বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ

প্রকাশ | ১০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০

মো. শহীদুল্লাহ

এখন যে ভূখণ্ড নিয়ে বাংলাদেশ, সেই জায়গাটুকু ব্রিটিশ ভারতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি নামক প্রদেশের শাসনাধীন ছিল। ১৯৪৭ সালে যখন দ্বিজাতি-তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তখন এই ভূখ-টুকুর নাম রাখা হলো পূর্ববঙ্গ। আরো পরে এর নাম রাখা হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বপাকিস্তান প্রদেশ। তৎকালীন পাশ্চিম পাকিস্তানের অন্য চার প্রদেশের নাম ছিল পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ (এখন পাখতুনখোয়া প্রদেশ)। পূর্বপাকিস্তান ও পাকিস্তানের এই চার প্রদেশ থেকেই হিন্দু ও অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জীবন এবং ইজ্জত বাঁচাতে জন্মভিটা ছেড়ে ভারতে গেছেন। পূর্বপাকিস্তান স্বাধীন হয়ে যখন বাংলাদেশ হলো, সেই নতুন দেশের সংখ্যালঘুরাও শান্তিতে মাথা উঁচু করে থাকতে পারেননি। তাদের বিরাট অংশ দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। পাকিস্তান পর্বে মুসলিম লীগের হিন্দুবিরোধী ফ্যাসিবাদী নীতির কারণে হিন্দু ও অন্য ধর্মের সংখ্যালঘুরা পাকিস্তানের কোনো অংশকেই নিজেদের জন্য নিরাপদ ভাবতে পারেননি। তারা কেউ স্বেচ্ছায় এবং কেউ গরিষ্ঠ সম্প্রদায়ভুক্ত লুটেরাদের হামলা-হুমকির কারণে নিরুপায় হয়ে নিজের শিকড়ভূমি ছেড়েছেন। পূর্ব পাকিস্তানে গণমানুষের স্বাধিকার আদায়ের আন্দোলন যখন শেখ মুজিবুর রহমানের অসাম্প্রদায়িক আদর্শের আলোকে শুরু হলো, তখন তারা অন্ধকার রাতের দুর্গম পথে প্রজ্বালিত মশাল দেখলেন। ওই আন্দোলনে তারা জড়িত হলেন সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করলেন। তাদের আকাক্সক্ষা ছিল ৬ দফার এই স্বাধিকার আন্দোলন একসময় স্বাধীনতার লড়াইয়ে পরিণত হবে। তারা পাবেন প্রকৃত গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। রেহাই মিলবে পাকিস্তানি শাসকদের সংখ্যালঘু নিপীড়ন থেকে। ১৯৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে স্থান দেওয়া হলো; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করলেন তার নতুন দেশ গড়ার কাজ। কিন্তু তিনি যে শোষণমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে লালন করতেন, তা নিয়ে বেশিদূর এগোতে পারলেন না। কারণ তিনি তার দল আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এবং এর বাইরের নানাবিধ অপশক্তির দ্বারা পদে পদে অন্তর্ঘাতের শিকার হলেন। একপর্যায়ে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে তাকে সপরিবারে হত্যা করা হলো। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আবার বন্দি হলো আইয়ুব-মোনায়েমের ভাবশিষ্যদের হাতে। এ ঘটনা দেশের সংখ্যালঘুদের মনে বিরাট হতাশার সৃষ্টি করল। তাদের অনেকেই ভাবলেন, এ দেশ আর তাদের বসবাসের উপযোগী হবে না। তাদের দেশ ত্যাগ চলতে থাকল। এতে ৭৫-এর কুশিলবরা হাসিমুখে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেনÑ ভালোই তো হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এবং বাম প্রগতিশীলদের সমর্থক ও ভোট কমছে। সংখ্যালঘুদের এই যে রাজনীতির গুটি হওয়া কিংবা বন্দুকের নলের খোরাক হওয়া, এটা শুধু বাংলাদেশে না, ব্রিটিশশাসিত ভারতেও সমানভাবে পরিলক্ষিত। সংখ্যাগুরু ধর্মীয় সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর লোকরা তাদের প্রতিপক্ষ অন্য ধর্ম, বিশ্বাস ও ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের ওপর চালিয়েছে লোমহর্ষক নির্যাতন, নিপীড়ন ও জাতিগত নির্মূলীকরণÑ মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ ধরনের নির্যাতন ও নির্মূলীকরণের ভূরি ভূরি সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে। অনগ্রসর সমাজ বা রাষ্ট্রে (মধ্যপ্রাচ্য, মিয়ানমার, চীন, ইরান, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, পাকিস্তান ও ভারত) এই মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংখ্যালঘু নির্যাতন ও হত্যা আজও অব্যাহত রয়েছে। আসুন ফিরে তাকাই আমাদের

