ঈদের আনন্দে উদ্ভাসিত হোক প্রতিটি হৃদয়

প্রকাশ : ০৪ জুন ২০১৯, ০০:০০

মাহমুদ আহমদ

আল্লাহপাকের খাস রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত লাভের এক মাস সিয়াম সাধনার মধ্য দিয়ে আমাদের মাঝে যে ঈদ আসে, তা হলো ঈদুল ফিতর। একজন রোজাদারের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় হলো খোদাতায়ালার আদেশ অনুযায়ী মাসব্যাপী রোজা রাখতে আল্লাহ তাকে তৌফিক দিয়েছেন। এ খুশি প্রকাশ করতেই রমজান মাস শেষ করে শাওয়াল মাসের ১ তারিখে ঈদের আনন্দে মিলিত হয়। আর এই দিনটির মাধ্যমে আল্লাহপাক মুমিনের জন্য সব বৈধ খাবার ও পানীয় ও কাজকর্ম যা কি না রোজার কারণে বিরত রেখে ছিলেন তার অনুমতি প্রদানের জন্য। কাজী নজরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত গানÑ ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ/ও তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন; আসমানি তাকিদ/তোর সোনাদানা বালাখানা সব রাহেলিল্লাহ/দে জাকাত মুর্দা মুসলিমে আজ ভাঙাইতে নিদ।’ প্রতি বছরই ঈদ আসে, ঈদ যায়। কিন্তু কাজী নজরুলের এ গানটি ছাড়া যেন আমাদের ঈদই জমে না। প্রতি বছরই এ গানটি ঈদের আগের দিন বাঙালি মুসলিমদের অন্তরে জেগে ওঠে। ঈদ কি শুধু আনন্দ আর খুশির নাম? না, বরং ঈদ একটি ইবাদতও বটে।

ঈদ শব্দটি আরবি, এর বাংলা অর্থ খুশি, আনন্দ, আনন্দোৎসব ইত্যাদি। আর ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা, খাওয়া ইত্যাদি। তা হলে ঈদুল ফিতরের অর্থ দাঁড়ায় রোজা শেষ হওয়ার আনন্দ। মুসলিম উম্মাহ বছরে দুটি ঈদ পালন করে থাকে আর তা হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। একটি আসে পবিত্র মাহে রমজানে রোজা পালনের মাধ্যমে আর অপরটি আসে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর মহান কোরবানির স্মৃতিরূপে পশু কোরবানির মাধ্যমে। মুসলিম উম্মাহ ঈদ আল্লাহপাকের শোকরানাস্বরূপ আদায় করে থাকে। একজন আল্লাহপ্রেমিক মাত্রই তার সব আনন্দ খোদার সন্তুষ্টির সঙ্গেই যুক্ত করে। তাই একজন প্রকৃত আল্লাহপ্রেমিক খোদার সন্তুষ্টি লাভের সুযোগ পেলে শোকরানা আদায় করে থাকে আর ঈদ আমাদের সেই শোকরানা আদায়ের সুযোগ করে দেয়। তাই সবাই মিলে শোকরানাস্বরূপ দুমফ রাকাত নামাজের মাধ্যমে ঈদ পালন করে মুসলিম উম্মাহ। মুসলমানের জন্য ঈদ একটি মহা-ইবাদতও। ঈদের ইবাদতে শরিয়ত নির্দেশিত কিছু বিধিবিধান রয়েছে, যা পালনে সামাজিক জীবনে পারস্পরিক আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও বন্ধন সুসংহত হয়। ঈদুল ফিতরের শরিয়তের দিক হলো, ঈদের নামাজের আগে রোজার ফিতরা ও ফিদিয়া আদায় করা, ঈদগাহে দুই রাকাত নামাজ আদায় করা, খুতবা শোনা এবং উচ্চৈঃস্বরে তাকবির পাঠ করা। ঈদে আমাদের দৈহিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধি ঘটে আর পরস্পরের মাঝে ইমানি ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি হয় এবং নিজেদের মাঝে হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে এক স্বর্গীয় পরিবেশ সৃষ্টি হয়। যদি এমনটা হয় তা হলেই আমাদের এ ঈদ পালন ইবাদতে গণ্য হবে।

আল্লাহতায়ালার আদেশে এক মাস রোজা রাখার পর তার আদেশেই আমরা ঈদের আনন্দ উদ্যাপন করি। এক মাস রোজা আমরা আমাদের তাকওয়াকে ও ইমানকে বাড়ানোর জন্য রেখেছি। আমরা রমজানের রোজা এজন্যই রেখেছি, যেন আল্লাহপাকের নৈকট্য অর্জনকারী হতে পারি। এক মাস পূর্ণ হওয়ার পর আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন ঈদ উদযাপন করার।

