিয়ে আসে কি না। ল্যান্ডারে রাখা ১৮ সেন্টিমিটার লম্বা আর তিন কিলোগ্রাম ওজনের একটি ক্যানিস্টারের মধ্যেই পরীক্ষাটা চালানো হয়।

উৎক্ষেপণের পর পৃথিবী থেকে চাঁদে পৌঁছতে ল্যান্ডারটির লেগেছিল ২০ দিন। ওই ২০ দিন সুপ্ত অবস্থায় রাখা হয়েছিল বীজগুলোকে। কৃত্রিমভাবে তৈরি করা পরিবেশে। চাঁদে পৌঁছতেই গ্রাউন্ড কন্ট্রোল থেকে কম্যান্ড পৌঁছায় চীনা ল্যান্ডারে ‘জল ছেটাতে শুরু করো’। সঙ্গে সঙ্গে ঝরে পড়ল জল, যতটা প্রয়োজন। দেওয়া হলো বায়ু। বেড়ে ওঠার জন্য দরকার আর যা যা পুষ্টিকর উপাদান, সব কিছুই। তাতেই কেল্লা ফতে! তুলার বীজ ফেটে বেরিয়ে এলো রাশি রাশি তুলা। তখন একটাই চ্যালেঞ্জ ছিল বিজ্ঞানীদের সামনে। তা হলো, চাঁদের এক জায়গার তাপমাত্রা শূন্যের ১৭৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকার মতো হাড়জমানো ঠান্ডা, তো অন্য এক জায়গার তাপমাত্রা গা ঝলসে দেওয়ার মতো ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর ল্যান্ডারের গতির সঙ্গে সেই তাপমাত্রার রদবদল ঘটছে অতি দ্রুত হারে। এই পরিস্থিতিতে কী বেঁচে থাকবে বীজ, পারবে বেড়ে উঠতে গায়ে-গতরে, যথেষ্টই সংশয় ছিল। তুলা সেই সংশয় ঝেড়ে ফেলল, অনায়াসে। তুলার মতোই!

৫০ বছর আগে সভ্যতা প্রথম পা রেখেছিল চাঁদে। ১৯৬৯ সালে চাঁদে নেমেছিলেন ‘অ্যাপোলো’-এর তিন মহাকাশচারী। আমেরিকার পতাকা উড়েছিল চাঁদের সেই প্রান্তে, পৃথিবী থেকে দেখা যায় যে দিকটিকে। ৫০ বছর পর ২০১৯-এ ফের ইতিহাস সৃষ্টি হলো চাঁদে। দেখা গেল, পৃথিবী থেকে মহাকাশযানের পিঠে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া তুলার বীজ ফেটে বেরিয়ে এলো রাশি রাশি তুলা। আর সেই তুলা জন্মাল চাঁদের না দেখা প্রান্তে।

আর এই ইতিহাসটা এগিয়ে যাওয়ার। এর আগে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ফসল ফলানো গিয়েছিল, পৃথিবী থেকে বীজ বা চারা নিয়ে গিয়ে। কিন্তু সেই মহাকাশ স্টেশন তো রয়েছে পৃথিবীর খুব কাছেই। ভূপৃষ্ঠ থেকে খুব বেশি হলে ৪০০ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথে। চাঁদ যে রয়েছে তার ১ লাখ গুণেরও বেশি দূরত্বে!

সূত্র : সিনহুয়ার টুইটার অ্যাকাউন্ট

 

 

"