মাতৃভূমির দিকে।

ব্রিটিশ ভারতে ১৯৪১ সালে প্রদেশওয়ারি লোকগণনা অনুযায়ী তৎকালীন বাংলাদেশে (ইবহমধষ ঢ়ৎবংরফবহপু) মুসলিম ৫৩%, হিন্দু ৪৭ শতাংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে অবিভক্ত বাংলাকে টুকরো করে যে অংশটি ‘পূর্ববঙ্গ’ পরে পূর্ব পাকিস্তান হলো, সেখানে শতকরা ৭০ জন মুসলিম, ২৭ জন হিন্দু এবং ২ শতাংশের সামান্য বেশি বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ছিল। বর্তমান বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা শতকরা ৯-১০%, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রায় ২%।

বাংলার পূর্ব অংশের ধনী, শিক্ষিত ও বর্ণহিন্দুরা (ব্রাহ্মণ, কায়স্থ, বৈদ্য) রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানকে মেনে নেননি। তারা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় ভারতকে নিজ দেশ মান্য করে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন। এই শ্রেণির হিন্দুরা কলকাতা এবং ভারতের অন্যান্য শহর-বন্দর থেকে সে সময় অনুন্নত ও সাংস্কৃতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পূর্ববঙ্গে ফেরেননি। পূর্ববঙ্গ তথা পূর্ব পাকিস্তানে থাকা তাদের অনেক সম্পত্তি বেহাত হয়েছে। কিছু বিক্রি করতে পেরেছেন। কোনো কোনো পরিবার ভারত থেকে পূর্ববঙ্গে আসা মুসলিম পরিবারের সঙ্গে সম্পত্তি এওয়াজ বদল করেছেন। এর বাইরেÑ বড় ভূমিস্বামী, বড় বণিক, মহাজন, জোতদার, জমি ও বাড়ি থেকে দূরে বসবাস করা পেশাজীবী এবং অনুপস্থিত হিন্দু ধনীদের বাড়ি ও সম্পদ তাদের প্রতিবেশী এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান মুসলিম নেতারা এবং ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে বিশ্বাসী উঠতি মুসলিম

গু-া-পা-ারা দখল করে নেয়।

এর পরও বিপুলসংখ্যক বৈশ্য (তথাকথিত নিচু জাতের হিন্দু), নমশূদ্র এবং তফসিলি জাতিভুক্ত অমুসলিম পূর্ব পাকিস্তানে থেকে যান, দেখি না যদি থাকা যায় এই দোদুল্যমানতা নিয়ে। ১৯৪৬ সালের শেষদিকে নোয়াখালী ও বরিশালে হিন্দু নিধন, ধর্মান্তরকরণ, ধর্ষণ ও হিন্দু নারী অপহরণ এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্য স্থানে ১৯৫০ সালের হিন্দু নিধন, ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু নিধন, লুটপাট ও নারী নির্যাতন এবং ঢাকায় সাম্প্রদায়িক খুন-খারাবি ও আক্রমণের শিকার হন। হিন্দুদের এই দুর্দিনে পাকিস্তানের প্রশাসন ও মুসলিম লীগের নেতারা ক্ষতিগ্রস্ত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়াননি। এসব অমানবিক কর্মকা- দেখে তাদের মনোবল একবারে ভেঙে যায় এবং তারা ভারতের ত্রিপুরা, মেঘালয়, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে পাড়ি জমান। এই সমসাময়িককালে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের দ্বারা অত্যাচারিত ও খুন-জখমের শিকার হয়ে মুসলিমরাও (হিন্দুদের তুলনায় কম) কলকাতা, এর আশপাশ এলাকা, পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উত্তর প্রদেশ, আসাম, পাঞ্জাব, দিল্লি, কাশ্মীর ও ভারতের অন্য অঞ্চল থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ও পশ্চিম পাকিস্তানে উদ্বাস্তু

