সোনার বাংলা তোমায় ভালোবাসি

প্রকাশ : ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

মুহম্মদ সবুর

“এই সঞ্চয়িতা সঙ্গে থাকলে আমি আর কিছুই চাই না। নাটক নয়, উপন্যাস নয়, কবিগুরুর গান ও কবিতাই আমার বেশি প্রিয়। সব মিলিয়ে এগারো বছর কাটিয়েছি জেলে। আমার সব সময়ের সঙ্গী ছিল এই সঞ্চয়িতা। কবিতার পর কবিতা পড়তাম আর মুখস্থ করতাম। এখনো ভুলে যাইনি। এই প্রথম মিয়ানওয়ালি জেলের ন-মাস সঞ্চয়িতা সঙ্গে ছিল না। বড় কষ্ট পেয়েছি। আমার একটি প্রিয় গানকেইÑ‘আমার সোনার বাংলা’ আমি স্বাধীন দেশের জাতীয় সংগীত করেছি। আর হ্যাঁ, আমার আর একটি প্রিয় গান ডি এল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’। দুটি গানই আমি কাজের ফাঁকে গুনগুন করে গেয়ে থাকি।” নয় মাসের পাকিস্তানি কারাগারে বন্দিদশা শেষে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে আসার বারোদিন পর এই ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উচ্চারণ। যার আন্দোলন-সংগ্রাম এবং জীবন সাধনায় রবীন্দ্রনাথ অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে। তাই শান্তি নিকেতনের একসময়ের শিক্ষার্থী ও সিলেটে জন্ম সাহিত্যিক-সাংবাদিক অমিতাভ চৌধুরীকে বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথকে আমি ভালোবাসি তার মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমের জন্য। বড় হয়ে পড়লাম, ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ।’ আমাদের দেশের দুর্ভাগা মানুষের প্রতি এত দরদ আর কার আছে।” স্বাধীন দেশে এসেছিলেন সে সময়ের আনন্দবাজার পত্রিকার বার্তা সম্পাদক অমিতাভ চৌধুরী। ৩২ নম্বরের বাড়িতে সেদিন রাজনীতি নয়, কথা হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব নিয়ে। রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা যে তিনি গড়ে তুলতে চান, সে চাওয়া ও স্বপ্নের কথাও বলেছিলেন।

পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকরা বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকারকে পর্যুদস্ত করার প্রক্রিয়া চালু করে সেই সাতচল্লিশে দেশভাগের পর। নির্যাতন, নিপীড়ন, জেল, জুলুম, নিষেধাজ্ঞা, বহিষ্কারের মতো কঠিন কঠোর পদক্ষেপ যেমন নেওয়া হয়েছিল সেই আটচল্লিশ থেকেই, তেমনি রবীন্দ্রনাথকে নিষেধ, বর্জন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। শেখ মুজিবের কাছে রবীন্দ্রনাথ সাহস হয়ে দেখা দিতেন। আর সেই সাহসে ভর করে তিনি তারুণ্য থেকে পরিণত বয়স পর্যন্ত বারবার জেল খেটেছেন। ফাঁসির আসামির সেলে কাটিয়েছেন। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েননি। জানা ছিল তার, ‘ওদের বাঁধন যতোই শক্ত হবে, মোদের বাঁধন ততোই টুটবে।’ কিন্তু শেখ মুজিব সব বাধাবিঘœ মাড়িয়েছেন। তাই কণ্ঠে ধ্বনিত হতো, ‘নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার।’

