মতামত

ক্রিকেট ও একজন লোটাস কামাল

প্রকাশ : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:০০ | আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০১৭, ০০:৫৬

মুহাম্মদ কামাল হোসেন

আমাদের সমাজে নামের সঙ্গে মিল থাকলেই বলা হয় ‘মিতা’। সুতরাং তার নামের সঙ্গে নিজের নামের একটা আক্ষরিক ও সাদৃশ্যগত মিল রয়েছে। সেই হিসেবে তিনি আমারও মিতা। কিন্তু শুধু এই কারণে যে তাকে আমার ভালো লেগেছে, বিষয়টি আসলে সে রকম কিছু নয়। তিনি সত্যিকারার্থে একজন ভালো মানুষ। সুতরাং মিতা হওয়ার কারণ ছাড়াও তাকে আমার এমনিতেই ভালো লাগে। প্রকৃতপক্ষে তাকে একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক হিসেবেই আমার সব ইন্দ্রীয় বরাবরই একবাক্যে সাক্ষ্য দেয়। তিনি বাংলাদেশ সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। আ.হ.ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামাল। লোটাস শব্দের অর্থ-পদ্ম। এটা যখন থেকে বুঝতে শিখেছি, তখন থেকে তাকে আমি দেখে আসছি। বলা যায়, দেখে অভ্যস্ত। যদিও ব্যক্তিগতভাবে তার সঙ্গে আমার কখনো ‘ওয়ান টু ওয়ান’ সাক্ষাৎ মেলেনি। কিন্তু দূর থেকেই এই প্রিয় মানুষটিকে আমি বেশ কয়েকবার দেখার সুযোগ পেয়েছি। নিবিষ্ট হৃদয়ে শ্রবণ করেছি তার মুখ নিঃসৃত প্রতিটি বাণী। একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিক হলেও তিনি রাজনীতির সীমারেখা পেরিয়েও কখনো কখনো পরকালীন অনেক বিষয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বয়ান রেখেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও দর্শনের পাশাপাশি তার ধর্মীয় জ্ঞানের প্রখরতাও ছিল উল্লেখ করার মতো। বিশেষত, তার প্রতি আমার মুগ্ধতা বহুলাংশে বেড়ে যায় ২০১৫ বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালীন। ভারতীয় এন শ্রীনিবাসনের মতো ধূর্ত ও ইঁদুর প্রকৃতির দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে তিনি যেভাবে মুখের ওপর শায়েস্তা করেছেন, তা এক কথায় ছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। নৈতিকতার মারাত্মক স্খলনে জর্জরিত ও সীমাহীন স্বেচ্ছারিতার পরাকাষ্ঠা দেখানো ধুরন্ধর ব্যক্তি এন শ্রীনিবাসন। নিজ দেশেই মানুষটি চরম বিতর্কিত ও ধিক্কৃত ব্যক্তি। তার মতো ব্যক্তিকে সমুচিত জবাব দিতে হলে একটা জুতসই মঞ্চের প্রয়োজন ছিল। সমগ্র বিশ্বের কোটি কোটি ক্রিকেটানুরাগী, ভক্ত, সমর্থক, কলাকুশলী ও বিশ্লেষক দেখেছেন বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে একজন বীর বাঙালি কীভাবে আইসিসির সভাপতি থেকে পদত্যাগ করতে পারেন। বাঙালি এমন একটি জাতি, যে জাতির জন্ম বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে। প্রতিটি বাঙালি জন্ম থেকে বিপ্লবের সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। আর সেজন্যই মুখবুজে সহ্য করার স্বভাব বাঙালির নেই। বাঙালি এমন একটি জাতি, মায়ের মুখের ভাষায় কথা বলার অধিকারটুকুও যাদের সংগ্রাম করে আদায় করতে হয়েছে, রক্ত ঝরিয়ে আদায় করতে হয়েছে। বাঙালি জাতির স্বাধীনতা, বাংলাদেশ নামক ছোট্ট সবুজ দেশটি মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জন করে নেওয়া, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের দামে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের দামে কেনা। সেজন্যই তো বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে এন শ্রীনিবাসনের মতো ব্যক্তির তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের সমুচিত জবাব লোটাস কামাল সগর্বে দিয়েছিলেন। সে দিনের গর্বে আমার বুক মুহূর্তে অনেকটা চওড়া হয়ে গিয়েছিল। আনন্দে বাসায় বিরানি উৎসব করেছি, মুহুর্মুহু কবি সুকান্তের ছত্র দুটি মনে মনে আউড়িয়েছি- ‘সাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে-পুড়ে-মরে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’

আ.হ.ম মুস্তফা কামাল ওরফে লোটাস কামালের হাত ধরেই এ দেশের ক্রিকেটের জয়যাত্রা শুরু হয়। মূলত ক্রিকেটের উন্নতির গ্রাফটা ওপরের দিকে উঠতে থাকে বিসিবির সভাপতি হিসেবে তার দায়িত্ব ভার নেওয়ার পর থেকে। বিসিবির সভাপতি থাকাকালীন তিনি ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির সহ-সভাপতি ও পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আইসিসি সভায় দাঁড়িয়ে দেশের ক্রিকেটকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি রাজনীতিক ছাড়াও একজন শিক্ষানুরাগী ও দক্ষ সংগঠক। দীর্ঘদিন পর্যন্ত দেশের জনপ্রিয় ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী লিমিটেডের সভাপতি হিসেবে গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিকেটকে আরো ব্যাপকতর ছড়িয়ে দিতে বিপিএলে দল কিনেছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস নামে। বর্তমানে তার ছোট কন্যা নাফিসা কামাল দলটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