হয়ে আসে।

১৯৭০ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ব্যাপক গণহত্যা চালায়। এরপর ১৯৯২ সালে ভারতের অযোধ্যায় উগ্র হিন্দুদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা, বরিশাল, ফরিদপুর ও অন্য স্থানে হিন্দুরা হামলা ও খুন জখমের শিকার এবং হিন্দু নারীরা ধর্ষণের শিকার হন। এসব হামলায় প্রশাসন সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ভালোভাবে দেয়নি। তা ছাড়া পাকিস্তানের মুসলিম লীগ সরকারের একটা অঘোষিত লক্ষ্যই ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দুশূন্য করা। এসব কারণে জীবন, সম্পদ, নারীর ইজ্জত ও বংশমর্যাদা রক্ষার জন্য সংখ্যালঘু হিন্দু ও অমুসলিমরা নিজ জন্মভিটা ত্যাগ করে ভারতে পাড়ি জমিয়েছেন। বিপরীতে ভারতে গণতন্ত্র, মানবাধিকারের সুরক্ষা, সিভিল সোসাইটির ন্যায়কণ্ঠ বলিষ্ঠ থাকা এবং আইনের শাসন থাকার কারণে মুসলমানদের ভারত ছাড়তে হয়নি।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় প্রণীত শত্রু সম্পত্তি আইনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল বিনা পয়সায় হিন্দুর সম্পদ রাষ্ট্রের দখলে নেওয়া। হিন্দুদের পাকিস্তান ত্যাগের আরেকটা বড় কারণ হলোÑ নিরাপত্তাহীনতা ও শত্রুসম্পত্তি আইন করে তাদের পথে বসিয়ে দেওয়া। তা ছাড়া হিন্দুরাই ছিল অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা, ধন, মান ও সম্পত্তির মালিক। তাদের চোখের সামনে জমিদারি, তালুকদারি ও মহাজনি ব্যবস্থা বাতিল করা হলো। তা-ও করল ‘মুসলমানের বাচ্চা’ ও কৃষক প্রজা পার্টির নেতা এ কে ফজলুল হক। মুসলিমরা শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়েছে। এমনকি রাজনীতি ও চাকরি-বাকরিতেও তারা ভাগ বসাচ্ছে। পাকিস্তানের ভাবধারায় (প্যান ইসলামিক) উজ্জীবিত মুসলিম তরুণরা হিন্দু বড় লোকদের আর আগের মতো বাবু-কর্তা বলে ডাকছে না। মাথা নুয়ে প্রণাম করছে না। বর্ণহিন্দুর জন্য নিজভূমে এই যে বিরূপ পরিবেশ, তা সহ্য করতে না পেরে নাক-উঁচু এবং সাম্প্রদায়িক হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ ত্যাগ করেছেন মুসলমানদের প্রতি জাত্যাভিমানী ঘৃণা থেকে। তাদের সঙ্গে দেশ ছেড়েছে হিন্দুকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল গরিব হিন্দুরা (নাপিত, ধোপা, তেলি ও বেহারা শ্রেণির মানুষ)।

পূর্ববঙ্গ হিন্দুশূন্য হওয়ার প্রধান কারণÑ তাদের ওপর মুসলিম জিহাদিদের হত্যা, হুমকি ও বিধর্মী নিধন (চৎড়মড়স) ও হিন্দুদের সম্পত্তিকে ‘মালে গনিমত’ মনে করে দখল করা। মিয়ানমারের রাখাইনে আজ মুসলিমদের যে দশা, ঠিক একই দশা হয়েছিল ১৯৪৭-১৯৭০ পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তানে হিন্দুদের। পাকিস্তানের কোনো অংশেই হিন্দুর নিরাপত্তা, সামাজিক মান-সম্মান ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা ছিল না। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন তফসিলি সম্প্রদায়ের নেতা দারুণ পাকিস্তানভক্ত বরিশালের যোগেন ম-ল। শেষে তার অবস্থা এমন হয়েছিল, তাকে পাকিস্তান ছেড়ে পালাতে হয়েছিল। তিনি কলকাতায় গিয়ে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের কাছে যে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন, তাতে তৎকালীন পাকিস্তানে হিন্দুর কী নাজুক দশা হয়েছিল, তার হৃদয়বিদারক বর্ণনা আছে। যারা রাজনীতি ও ইতিহাসসচেতন, তারা জানেন ব্রিটিশ আসামের শ্রীহট্ট (সিলেট) জেলা গণভোটের মাধ্যমে পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশভুক্ত হয়েছে। কিন্তু অনেকেই জানেন না যোগেন ম-লের তফসিলি সম্প্রদায়ের ১৫ হাজার ভোট পাকিস্তানের পক্ষে পড়ে ছিল এবং সেটাও যোগেন ম-লের প্রচারাভিযানের কারণে। সিলেটবাসী কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশের আমরা কেউ কী যোগেন ম-লের সম্মানার্থে কোনো স্মৃতি রেখেছি! কারণ আমরা যে জাজিরাতুল আরবের মরু ও নিরস ভাবনার মুসলমান, কোনো সনাতন ধর্মের মানুষকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো তো আমাদের জন্য পাপ!! আমার দাদি আমাকে শিখেয়েছেন হিন্দু মারা যাওয়ার সংবাদ শুনলে বলতে হবে ‘ফি নারে জাহান্নামা খালে দিনা ফিহা’। আমার দাদি এই মানুষবিদ্বেষী ঘৃণাবাণি কীভাবে কার কাছ থেকে পেয়েছেন আমি জানি না। পরে অনুসন্ধান করে মনোস্থির করেছি, নিশ্চয়ই কোনো আফগান কাবুলিওয়ালা কিংবা ফরায়েজি আন্দোলনের কোনো কাঠমোল্লার কাছ থেকে। টাঙ্গাইলের রণদা প্রসাদ সাহা। তিনি সিলেটে গণভোটের সময় পাকিস্তানের পক্ষে প্রচার চালানোর জন্য মুসলিম লীগের তহবিলে এক হাজার টাকা এবং পাঁচ শতাধিক নৌকা ভাড়ার খরচ বহন করেছিলেন। সেই রণদা প্রসাদকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী।