সেই আটচল্লিশেই যখন জেলে গেলেন মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য, তখনো রবীন্দ্রনাথ জুগিয়েছেন প্রেরণা। মায়ের ভাষার বিলুপ্তি মানেই জাতি হিসেবে বাঙালির বিলুপ্তিÑএমনটা মেনে নিতে পারেননি শেখ মুজিব। তাই ‘বুক বেঁধে তুই দাঁড়া দেখি বারে বারে হেলিস না’ গেয়ে প্রতি পদক্ষেপেই বাঙালির স্বার্থরক্ষার আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছেন, ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’ বানিয়ে। বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের অগ্রদূত হয়ে জেগেছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সেই সংগ্রামের হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ছিলেন যিনি পঞ্চাশ, ষাট ও মুক্তিযুদ্ধেÑবাঙালির সমগ্র সংগ্রামেরই অংশবিশেষ। যে সম্মিলিত সংগ্রাম শুরু বায়ান্ন সালে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে প্রশস্ত করে নিজের দিকে ফিরে তাকানোর পথ দেখায়। বাঙালি নিজের স্বাজাত্যবোধের প্রতি ক্রমেই আগ্রহী হয়ে ওঠে। মা, মাটি, মাতৃভূমির সাথে মাতৃভাষাকে অঙ্গাঙ্গী করে স্বাধিকারকামী হতে থাকে। এই স্বাজাত্যবোধের রাজনৈতিক অগ্রনায়ক হিসেবে অবস্থান পেলেন শেখ মুজিব। আর সাংস্কৃতিক অগ্রদূত হিসেবে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ। হয়ে ওঠেন তিনি বাঙালির চেতনাস্বরূপ। যে চেতনা আপন সাহিত্য-সংস্কৃতির লালনে পুষ্ট হওয়ার পরে বাঙালিকে বিশ্বের দিকে হাত বাড়িয়ে সব গ্রহণীয় ঐশ্বর্য অধিগত করতে বলে। রবীন্দ্রনাথ হয়ে ওঠেন বাঙালির জাতিসত্তা সন্ধানের সহযাত্রী হয়ে রয়ে, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে।’ তার গান, কবিতা, নাটকসহ সাহিত্য মুক্তির সংগ্রামে ও যুদ্ধে বাঙালিকে এক অসমতম সংগ্রামে জয়ী হতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।

১৯৫৬ সালে ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন বসেছিল। পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ থেকে আসা সংসদ সদস্যদের সম্মানে কার্জন হলে আয়োজন করা হয়েছিল অনুষ্ঠানের। উদ্যোক্তা ছিলেন গণপরিষদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু বাঙালি সংস্কৃতিকেই তুলে ধরেছিলেন। তাতে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, ডি এল রায়, লোকগানও ছিল। ডি এল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ বঙ্গবন্ধুর প্রিয় গান বলেই গাওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুনও ছিলেন আমন্ত্রিত শিল্পী। তিনি মঞ্চে আসার আগে বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে তাকে বলা হলো ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইবার জন্য। কারণ তিনি চাইছেন পাকিস্তানিদের কাছে ‘সোনার বাংলা’র প্রীতি ও ভালোবাসার জানান দিতে। কিন্তু সন্জীদা খাতুনের গানটি পুরো মুখস্থ ছিল না। ‘বেকায়দা হলো, কারণ অত লম্বা পাঁচ স্তবকের গানটি যে আমার মুখস্থ নেই। গীতবিতান-এর খোঁজ পড়ল। বই হাতে পেয়ে কোনো মতে অত বড় গানটি গেয়েছিলাম আমি। গানটি বাঙালিকে কতখানি আবেগতাড়িত করে, সেইটি বোঝানোর জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের গানটি শোনাতে চেয়েছিলেন শেখ মুজিব। তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ নামটি দেওয়া হয়নি তাকে।” এরপর থেকে সন্জীদা খাতুনসহ অন্য শিল্পীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে থাকেন। আর ১৯৬১ সাল থেকে একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরির অন্যতম গান হয়ে ওঠে আমার সোনার বাংলা। এ গানকে যেন বঙ্গবন্ধু আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করে দিলেন।