লোটাস কামাল একজন ক্রীড়া অন্তঃপ্রাণ ব্যক্তিত্ব। ক্রিকেট ছাড়াও ফুটবলসহ অপরাপর খেলাগুলো নিয়ে তিনি বরাবরই স্বপ্ন দেখেন। ঢাকার ক্রিকেটকে শুধু ঢাকার ভেতরই সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং ক্রিকেটকে সারা দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে দেওয়ার পক্ষে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। মাঠকে তিনি কতটা ভালোবাসেন তার নজির মেলে শত ব্যস্ততার পরও যখন দেখি ক্রিকেট মাঠে তার সরব উপস্থিতি। বর্তমানে তিনি বিপিএলের জনপ্রিয় দল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের কর্ণধার। তার দলটি অভিষেক বর্ষেই বাজিমাত করে তাক লাগিয়ে দেয়। চ্যাম্পিয়ন হয়ে সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন বিপিএলের ঘোড়ার রেসে তিনি টিকে থাকতেই এসেছেন। খেলা চলাকালীন তার কন্যার মাঠে সরব উপস্থিতি বিপিএলে এক ভিন্নমাত্রা সৃষ্টি করে। সঙ্গত কারণে বিপিএলে অল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাওয়া দলটির নাম হচ্ছে-কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস। বছর ঘুরতে না ঘুরতে আবারও বিপিএল দরজায় কড়া নাড়ছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ রঙিন আসর হচ্ছে বাংলাদেশ প্রিমিয়াম লিগ (বিপিএল)। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি ক্রিকেট অনুরাগী প্রতিবছর এই আসরটিকে পাখির চোখ করে রাখে। দেশি-বিদেশি ডাকসাইটে  ক্রিকেট তারকাদের মিলনমেলা এই আসর। নাচ-গান ও ধুমধামাক্কা চার-ছক্কা ছাড়াও স্নায়ু টানটান ক্রিকেটীয় উত্তেজনা খেলার প্রতিটি পরতে পরতে লেগেই থাকে। বিপিএল এ দেশের ক্রিকেটের লাইভ লাইন। এই মঞ্চ থেকেই আগামী দিনের নতুন নতুন তারকা ক্রিকেটার বের হয়ে আসে। তারা দেশের হয়ে আরো উচ্চতর বড় মঞ্চে দাপিয়ে বেড়ায়। তাদের ঘিরে ক্রমশ আমাদের প্রত্যাশার পারদ চড়তে থাকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ভালো খেলা উপহার দিলে যেমন সবার মন ভালো থাকে, তেমনি খারাপ খেললেও হৃদয় ব্যথিত হয় দেশের সবার। সাম্প্রতিক দক্ষিণ আফ্রিকায় চলমান সিরিজে বাংলাদেশ ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। স্মরণ রাখতে হবে, এই দক্ষিণ আফ্রিকাও আমাদের দেশে এসে সিরিজ খুইয়ে যায়। আজ অস্ট্রেলিয়াও ভারতে এসে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে যাচ্ছে। দেশের বাইরে খেলাটা সব দলের জন্যই সবসময় এক কঠিন পরীক্ষা। তাই এই দুঃসময়ে দলকে আরো বেশি বেশি সাপোর্ট করা উচিত। সব সিরিজ যে আমরা জিতব এমন কোনো কথা নেই। ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে সফলতার সোপান খুঁজে নিতে হবে। পেছনে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

লোটাস কামালদের দেখানো পথ ধরেই বর্তমান ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উচিত এ দেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। প্রয়োজনে তার সুদীর্ঘ কালের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা আবার কাজে লাগাতে হবে। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা দেশের ক্রিকেট নিয়ে তাদের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খবরাখবর নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ক্রিকেট বড়লোকের খেলা কিংবা ভদ্রলোকের খেলা। এটা একটা ট্র্যাডিশনাল বচন হয়ে গেছে। মাড়োয়ারি জগমোহন ডালমিয়ার সূচনা করা সেই চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সূত্রপাত এই ঢাকার মাটিতেই। মূলত তখন থেকেই ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণের ধুন্ধুমার সব আয়োজন ভদ্রলোকের এই খেলাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে। ছোট্ট ভূখন্ডের দেশেও আজ ক্রিকেট রোগে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষ। আজ হাজার কোটি টাকা আয় হচ্ছে ক্রিকেট থেকে। এসব টাকা ক্রিকেটপাগল মানুষের ঘামার্জিত। তারা ক্রিকেটের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভেজে। এসব ক্রিকেটীয় আবেগ স্বমহিমায় সাধারণ মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে। আর ক্রিকেট নিয়ে লোটাস কামাল সাহেবদের স্বপ্নের সার্থকতা এখানেই নিহিত।

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট