জন্মাষ্টমী

মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়

কৃষ্ণ চরিত্র মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়। অখ- ধর্মীয় ভারতের রূপকার কৃষ্ণ। অন্তত সাড়ে তিন হাজার বছর আগে ভারত সভ্যতার যিনি বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। জীবনব্যাপী সাধনার দ্বারা কৃষ্ণ ভারতীয় সভ্যতার শুধু জন্মই দেননি তার ভালে যৌবনের জয়টিকাও পরিয়ে দিয়েছেন। আজ তার জন্মোৎসব। কৃষ্ণের জন্মজয়ন্তীকে বলে জন্মাষ্টমী।

শ্রী কৃষ্ণের জন্ম ও কর্ম অভিনব ও অসাধারণ। ভাদরের আদরে কৃষ্ণের জন্ম হলেও সে রাতটি ছিল ভয়াবহ-ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ বিদ্যুৎচমকিত। কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল কংসের কারাকক্ষে। সংসারে ও সমাজে একটি সন্তানের জন্ম হলে সেটি উৎসবে পরিণত হয়। চারদিকে ললনাগণের উলুধ্বনি ও মঙ্গলপক্ষ বাজতে থাকে। কৃষ্ণের জন্ম সময়ে কোনো উলুধ্বনি হয়নি, কোনো মঙ্গলশঙ্খ বাজেনি। বেজেছিল। বৃষ্টি উলুধ্বনি দিয়েছিল। আর বিদ্যুৎ বাজিয়েছিল মঙ্গলশঙ্খ।

বাল্যকালেও কৃষ্ণের জীবনে জীবনঘাতী ঘটনা ঘটেছে। কংসবধ থেকে বুরুক্ষেত্র পর্যন্ত কৃষ্ণের জীবনে নেমেছে কঠিন ঝড়। বীরত্ব বিশেষত তীক্ষè বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কৃষ্ণ এসব ক্ষেত্রে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন বিশেষত কুরুক্ষেত্রের বিজয় কৃষ্ণকে ভারতের অদ্বিতীয় ভাবমূর্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছে। কংসের কারাকক্ষে জন্ম হলো কৃষ্ণের। প্রকৃতি অস্বাভাবিক। ঝড়-বৃষ্টি বিদ্যুৎপাত। পূর্ব প্রতিশ্রুতি মোতাবেক বসুদেব সদ্যজাত শিশুকে নিয়ে চললেন কংসের আগারে। দৈবকী বললেন হে আর্য, প্রতিশ্রুতি মোতাবেক তুমি (বসুদেব) সাতটি সন্তানকে কংসের হাতে তুলে দিয়ে সত্য ধর্ম রক্ষা করেছ কিন্তু একটি ধর্ম রক্ষা হয়নি। সেটি পিতৃধর্ম। সন্তানকে সর্বতোভাবে রক্ষা করাই পিতৃধর্ম তুমি অনেকবার কংসের হাতে সন্তানকে তুলে দিয়ে সত্য ধর্ম পালন করেছ কিন্তু একটি সনির্বদ্ধ প্রার্থনা তুমি এই সন্তানটিকে কংসের হাত থেকে রক্ষা করে অন্তত একটিবারের জন্য পিতৃধর্ম রক্ষা কর। প্রিয়তমা স্ত্রী দৈবকীর কাতর প্রার্থনায় বসুদেবের চিন্তায় মোড় খেল, সত্যিই তো, আমি একটি সন্তানকেও যমের করালগ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারলাম না। এটি কি পিতার কর্তব্য। হ্যাঁ দৈবকীর কথাই ঠিক। এই সন্তানটিকে নিষ্ঠুর যম কংসের হাত থেকে রক্ষা করে অন্তত একবার পিতৃধর্মকে রক্ষা করি। বসুদেব মুখ ফেরালেন। কংসের গৃহাভিমুখ থেকে গোকুলের দিকে। গোকুলে রয়েছে বসুদেবের কাকাতো ভাই নন্দ। নন্দ বসুদেবের ভাই। তা ছাড়াও পূর্বপরীক্ষিত। বসুদেবের প্রথমা স্ত্রী রোহিনী পুত্র বলরামকে নিয়ে নন্দের আশ্রয়েই তো আছে। অতএব কাল বিলম্ব না করে বসুদেব পুত্রকে নিয়ে নন্দের গোকুলেই রওনা হলো। ওদিকে গোকুলে নন্দের স্ত্রী যশোদা একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেছে। বসুদেব নন্দের সহায়তায় নিজ পুত্রকে যশোদার কাছে রেখে যশোদার কন্যাটিকে নিয়ে মথুরার দিকে যাত্রা করলেন। তখনো প্রকৃতি অশান্ত। ভোর হয়নি, পাখি ডাকেনি। কংস কন্যাটিকে পেয়ে দুহাত ধরে পাষাণে আছাড় মারলেন। কন্যাটি কিন্তু কংসের হাত থেকে পিছলে আকাশের দিকে উঠে গেল। যাবার সময় বলে গেল, ‘আমারে মারিলি তুই, তোরে মারিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে।’