সেই পঞ্চাশের দশকেই শেখ মুজিবের চেতনায় ‘আমার সোনার বাংলা’ আসন নেয় আর এই গানকে বাংলার চিত্ররূপময় গান হিসেবে নিজেও আওড়াতেন। হয়তো তখনি ভেবেছিলেন বাংলা স্বাধীন হলে এই গানকে জাতীয় সংগীত করবেন। আরো একটি গান তিনি আওড়াতেন, দ্বিজেন্দ্র লাল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গানটি, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংগীত আজ। এই গানের মধ্যেও বাংলাকে পেতেন তিনি। ১৯৬৮ সালের ১৯ জুনের ঘটনা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে ওঠানো হলো ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত বিশেষ আদালতে। সব আসামিকে (মোট ৩৫ জন) একত্র করা হলো এই প্রথম। আর তাদেরও জানা হলো কারা এ মামলার আসামি। ওই দিন সকালে লোহার জাল ঘেরা ভ্যানে ওঠানোর পর পরস্পরকে দেখে আবেগ, উচ্ছ্বাস, চিৎকার, হাসিকান্নায় ভ্যান সরগরম হয়ে উঠেছিল। ছাড়ার অল্প আগে বঙ্গবন্ধুকে ওঠানো হলো ভ্যানে। বসেছিলেন ভ্যানের পেছনের দরোজার কাছে। সশস্ত্র প্রহরাযুক্ত ভ্যানটি ট্রাইব্যুনালের পথে যাত্রা করে। মামলার আসামি পরে মুক্তিযোদ্ধা নৌকমান্ডার আবদুর রউফ সে মুহূর্তের বর্ণনা করেছেন, “ভ্যান চলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের কণ্ঠে একটি গানের কলি গুনগুনিয়ে উঠল। দেখতে দেখতে সমস্ত ভ্যানের আরোহীরাই তাতে কণ্ঠ মেলাল। শুধু বাসের ভেতর নয়, পথের দুই পাশেও ধ্বনিত হলো, ‘ধন্য ধান্য পুষ্প ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’। সশস্ত্র সেন্ট্রি ভয় পেয়ে আমাদের থামতে বলল। ভ্যানে গান গাওয়া নিষেধ আছে শুনে আমরা গান থামিয়ে দিলাম। গান থেমে গেছে দেখে বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘গান থামিয়েছিস কেন?’ আমরা বললাম যে, সেন্ট্রি গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বঙ্গবন্ধু এবার উচ্চকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আমি শেখ মুজিব নির্দেশ দিচ্ছি, তোরা গান গা...’। এরপর আমরা গাইতে শুরু করলাম। পুলিশ এবার আর কিছু বলল না। ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ গান গাইতে গাইতে আমরা ট্রাইব্যুনালে হাজির হলাম।” এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বেরিয়ে এলেন। কারাফটকের সামনে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি।’

তারও আগে সেই পঞ্চাশ দশকে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রদান, রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে সোচ্চার ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বরাবর বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানতে থাকে। আরবি ও রোমান হরফে বাংলা লেখা শুধু নয়, বাংলা ভাষায় উর্দু, আরবি, ফারসি শব্দের যথেচ্ছাচার ব্যবহার চালানোর অপচেষ্টা চলে। কিন্তু বাঙালি নিশ্চুপ থাকার নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী হওয়ার পর প্রথমেই ঢাকায় গড়ে তুললেন চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা। বাঙালির জীবন ধারায় নতুন সংযোজন ঘটল। পূর্ববঙ্গেও চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলো। বাঙালি নিজস্ব সংস্কৃতিকে তুলে ধরে চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। এমনকি ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় উর্দু ছবির অত্যধিক প্রদর্শনের বিরুদ্ধে এবং বাংলা ছবির করুণ অবস্থায় ক্ষোভ প্রকাশও করেছিলেন।

