ঈদ এক সার্বজনীন আনন্দের নাম

প্রকাশ | ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

ইসলাম ধর্ম বিকশিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী ও ধর্মের অনুসারীরা নানা ভাব ও ভঙ্গিতে ঈদ পালন করতেন। তবে ইসলাম ধর্মেই কেবল ঈদকে সার্বজনীন ইবাদত রূপে রূপায়ন করা হয়েছে। মুসলিমজাহান সিয়াম-সাধনা এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে অতীতের ভুল-ভ্রান্তির ক্ষমা চেয়ে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে চলার অঙ্গীকারে প্রত্যয়ী হওয়ার এক সফল অনুষ্ঠান এই পবিত্র ঈদ। বর্তমান ঈদকে কেবল ধর্মীয় কিংবা সামাজিক উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয় না বরং ঈদ আজ সার্বজনীন আনন্দের নাম। সামাজিক উৎসবগুলোয় আমরা যেমন আনন্দে মাতি, তেমনি প্রত্যেক ধর্মেই রয়েছে বিশেষ কিছু উৎসবমুখর দিন। সেই উৎসবগুলোও আমাদের আনন্দে ভাসায়। ব্যবধান ঘুচিয়ে এক করে। আমাদের বাংলাদেশেও রয়েছে নানা ধর্ম, গোত্রের মানুষের বাস। ঈদ, পূজা, বড়দিন, বুদ্ধপূর্ণিমা, বৈসাবি, রাস পূর্ণিমা প্রভৃতি বিশেষ দিনে সবাই আনন্দে মেতে ওঠেন। এসব ধর্মীয় উৎসব বৃহৎ অর্থে সামাজিক জীবনাচারেরই অনুষঙ্গ। এসব উৎসব উদযাপিত হয় সমাজের মধ্যেই। প্রতিটি উৎসব আমাদের একতা, ঐক্য, বড় ও মহৎ হতে শেখায়। ঈদের আনন্দে দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণির মানুষের সঙ্গে ভাগ করার মধ্যেই সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ।

মুসলমানের জন্য ঈদ একটি মহা-ইবাদতও। ঈদের ইবাদতে শরিয়ত নির্দেশিত কিছু বিধিবিধান রয়েছে, যা পালনে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও বন্ধন সুসংহত হয়। ঈদুল ফিতরের শরিয়ত দিক হলো, ঈদের নামাজের আগে রোজার ফিতরানা ও ফিদিয়া আদায় করা, ঈদগাহে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা, খুতবা শোনা এবং উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা। ঈদে আমাদের দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে আর পরস্পরের মধ্যে ইমানি ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদি এমনটা হয়, তাহলেই আমাদের এই ঈদ পালন ইবাদতে গণ্য হবে।

আল্লাহ তাআলার আদেশে এক মাস রোজা রাখার পর তার আদেশেই আমরা ঈদের আনন্দ উদযাপন করি। এক মাস রোজা আমরা আমাদের তাকওয়া ও ইমানকে বাড়ানোর জন্য রেখেছি। আমরা রমজানের রোজা এ জন্যই রেখেছি, যেন আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনকারী হতে পারি। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন ঈদ উদযাপন করার। প্রত্যেক বৈধ কাজ যা থেকে তিনি আমাদের এক নির্ধারিত সময় বিরত রেখেছিলেন আজ ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে তা করার অনুমতি দিয়েছেন। ঈদ উদযাপন মূলত আল্লাহ তাআলার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন আর কৃতজ্ঞতার সর্বোত্তম পন্থা হলো-ধনী-গরিব সবাই একত্র হয়ে ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা। এক মাস রোজা রাখার যে তৌফিক আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন, এরই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ দুই রাকাত নামাজ। তাই বলা যায়, ঈদ কেবল ভালো খাওয়ার বা ভালো পরার আর বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ ভ্রমণ করার নাম নয়, বরং কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য একটা বিশেষ সুযোগ হিসেবে আল্লাহ তাআলা আমাদের ঈদ দান করেছেন।

আমরা যে ঈদ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, আমাদের সর্বদা এটিও স্মরণ রাখতে হবে, শুধু আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে না থেকে আল্লাহপাকের ইবাদতের প্রতিও যেন দৃষ্টি থাকে। আমাদের চিন্তা-চেতনায় যে বিষয়টি জাগ্রত রাখা উচিত, তা হলো নেকি ও তাকওয়াকে প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলন করা, আর এটাই আমাদের আসল উদ্দেশ্য। এ শিক্ষাই আমাদের রমজানের রোজা আর ঈদ দেয়। দুটিই আমাদের আনুগত্যের শিক্ষা দেয়। আমরা যখন পুরোপুরি স্থায়ীভাবে আমাদের গরিব ভাইদের অভাব দূরীকরণের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করব, তখনই এটা আমাদের প্রকৃত ঈদ উদযাপন হবে। আমাদের এতে খুশি হওয়াও উচিত নয়, ঈদের দিনে গরিবদের সাময়িক খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দিয়েছি বরং যাদের সামর্থ্য আছে, তারা যেন তাদের স্থায়ী খুশির উপকরণের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করে। ঈদের এ আনন্দ তখনই সার্বজনীন রূপ লাভ করতে পারে, যখন সমাজ ও দেশের সবাই একত্রে আনন্দের ভাগী হব। আমাদের সন্তানদেরও ঈদের এ মাহেন্দ্রক্ষণে গরিবদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের শিক্ষা দিতে হবে। ঈদের যে উপহার তাদের দেওয়া হয়, তা থেকে যেন তারা একটা অংশ গরিবদের জন্য পৃথক করে নেয়। তারা যেন শুধু নিজেদের বন্ধু-বান্ধবদের প্রতিই খেয়াল না রাখে, নিজেরাই যেন ভালো খাবার ইত্যাদি না খায় বরং গরিব, অসহায় যারা রয়েছে, তাদের প্রতিও যেন খেয়াল রাখে। এ শিক্ষা আমাদের প্রত্যেক অভিভাবককে দিতে হবে।

ঈদ যেহেতু কৃতজ্ঞতারই অপর নাম, তাই আমরা যদি ইসলামের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি দিই, তাহলে দেখতে পাই, আল্লাহর কৃতজ্ঞতার ক্ষেত্রে সাহাবিরা কতই না উন্নত মানের ছিলেন। হজরত আবদুর রহমান বিন অউফ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য আরম্ভ করেন আর তার ব্যবসা এত লাভজনক প্রমাণিত হয়, তিনি নিজেই বলতেন, আমি যে বস্তুতেই হাত দিতাম আল্লাহ তাআলা তাতে এত বরকত রেখে দিতেন, যা ছিল কল্পনাতীত। আমার স্পর্শে মাটি সোনা হয়ে যেত। তাকে আল্লাহ তাআলা অশেষ ধনভা-ার দিয়েছেন, কিন্তু সেই সম্পদ পাওয়ার পরও তার আচরণ কেমন ছিল? তা কি বস্তুবাদী মানুষের মতো ছিল? একদিন তিনি রোজা রেখেছিলেন। ইফতারির সময় যখন তার জন্য খাবারের বিছানা বিছানো হয়, তখন সেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার দেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন, আর ইসলামের প্রথম যুগের কথা স্মরণ করেন, যখন দিনের পর দিন মানুষকে অনাহারে কাটাতে হতো, তখন তার নিজের অবস্থাও তেমনই ছিল। সেসব সাহাবির কোরবানির কথা তার স্মরণ হয়, যখন যুদ্ধের ময়দানে তারা শহীদ হতেন তখন তাদের জন্য পর্যাপ্ত কাফনও ছিল না। আর যে চাদর ছিল, তা এত ছোট যে, মাথা ঢাকলে পায়ে কোনো সতর থাকত না আর পা ঢাকলে মাথা খোলা পড়ে থাকত।