রাষ্ট্রের সংখ্যালঘুনীতি : পাকিস্তান আমলে মুসলিম লীগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দীন, লিয়াকত আলি খান, জেনারেল আইয়ুব খান, নুরুল আমীন ও মোনায়েম খানদের রাষ্ট্র পরিচালনায় একটা গুপ্ত ফ্যাসিবাদী নীতি ছিল। ওই নীতির মূল কথা ছিল, পাকিস্তানকে অমুসলিম (বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টান) শূন্য করা। অন্যদিকে কমিউনিস্টদের শিরদাড়া এক্কেবারে ভেঙে দেওয়া। এ কারণে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা নির্মমভাবে নির্মূলীকরণের শিকার হন এবং পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান সাজ্জাদ জহিরকে ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ঠাঁই হয়নি ইলা মিত্রদের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শত শত হিন্দু নারী-পুরুষকে। রাষ্ট্রের এই হিটলারি নীতির কারণেই পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নেতা যোগেন ম-লকে কলকাতায় আশ্রয় নিতে হয়। বাংলাদেশ পর্বে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বেগম জিয়ার সংখ্যালঘু নীতি হুবহু খাজা নাজিমুদ্দীন ও লিয়াকত আলি খানদের মতোই। এ কারণে বেগম জিয়া-গোলাম আজম-নিজামীদের আমলে দেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও কাদিয়ানিদের রাষ্ট্রীয় বৈষম্য এবং জঘন্য হামলার শিকার হতে হয়েছিল। মাটিতে মিশে গিয়েছিল তাদের সামাজিক মানসম্মান। তাদের জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা ছিল না।

এ ব্যাপারে আরেকটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে, তা হলো ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার। রাজনৈতিক ইসলাম ও রাজনৈতিক হিন্দুত্ব সংখ্যালঘু অন্য ধর্মের মানুষকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক মনে করে। এর মারাত্মক কুফল আমরা পাকিস্তান আমলে দেখেছি। বাংলাদেশে জেনারেল জিয়া এবং তার পতœী খালেদা সরকারের আমলে বারবার প্রত্যক্ষ করেছি। তা ছাড়া শুধু পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা কয়েকটি দেশ কিংবা বাংলাদেশে নয়Ñ মুসলমানরা যেখানে সংখ্যাঘরিষ্ঠ সেখানে তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে একটা ভয়ংকর সামাজিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য (ঝড়পরড়-ৎবষরমরড়ঁং যবমুসড়হু) তৈরি করে। খাঁটি মুসলমানরা এ কাজকে তাদের ইমানি দায়িত্ব বলে মনে করেন। এই সামাজিক ও মনোজাগতিক আধিপত্যবাদ বা খবরদারিপনা এতই সর্বগ্রাসী যেÑ এর সুপ্ত ও প্রকাশ্যে ঘৃণার আগুনের সামনে কোনো প্রকার ধর্মীয় বা দার্শনিক অর্থে সংঘ্যালঘুরা দাঁড়াতে পারেন না। তারা বাধ্য হয়ে এই দমবন্ধ পরিবেশ ত্যাগ করে হাফ ছেড়ে বাঁচতে চান। তারা নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। গোটা পাকিস্তান আমল ও বাংলাদেশ পর্বে জিয়া-খালেদার শাসন হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানদের জন্য নিজ মাতৃভূমি সে রকমই এক দাউ দাউ করে জ¦লতে থাকা দোজখে পরিণত হয়েছিল। মুসলমানদের এই সামাজিক ও রাজনৈতিক ইসলামের আধিপত্যের কারণে মুক্তমনের সংখ্যালঘুরা মৌলবাদী জেহাদি ও জঙ্গিদের দ্বারা হত্যার শিকার হন। অন্যরা দেশ ছেড়ে প্রাণ বাঁচান। যারা দেশে থাকেন, তারাও তাদের বিজ্ঞানমনস্ক বুদ্ধি ও জ্ঞানসজ্ঞত অভিমত ও লেখা প্রকাশ করতে সাহস পান না।

এই যে সামাজিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের কথা, তা যে শুধু রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে আছে তা নয়, হিন্দু সমাজেও আছে। ভারত-ইতিহাসের অনুসন্ধিৎসু পাঠক এ বিষয়টা দেখতে পাবেন গত শতাব্দীর তিরিশের দশকের ভারত বর্ষের আর্যাবর্তে (আজকের গোবলয়) কংগ্রেস নেতা মদনমোহন মালব্য, সাধু দয়ানন্দ স্বরসতী ও সন্ন্যাসি শ্রদ্ধানন্দ মহারাজের অনুসারীদের মুসলিমবিরোধী হিংসা-হানাহানি এবং নামাজের সময় মসজিদের সামনে ঢোল বাজানো সম্পর্কে খোঁজখবর নিলে। সমসাময়িককালে (১৯২৮) ঢাকায় বুদ্ধি মুক্তির লেখাজোখা শুরু করেছিলেন শিখাগোষ্ঠীর আবুল হোসেন ও কাজী আবদুল ওদুদ। ঢাকার মুসলিম আদিপত্যবাদীরা তাদের মুক্তবাক যুক্তি-বুদ্ধি সহ্য করেননি। এই দুজনকেই বলিয়াদী জমিদার বাড়িতে ও নবাবদের আহসান মঞ্জিলে তলব করে তাদের শরিয়া(!) পরিপন্থী বক্তব্যের জন্য ক্ষমাপত্র লেখে দিতে বাধ্য করা হয়। এ অপমান সহ্য করতে না পেরে এই দুই আলোকিত মানুষ ঢাকার মুসলিম সরদারদের লাঠি-বল্লমের আঘাত থেকে বাঁচতে কলকাতায় চলে যেতে বাধ্য হন। ওদিকে সামাজিক সাম্য ও গণতন্ত্রের পূজারি ভীম রাও জি অম্মেদকর ব্রাহ্মণ্যবাদের হিংসা ও সামাজিক তাচ্ছিল্যের শিকার হয়ে তার দশ হাজার অনুসারী নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। এই ধর্ম-রাজনীতির ফ্যাসিবাদী বহিঃপ্রকাশই হলো ভারতে আজকের বিজেপি বা নরেন্দ্র মোদি। অন্যদিকে এর করুণ শিকার গোমাংস ভক্ষণকারী গরিব মুসলিমরা।

ইউরোপে ফরাসি বিপ্লব-পূর্ব যুগে রাজা-সম্রাট-পাদরিদের ধর্মীয় হানাহানি-খুনোখুনি বাদই দিলাম, ধর্ম-রাজনীতির এক ভয়ংকর ফল কী আজও আমরা দেখছি না ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে? তাই আমাদের এখন দরকার গণতান্ত্রিক নাগরিক রাষ্ট্র। যে রাষ্ট্রের অর্থনীতি হবে সমাজকল্যাণমূলক এবং রাষ্ট্র ও সমাজের চোখে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ এবং জাতিভেদে সব মানুষ হবে সমান। থাকবে আইনের সুশাসন, মানুষের প্রতি মানুষের সহমর্মিতা ও পরমতসহিষ্ণুতা। যুক্তি, আধুনিক বুদ্ধি ও প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং ধনী-গরিবের আয়বৈষম্য দ্রুত কমিয়ে এনে সমাজের স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য বজার রাখার অর্থনৈতিক নীতি আজ আমাদের দেশের সময়ের চাহিদা। ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’ এই মূলমন্ত্রই হোক আমাদের আগামী দিনের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পাথেয়।

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

 

"