“আটান্ন সালে পূর্ববঙ্গের নাম বদলে পূর্ব পাকিস্তান রাখা হয়েছিল। বাংলা বা বাঙালি শব্দ উচ্চারণেই যেন ভীতি জাগ্রত তখন। সরকারি ফ্ল্যাটের বাসার বারান্দায় বসে বাউল সুরের অপূর্ব গান ‘আমার সোনার বাংলা’ গাইতে ভয় করতো তখন। পাঁচ স্তবকের পুরো গানখানি হৃদয়কে এতই ব্যাকুল করত যে, গানটি গাইবার ইচ্ছা দমন করাও অসম্ভব ছিল। শুধু রবীন্দ্রসংগীত বলে এ প্রীতি নয়। বাংলাদেশের বটমূল, আমের বন, নদীর কূল, ধেনু-চরা মাঠ, খেয়াঘাট, পাখি ডাকা ছায়ায় ঢাকা গ্রামের পথ, বাংলার রাখাল, বাংলার চাষিÑসব মিলিয়ে যে অন্তরঙ্গ এক চিত্র তা যেন জীবনের মূল ধরে টান দিত। ‘সোনার বাংলা’ পদবন্ধ উচ্চারণে যে প্রিয়ত্বের অনুভব তা কেবল রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী নয় সব স্বভাব-দেশপ্রেমিককে আলোড়িত করত।” এই অনুভূতি ছিল শিল্পী সন্জীদা খাতুনের। বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর যে সংগ্রাম তার সাংস্কৃতিক পরিম-লে তখন সন্জীদা খাতুনসহ সহযাত্রীরা নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। পূর্ব বাংলা নাম মুছে পূর্ব পাকিস্তান করার প্রতিবাদে সেদিন ফেটে পড়েছিল বাংলার শিল্পী সমাজ। প্রতিবাদে ধ্বনিত হলো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। বাঙালির ভাষা, গান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য বিলীন করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে কণ্ঠে তুলে নিয়েছিল রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, অতুলপ্রসাদ, ডি এল রায়ের দেশের গান। সেই সঙ্গে নতুন নতুন গণসংগীত তৈরি হতে থাকে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এসব গান। মানুষকে উদ্দীপিত করার কাজে গানের পাশাপাশি কবিতা, নাটক হয়ে ওঠে অন্যতম প্রধান উপজীব্য।

সোনার বাংলা গানটি পূর্ব বাংলার শিল্পীরা যে সুরে গাইতেন বা এখনো গাওয়া হয়, তার সঙ্গে স্বরবিতানে ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণীর ছাপা স্বরলিপির সুরের অনুসরণ নয়। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এইচ এম ভি প্রথম ‘আমার সোনার বাংলা (নম্বর-২৭৭৯০) গানের রেকর্ড প্রকাশ করে। রেকর্ডের অপর পিঠে ছিল ‘সার্থক জনম আমার’। গেয়েছিলেন রবীন্দ্রসংগীত কন্যা সুচিত্রা মিত্র। শান্তিদেব ঘোষ ছিলেন এই গানের ট্রেনার। ফলে স্বরবিতানের সুর থেকে এই সুরটি আরো বেশি বাউলাঙ্গ হয়ে পড়ে। এই সুরেই ফাহমিদা খাতুন ষাটের দশকের শেষ দিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গাইতেন। তারা সুচিত্রা মিত্রের রেকর্ড থেকেই গানটি তুলেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় গানটি এতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, “তখন বহু জায়গায় তা অশুদ্ধ উচ্চারণে ও ভুল সুরে কিন্তু সত্যিকার আবেগ দিয়ে গাইতে শুনেছি।” মুক্তিযুদ্ধকালীন শিল্পী সংস্থার অন্যতম উদ্যোক্তা সন্জীদা খাতুনের উপলব্ধি ছিল তাই। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর ‘আমার সোনার বাংলা’র প্রথম দশ চরণ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রূপে আর ডি এল রায়ের ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ জাতীয় গীত হিসেবে গৃহীত হয়। আর বঙ্গবন্ধু এভাবেই তার স্বপ্নকে রূপ দিলেন মূর্ততায়।

