পল্লিপ্রেম

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

মাজহারুল ইসলাম

গাঁয়ের পুবে গাবের বাগে

বাঁশের মধুর বাঁশি বাজে

পিয়াল-তমাল-হিজলতলা

রঙিন জমিন ফুলের মেলা।

 

খালের শান্ত জলের ’পরে

জিওল-পোনা দমটি ছাড়ে

ঘাইতে ওঠে বৃহৎ বোয়াল

জেলে বাঁধে জালের দেয়াল।

 

বালক সেঁচে বদ্ধজলা

পানার ছোবায় লুকায় মলা

জলার পাড়ে শুকনো ডালে

পানিকাউর পাখনা মেলে।

 

সরল বাটের কনের সিঁথি

দিঘির ঘাটের ঘনবীথি

প্রভাত স্নানে পল্লিবধূ

মৌয়াল জোয়ান জোগায় মধু।

 

হালট ছেড়ে ব্যোমের পথে

ঈষাণ কোনের রেখাপাতে

গগণ ঢাকে গাঢ় মেঘে

বিজলি জ্বলে জোর নিনাদে।

 

কার পানে ওই পল্লিবালা

হাতছানি দেয় হয় উতলা

প্রেম তাড়নায় প্রণয় অপার

কাটে দীঘল বিষাদ আঁধার

 

মন্ডা মিঠাই পিঠা নিয়ে

বড়’পা বাড়ি ছোটদা গিয়ে

বোনটি আপন চিরদিনের

নাইওর আনবে বেশ কদিনের।

 

ঢেউয়ের ’পরে মাঝের গাঙে

ছইয়ের নাওয়ে পাল টাঙ্গিয়ে

নাইওরি যায় নাথবতী

ভাবনাতে তার বাল্যস্মৃতি।

 

বটের তলে হাটের বায়ে

কামার ঠুকে ভোঁতা দায়ে

হাটে বিকোয় সরস মালাই

দু’সের নিলেন নতুন জামাই।

 

শ্বশুরবাড়ি জমায় পাড়ি

ফিরবে ঘরে বধূ তারই

গরুর গাড়ি দুজন মিলে

আজকে রাতের সকাল হলে।

 

ফাগুন মাসের ক্ষীণ খরায়

দিনের শিমুল আগুন রাঙায়

শীতের শেষে কাজের তরে

কৃষাণ-রাখাল খেত খামারে।

 

গৃহদেবী মাঠে যখন

আনে লঙ্কা পান্তা বাসন

লাঙল রেখে বিরাম চাষে

প্রভাত প্রাশন আলে বসে।

 

শ্যাম মানবীর করের পরশ

নাচলো হৃদয় তনু বিবশ

খড়কুড়োনি কুটো নাড়ে

মাঠের রাখাল তাকায় আড়ে।

 

শান্ত নদী হংস ভাসে

অলস বিকেল আশিন মাসে

চপল কিশোর বন পানে যায়

কাঠবিড়ালি ছুটে পালায়।

 

দূর্বা ঘেরা মাটির পথে

ষাঁড়ের খুরের খুব আঘাতে

ধূলি ওড়ে হয় গোধূলি

সন্ধ্যা রবি লাল আধুলি।

 

অরুণ যখন নিশির ফাঁদে

তারার জ্যোতি চিকন চাঁদে

ঝোপে কটি জোনাক জ্বলে

প্রণয়িনীর দীপক তেলে।

 

ছনের ছাওয়া সোনার কুঁড়ে

তাঁতি যুগল বসত গড়ে

শীতল পাটি নিদের ভুবন

দীপ শিখাটি নিভায় পবন।

 

ক্লান্ত রাতের ঘুম ভাঙাতে

মোরগ ডাকে পাখির সাথে

ভোরের বায়ুর বাজে স্বপন

কুহেলিকার প্রাণদ ভ্রমণ।

 

ভাসান বিলের ভেজা মাঠে

পুবের কোণে রবি ওঠে

মাটির ঘরে কাদার লেপন

প্রলেপ শুকায় প্রভাত তপন।

 

বছর শুরুর মেলায় এসে

পথের ধূলি বাও বাতাসে

গাঁয়ের যুগল দোলায় হৃদয়

ভিড়ের মেলা ভীষণ সদয়।

 

হলুদ বসন গাইয়ে তিরী

বাউলা গীতের সুরলহরি

জলদ লয়ের ঘূর্ণিজলে

কলমি-কমল পাপড়ি মেলে।

 

বর্ষাকালের পাটের খেতে

হলুদ পোকা উঠলো মেতে

পিঁপড়েগুলো ধীর মুসাফির

বিষের কাঁটার একরোখা বীর।

 

সবুজ পাটের ভরা জমি

নয়া প্রেমের প্রণয় ভূমি

গাঁয়ের বালা চাষা-যুবা

দরদ-মায়ার ক্ষণিক প্রভা।

 

চিল-শকুনের সুনীল আকাশ

পুব-দখিনের শীতল বাতাস

ভোর গগনের কোমল গীতি

গাঙশালিকের মাতামাতি।

"