কংস প্রশ্ন করলেন গোকুলে কে বাড়ছে, তাকে নিধন করার জন্য? খোঁজ খোঁজ তাকে হত্যা করতে হবে। চারদিকে কংসের সেনারা বেরিয়ে পড়ল। কংসের মন্ত্রক নারদ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মথুরার চারদিকে বিশেষত গোকুলে কঠিন তল্লাশি চলতে লাগল। কৃষ্ণকে খুঁজতে গিয়ে হাজার হাজার শিশুকে হত্যা করল কংসের সৈন্যরা। কৃষ্ণকে নিয়ে নন্দ পালিয়ে গেলেন বৃন্দাবনের মাঠে। রাজধানীর সন্তান রাজার সন্তানকে বনবাসে বাস করতে হলো। কৃষ্ণ নিজের গুণে বনবাসকে নিজবাস করে নিল। কৃষ্ণের কত বন্ধু, কত শখা, কত খেলার সাথী। প্রতিদিন নতুন নতুন খেলা খেলে গোধন চড়িয়ে কৃষ্ণের সময় কাটে। গোকুলে একটি বার্ষিক প্রথা ছিল। ইন্দ্রপূজা। পহেলা বৈশাখে এই পূজাটি হতো। ইন্দ্রপূজা হলে বৃষ্টি নামত। কৃষ্ণ এই পুজোর পরিবর্তন করেন। কৃষ্ণ বোঝালেন যারা কৃষক তাদের গ্রীষ্ম ঋতুতে বৃষ্টি প্রয়োজন আছে। বৃষ্টি নামলে মাটি নরম হয়। কৃষকের চাষ ও বীজ বপনের সুবিধা হয়। কিন্তু গোপিদের পেশা কৃষিকাজ নয়। অতএব তাদের সঙ্গে বৃষ্টির সম্পর্ক নেই। গোপিদের মূলধন, ঘি, ঘোল বিক্রয় করে গোপদের জীবন চলে। অতএব গোপিদের যদি কোনো পূজা করতে হয় তাহলে গরুপূজা করাই উচিত। অতএব কৃষ্ণ গোপিদেবকে ইন্দ্রপূজার পরিবর্তে গোপূজা করতে বলেন। প্রচলন হলো দেব পূজার পরিবর্তে জীবিকা পূজা। জীবিকা জীবন ও জাতিকে রক্ষা করেন। অতএব জীবন ও জাতিকে রক্ষা করার স্বার্থেই জীবিকাকে অধীর করতে হবে-ভালোবাসতে হবে পূজা করতে হবে। পূজা না পেয়ে ইন্দ্র খেপে গেলে সে অনর্গল বৃষ্টি আরম্ভ করল। লক্ষ্য গোপিদের ভাসিয়ে দেবে। কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত ধারণ করে গোকুলকে রক্ষা করলেন।

কৃষ্ণ গোকুল ত্যাগ করে বৃন্দাবনে এলেন। আসলে গোকুলের গোপিরা উন্নত পরিবেশের কারণে জনপদের স্থানান্তর করেননি। উন্নত পরিবেশের জন্য নিরাপত্তার কারণে কৃষ্ণ আরেকবার সভ্যতার স্থানান্তর করেছিলেন মথুরা থেকে দ্বারকায়। কংসবধের পর কংসের শ্বশুর মধুরা আক্রমণ করেছিল। একবার নয় দুবার নয় আঠারোবার অতএব নিরাপত্তার কারণে কৃষ্ণ মথুরা সভ্যতাকে দ্বারকায় স্থানান্তর করে। অতএব সভ্যতার বিকাশ সাধনে ও নিরাপত্তার কারণে স্থানান্তরের দৃষ্টান্ত কৃষ্ণ স্থাপন করেছেন কৃষ্ণের বৃন্দাবন অংশের শেষ লীলা বয়স। পুষ্প-গন্ধ ব্যাকুল জ্যোৎস্না রাতে যমুনার তীরে কৃষ্ণ বাঁশি বাজাতে আরম্ভ করলেন। সেই বংশী ধ্বনি জগৎকে মোহিত করল-মাতাল করল গোপ নারীদের। জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্যেও রাসের বর্ণনা অপরূপ। তবে ভাগবতের সঙ্গে গীত গোবিন্দের সময় গত পার্থক্য লক্ষণীয়। কৃষ্ণের বাঁশির আকর্ষণে গোপ-গোপিগণ যমুনা তীরে পৌঁছালে কৃষ্ণ গোপিদের ভর্ৎসনা করেছেন নারীগণ স্বামী সংসারের কাজ ফেলে রাতে যমুনা তীরে আসাটা অনুচিত বলে কৃষ্ণ মনে করেছেন। শেষে কৃষ্ণ গোপীগণের সঙ্গে মিশেছেন-উল্লাস করেছেন। রাসের মাধ্যমে কৃষ্ণ রসও রসময়ের সেতুবন্ধ ঘটিয়েছেন।

লেখক : প্রধান সম্পাদক, দৈনিক গড়ব বাংলাদেশ

"