সাহাবিদের দৃষ্টান্ত ছিল এমনই। এখন আমাদের মঝেধ্য কজন এমন আছি, যারা স্বাচ্ছন্দ্য আসার পর নিজেদের আগের সময়কে এভাবে সচেতনতার সঙ্গে স্মরণ করি? কজন আছি যারা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার চেতনা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্য লাভের পর সত্যিকার অর্থে তার ইবাদতের প্রতি মনোযোগ দিই এবং আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ নিবদ্ধ করি? যদি আমাদের জীবনের মান উন্নত হওয়া, আর্থিক সচ্ছলতা আসা আমাদের খোদার কৃতজ্ঞ বান্দা এবং তার প্রকৃত ইবাদতকারী বান্দায় পরিণত না করে, তাহলে আমাদের এই ঈদ উদযাপন করার কোনো মূল্য নেই। সাহাবিরা এই পৃথিবীতেই থাকতেন, এ সমাজেই ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন, কিন্তু তাদের দৃষ্টিতে আল্লাহ ছিলেন সবার আগে, তাদের আচার-আচরণে খোদাতায়ালাই অগ্রাধিকার পেতেন। তাদের নামাজে, তাদের ইবাদতে বিশেষ পরিস্থিতি বিরাজ করত। পরের উপকারের বিষয়টা তারা প্রথমে মাথায় রাখতেন।

আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম একদিকে যেমন ইসলামী ঐতিহ্যের জয়গান গেয়েছেন, অন্যদিকে মুসলমানদের ভ্রাতৃত্ববোধ বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। আবার ঈদের আনন্দকে সার্বজনীন হিসেবে তুলে ধরার জন্য লিখেছেন বেশ কিছু কবিতা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় তিনি তার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছেন এভাবেÑ‘শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো/কত বালুচরে কত আঁখি ধারা ঝরায়ে গো/বরষের পর আসিলে ঈদ!/ভূখারির দ্বারে সত্তগাত বয়ে রিজওয়ানের/কণ্টকবনে আশ্বাস এনে গুলবাগের.../আজি ইসলামের ডঙ্কা গরজে ভরি জাহান/নাই বড়-ছোট-মানুষ এক সমান/রাজা প্রজা নয় কারো কেহ...’

তিনি ইসলামী সাম্যবাদী চেতনাকে সার্বজনীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তার বিভিন্ন কবিতায়। তার ‘নতুন চাঁদ’ কবিতায়ও বিষয়টি এভাবে ব্যক্ত করেছেনÑসাম্যেও রাহে আল্লাহর/মুয়াজ্জিনেরা ডাকিবে ফের.../রবে না ধর্ম জাতির ভেদ/রবে না আত্ম-কলহ ক্লেদ। এরপর ‘কৃষকের ঈদ’ পঙক্তিতে তিনি লিখেছেনÑজীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসে না নিদ/মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ?’

ঈদকে নিয়ে কবি কায়কোবাদ ‘ঈদ আবাহন’ নামে একটি কবিতায় তার ঈদ অভিব্যক্তি এভাবে তুলে ধরেছেনÑ‘এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান, হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান। এত নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা। এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা।’ ঈদের দিন যেভাবে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে যায়, এক কাতারে সবাই নামাজ আদায় করি, সবার সঙ্গে হাসি মুখে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করি, ঠিক তেমনিভাবে সারা বছর একই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে আর বিভেদের সব দেয়ালকে ভেঙে ফেলতে হবে। কবি গোলাম মোস্তফা কতই চমৎকারভাবে তার এক কবিতায় বিষয়টি এভাবে ফুটিয়ে তুলেছেনÑ‘আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে, আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে, রাখিতে হবে সারা বর্ষে, এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য নিখিল-মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক, অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশীষ স্পর্শে।’ হ্যাঁ, আমরা এমনই কামনা করি, ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে আমাদের মধ্য থেকে সব ধরনের অশুভ দূর হয়ে যাক। সবার মঝেধ্য ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধন রচিত হোক। আমাদের সবার সেøাগান হোক ‘ভালোবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে’। সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা।

"