ঈদ উদযাপনের আগে ঈদের চাঁদ দেখা আবশ্যক। কেননা মুসলমানদের জন্য ঈদের চাঁদ অত্যন্ত আনন্দের মুহূর্ত। কারণ চাঁদের হিসাবেই ঈদ পর্ব শুরু হয়। রমজান মাসের শেষ দিন মুসলমান মাত্রই হোক সে বৃদ্ধ, যুবক কিংবা শিশু, চাঁদ দেখা বা চাঁদের খবর নিতে উৎসুক। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) নিজেও ঈদের চাঁদ দেখার জন্য উৎসুক থাকতেন। তিনি (সা.) চাঁদ দেখা মাত্র এই দোয়া করতেন, ‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল আমনে ওয়াল ইমানে, ওয়াস্ সালামাতে, ওয়াল ইসলামে, রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহু হিলালুর রুশদিউ ওয়া খাইর’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! এই চাঁদকে আমাদের ওপর উদিত কর নিরাপত্তা, ইমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে। (হে চাঁদ) তোমার ও আমার প্রভু একমাত্র আল্লাহ। হে আল্লাহ! এ চাঁদ যেন সঠিকপথের ও কল্যাণের চাঁদ হয়। (ইমাম তিরমিজি)। তাই আমাদের উচিত হবে ঈদের চাঁদ দেখে উক্ত দোয়াটি করা, এই চাঁদ যেন আমাদেরকে আল্লাহপাকের পথে নিয়ে যায়।

ঈদের আগে প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী, শিশু এমনকি সদ্য জন্মলাভকারী শিশুর জন্যও নির্ধারিত ফিতরা আদায় করা জরুরি। ফিতরার টাকা দিয়ে গরিব, অসহায় দুস্থরা অন্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ করে থাকে। যেহেতু ফিতরার টাকা দিয়ে দুস্থ অসহায়গণ ঈদ করে, তাই ঈদের কিছুদিন আগেই এই টাকা আদায় করা সবচেয়ে উত্তম। এ ফিতরা ঈদের নামাজের আগেই আদায় করা উচিত। কেননা গরিব রোজাদার যেন ফিতরার অর্থ দিয়ে ঈদের খুশিতে অংশগ্রহণ করতে পারে। ফিতরা দেওয়া কারো ওপর কোনো প্রকার অনুগ্রহ নয়। এটা আমাদের জন্য ইবাদতের অংশ। এমনকি যে ব্যক্তিকে ফিতরার সাহায্য দেওয়া হয়, তার নিজের পক্ষ থেকেও ফিতরা দেওয়া কর্তব্য। সবার অংশগ্রহণের ফলে সদকাতুল ফিতরের ফান্ডটি একটি সাধারণ ফান্ডে পরিণত হয়। যার ফলে এ থেকে যারা উপকৃত হয় তাদের মনে হীনম্মন্যতার ভাব সৃষ্টি হয় না। মূল বিষয় হলো, ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের গরবি ভাইদের দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে পারি এবং তাদেরকেও ঈদের আনন্দে অন্তর্ভুক্ত করি। যাদেরকে আল্লাহতায়ালা ধন-সম্পদ দিয়েছেন, তারা আল্লাহর রাস্তায় এবং গরিব অসহায়দের প্রতি যতই দান করুক না কেন, এতে কিন্তু তার ধন-সম্পদে কমতি দেখা দেবে না, বরং বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

ঈদের অনুষ্ঠান সাধারণত খোলা আকাশের নিচে অথবা জামে মসজিদে হয়ে থাকে। আমাদের প্রিয় রাসুল (সা.) ঈদগাহে যাওয়ার জন্য ভিন্ন রাস্তা ও ফিরে আসার জন্য ভিন্ন রাস্তা ব্যবহার করতেন, যেন অনেক বেশি লোকের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং যেন তাদের খোঁজখবর নেওয়া যায়। আমরাও এ কাজটি করতে পারি, আর এর ফলে সবাইকে ঈদের আনন্দে শামিল করা যাবে। এ ছাড়া ঈদের দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সম্ভব হলে নতুন পোশাক পরিধান করে ঈদগাহে উপস্থিত হতে হয়।

পবিত্র ঈদ উপলক্ষে ঈদী বা ঈদের উপহার বিতরণ করা মুসলমানদের মধ্যে চালু হয়ে আসছে। ঈদের খুশিতে আত্মীয়-অনাত্মীয় পরস্পরকে তোহফা বিনিময় করে থাকে, এটা একটি ভালো রীতি। এতে আন্তরিকতা সৃষ্টি হয়, ভ্রাতৃত্ব বন্ধন সুদৃঢ় হয়। কাপড়-চোপড়, দ্রব্যাদি, টাকা-পয়সা ঈদের তোহফা হিসেবে বিতরণ করা হয়ে থাকে। অনেকে তৈরি খাবার, মিষ্টি বিতরণ করে থাকে। অনেকে বাড়ি বাড়ি ঘুরে কুশলাদি বিনিময় ও তোহফা বিতরণ করে থাকেন আর এসবের মাঝেই একজন আল্লাহপ্রেমিক খুঁজে পায় তার রবের সাক্ষাৎ।

ঈদের নামাজের মাধ্যমেই ঈদের প্রকৃত আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। ঈদের সব প্রস্তুতি মূলত আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে শোকরানাস্বরূপ দুই রাকাত নামাজ পড়ার মাধ্যমে। সকালের দিকে খোলা মাঠে অথবা মসজিদে এই দুই রাকাত নামাজ আদায় করতে হয়। ঈদের নামাজে আজান ও আকামত নেই। দুই রাকাত নামাজে সর্বমোট ১২টি তাকবির দিতে হয়। প্রথম রাকাতে সুরা-কারাত শুরু করার আগে ৭টি তাকবির অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলতে হয়, তারপর যথারীতি ১ম রাকাত পুরা করে দ্বিতীয় রাকাতের শুরুতে ৫টি তাকবির দিয়ে যথারীতি নামাজ শেষ করে সমসাময়িক বিষয়ের ওপর খুতবা প্রদান করতে হয়। খুতবা শেষ হলে ইজতেমায়ি দোয়া করে সবাই মোলাকাত করতে থাকে। ঈদ আনন্দে সবাই বুকে বুকে মিলে একাকার হয়ে যায়।

ঈদের প্রকৃত তাৎপর্য মহান আল্লাহপাকের কৃতজ্ঞতা আদায় করা। আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি হাসিল করে তারই ইবাদতের মাধ্যমে শোকরানা আদায় করে এটাকে বাস্তবে প্রকাশ করা। তাই এই আনন্দ শুধু খুশি বা মজার জন্য নয়, বরং আপন প্রভুর বান্দা হিসেবে স্থায়ীভাবে ইবাদত প্রতিষ্ঠায় রত থাকা। আমরা যেন ঈদের আনন্দে খোদার সন্তুষ্টিতে সর্বদা জীবনের জন্য স্থায়ী ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে নিই। আমরা যখন যান্ত্রিকভাবে ঈদের উৎসব পালন করি, তখন সবার জন্য আনন্দ এই ভাবনা আমাদের ভেতরে থাকে না। আমরা আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকি। নিকটজনের আনন্দকেই প্রাধান্য দিই এবং এই বাণিজ্যিকায়নকৃত প্রতিযোগী সমাজে কারণে-অকারণে বঞ্চিত হওয়ার বেদনা অনুভব করি। আমরা যদি আমাদের চেয়ে নিচে যাদের অবস্থান, তাদের কথা ভাবতে পারতাম, তাদের কাছে যেতে পারতাম এবং তাদের আনন্দিত করে আনন্দ উপভোগের চেতনা সৃষ্টি করতে পারতাম, তা হলে ঈদের আনন্দ এক ভিন্নমাত্রা পেতে পারত।

আসুন, ঈদের উৎসবকে রঙিন করতে গরিব ও অসহায়দের দিকে সাম্যের হাত বাড়িয়ে দিই। খোঁজ নিই আমার, আপনার, সবার পাড়া প্রতিবেশীর। গরিব অসহায়দের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। যারা বয়স্ক, বয়সের ভাড়ে ন্যুজ; তাদের দিকে ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকাই। এদের কারো প্রতি কোনো করুণা নয়। বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই এগিয়ে যাই। নিজেদের ঈদের কেনাকাটার কিছু অংশ তাদেরকেও দেই।

আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, ঈদ উৎসব অন্য ১০টি উৎসবের মতো নয়, এটি ইবাদতকেন্দ্রিক উৎসব। তাই উৎসবের নামে বাড়াবাড়ি পরিহার করার সর্বাত্মক চেষ্টা করাও সবার কর্তব্য। বাংলাদেশের গরিষ্ঠ মানুষের বসবাস গ্রামে। শহরকেন্দ্রিক মানুষগুলো এখনো ছুটে যায় গ্রামে, স্বজন প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার এই রেওয়াজ যথেষ্ট ইতিবাচক। নাড়ির টানে ছুটে চলা মানুষগুলো এখনো মা-বাবার সান্নিধ্য নেওয়ার গরজ বোধ করেন। এটি আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য লালনের মাধ্যমে আমাদের পারিবারিক বন্ধন শুধু দৃঢ় হয় না, পরিবারপ্রথা বিলুপ্তির মোকাবিলায়ও এর অঘোষিত প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা জোরদার হতে থাকে। হ্যাঁ, আমরা এমনই কামনা করি, ঈদ উদ্যাপনের মাধ্যমে আমাদের মাঝে যেন ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হোক। আমাদের সবার সেøাগান হোক ‘ভালোবাসা সবার তরে, ঘৃণা নয় কারো পরে’। সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা ও ঈদ মোবারক।

"