মনে আছে, ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি। তখন আমি কলকাতায়। বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু প্রথম আনুষ্ঠানিক সফরে গেলেন কলকাতা। যে কলকাতা তিনি ছেড়ে এসেছিলেন সাতচল্লিশের পর, ছাত্রনেতা যখন। আর এবার গেলেন বাঙালি জাতির জনক হিসেবে। ১০ ফেব্রুয়ারি প্যারেড ময়দানে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন তিনি। জনসভার শুরুতে সুচিত্রা মিত্রের নেতৃত্বে শত শত শিল্পী মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ পরিবেশন করেছিলেন। সেদিন অভিভূত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুসহ উপস্থিত জনসমুদ্র। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশকে সাহায্য ও সহযোগিতা এবং প্রেরণা জোগাতে কলকাতায় একাত্তরে রাজপথে নেমে এসেছিলেন যে শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতি গোষ্ঠী, তারাও গেয়েছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’। মুক্তিযুদ্ধকালে সুচিত্রা মিত্র, মে মাসে এইচএমভি থেকে নতুন করে প্রকাশ করেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের রেকর্ড (নম্বর ৪৩৪১৫)। অপর পিঠে ছিল সার্থক জনম আমার রবীন্দ্রসংগীতটি। যুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে গানটির যে রেকর্ড বাজানো হয়েছিল, তা কলিম শরাফীর ইএম আই গ্রামোফোন কোম্পানি উৎপাদিত ছিল। একাত্তরের ৩ এপ্রিল থেকে ২৫ মে পর্যন্ত শর্টওয়েভ ট্রান্সমিটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে গানটি প্রচারিত হয়েছিল। রামগড়ে এই কেন্দ্র চালু ছিল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের তৃৃতীয় পর্যায়ে বাজানো গানটি ছিল জহির রায়হানের জীবন থেকে নেওয়া ছবিতে ব্যবহৃত।

বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথকে প্রতিষ্ঠিত হতে হয়েছে অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংগ্রাম আন্দোলনের মাধ্যমে। দীর্ঘ পরাধীন একটি পশ্চাৎপদ জাতিকে তারা আত্মবোধনে উদ্বোধন করেছিলেন। আর সেই জাতিকে তার ভাষা, সংস্কৃতিসহ একটি রাষ্ট্র উপহার দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘বাঙালি’ বলে যে জাতির কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধু সেই জাতিকেই আবিষ্কার করেন সোনার বাংলায়। এনে দেন আত্মমর্যাদা, স্বাধীন সত্তা। এই বাংলাকে ভালোবেসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন ‘আমার সোনার বাংলা’ গান। আর বঙ্গবন্ধু তা একটি জাতির জাতীয় সংগীতে রূপান্তর করে চিরস্থায়ী করে দেন। সেই জাতীয় সংগীতের সঠিক সুর প্রয়োগ যদি না হয়, তবে বঙ্গবন্ধু বা রবীন্দ্রনাথের কাছে দায়বদ্ধতা শুধু নয়, একটি জাতির প্রতি অবহেলার নামান্তর হবে তা। তবে আশার কথা যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ জাতীয় সংগীতের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত শিক্ষা কোর্স চালু করেছে। সেখানে ছায়ানট প্রণীত স্বরলিপি অবলম্বনে জাতীয় সংগীত শেখানো হয়। কিন্তু সাধারণ স্কুল, কলেজ বা অনুষ্ঠানগুলোয় জাতীয় সংগীত যে যথাযথভাবে গাওয়া হয় না, সে বলাই বাহুল্য। বেতার-টেলিভিশনও পারে যথাসুরে জাতীয় সংগীত শেখানোর আয়োজনে এগিয়ে যেতে। বাংলার স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথ দুজনেই শারীরিক অনুপস্থিত থাকলেও ছিলেন সব সময়ই প্রতিটি মুক্তিকামী বাঙালির পাশে ও মনে এবং জীবনযাপনে। তারা তাদের দেশকে ভালোবাসতেন বলেই গেয়েছিলেন, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

"