স্মরণ

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি

প্রকাশ : ১৪ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

মো. কায়ছার আলী

আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে একটা গল্প প্রচলিত আছে। এক বিশাল দ্বীপকে নিয়ে গল্পটি। এই দ্বীপে প্রায় পাঁচ লাখ লোকের বাস। দ্বীপটির নিরাপত্তা ঝুঁকি প্রকট। দ্বীপবাসীরা দেখল উজ্জ্বল এক আলোকবর্তিকা ধীরে ধীরে আকাশ থেকে নেমে আসছে। তারা একে অনুসরণ করল এবং একটি বড় ফাঁকা মাঠে এসে তা থামল। গ্রামবাসীরা দেখল, সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক দেবদূত। চারপাশে হাজার হাজার মানুষ এসে জমা হলো। তারা দেবদূতের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে দেবদূত বললেন, ‘তোমাদের এত লোকের সঙ্গে তো আমার কথা বলা সম্ভব নয়, বরং তোমরা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দাও, আমি তাদেরকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করব এবং কথা বলব।’ তারা তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন করে দিল। একজন বৃদ্ধ শতায়ু, আরেকজন আধুনিক ফিটফাট কেতাদুরস্ত, অন্যজন সাদাসিধা বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেই মনে হয়। প্রথমে বৃদ্ধ এলেন। দেবদূত কুশল বিনিময়ের পর জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এখন থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা পর তোমাদের এই দ্বীপে জলোচ্ছ্বাস হবে। বাড়িঘর, সহায় সম্পদসহ তোমাদের সবাইকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি এখন কী করবে?’ বৃদ্ধ বললেন, ‘আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি, এখন বয়স হয়েছে আর বেশিদিন বাঁচব না এই সময়ে কান্নাকাটি করে বিধাতার দরবারে মাফ চেয়ে নেব। যাতে পরকালে আমার ভালো হয়।’ দ্বিতীয় ব্যক্তি একই প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘জীবনে আমি অনেক কিছুই ভোগ করেছি এখন যতটুকু সময় অবসর আছে ভোগবাদের চূড়ায় ওঠার চেষ্টা করব। মৃত্যুর পর কি পাব না পাব তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই।’ এবার তৃতীয় ব্যক্তি একই প্রশ্নের উত্তরে চিন্তা করে বললেন, (৪৮ ঘণ্টাকে মনে মনে মিনিট ও সেকেন্ড হিসাব করে নিলেন) ‘এখনো ১ লক্ষ ৭২ হাজার ৮০০ সেকেন্ড সময় আছে আমি আমার দ্বীপের ৫ লাখ লোককে সংগঠিত করে তাদের ১০ লাখ হাতকে কাজে লাগাব এবং জলোচ্ছ্বাস আসার আগেই দ্বীপের চারদিকে এমন বাঁধ নির্মাণ করব যাতে জলোচ্ছ্বাসের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে না পারে এবং একটি লোকেরও যেন জানমালের ক্ষতি না হয়।’ দেবদূত তার কথা শুনে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং তাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘আমি তোমার সাথে আছি।’

ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতাবিরোধীদের যে জলোচ্ছ্বাস তার মোকাবিলার জন্য বাঁধ তৈরিতে উদ্বুদ্ধ ও কাজে লাগনো হচ্ছে নেতা বা রাজনীতিকের কাজ। আপামর জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করাই নেতার সাফল্য। এমন মহান নেতাকে আমরা চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি। টুঙ্গিপাড়ায় চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে থাকা বঙ্গবন্ধু আর কোনদিন কথা বলবেন না, আর কখনো তার কণ্ঠে উচ্চারিত হবে না দুখিনী বাংলা মায়ের দাবি আদায়ের কথা। যার বুক জুড়েই ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র, যার অপেক্ষায় ছিল ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ভোরের সূর্য, প্রতীক্ষায় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকরা। ঘৃণ্য ঘাতকের একঝাঁক বুলেট চিরদিনের জন্য স্তব্ধ করে দিল এক মহান রাষ্ট্রনায়ককে।

জাতির পক্ষ থেকে দেওয়া এক অমোচনীয় কালিমা-যা কখনো অপসৃত হওয়ার নয়। দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের। এই মাতৃভূমিকে যিনি ধ্যানে, প্রাণে তার প্রথম ও শেষ পবিত্র ভূমি বলে নির্ধারণ করেন। জীবনে ও মরণে বাংলাদেশকেই যিনি বেছে নিয়েছিলেন একমাত্র আশ্রয়স্থল হিসেবে। এই মৃত্তিকা পবিত্র থেকে পবিত্রতর হয়েছে তারই বুকের তাজা রক্তে। অবিনাশী আপন কীর্তিসমূহ পেছনে ফেলে তার জীবনরথ দিগন্তে পৌঁছে গেলে এখানে রচিত হয়েছে তার অন্তিম শয়ান। হৃদয়বিদারক মমস্পর্শী ঘটনা চিরদিনই মনে থাকে। একটি আত্মাহুতি একটি জনপদকে আলোড়িত করতে পারে, একটি দুর্ঘটনা (সড়ক, নৌ, বিমান, ট্রেন) মানুষের অনুভূতিতে কয়েক দিনের জন্য ব্যথা বা ক্ষতের সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক, সরকার প্রধান, অবিসংবাদিত, ক্যারিসম্যাটিক বা সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন নেতার হত্যাকা- অথবা শাহাদাতবরণ প্রজন্মের পর প্রজন্ম, যুগের পর যুগ একটি দেশ, জাতি ও রাষ্ট্রকে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার আভায় উদ্ভাসিত বাংলার আকাশে চিরভাস্বর প্রতিভাধরের নাম বঙ্গবন্ধু। যিনি বাঙালির হাজার বছরের চিরন্তন সংগ্রামের ইতিহাসে এক বিশাল অধ্যায়ের শিরোনাম। এই দেশ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শাসনামলে অনেক রাজধানী ছিল। কিন্তু ঢাকাকে রাজধানী করে এই ভূখ-ে স্বাধীন প্রথম মুসলিম বাঙালি শাসক শেখ মুুজিবুর রহমান। দেশি এবং বিদেশি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যার রয়েছে সংগ্রামের বর্ণাঢ্য ইতিহাস।

যখন কোনো সমাজে বা যেকোনো দেশে নানাবিধ কারণে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গভীর সঙ্কট দেখা দেয় তখন ক্যারিসমা সুলভ নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটে। এই নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী চেতনা এনে দেয়- যা স্বাধীনতা সংগ্রাম গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন, অদম্য সাহস ও অকুণ্ঠ আত্মত্যাগের ইতিহাস নিয়ে দেশে-বিদেশে সর্বত্র গবেষণা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৬ মার্চ ২০০৪ থেকে প্রচারিত বিবিসি বাংলা সার্ভিসের শ্রোতা জরিপে নির্বাচিত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ বাঙালির তালিকায় প্রথম স্থান লাভ করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৪ এপ্রিল ২০০৪ ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ হিসেবে তার নাম প্রকাশ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ৫৫ বছরের জীবনে ১২ বছরের অধিক কেটেছে কারাগারে, জীবনের অর্ধেক কেটেছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে, পুরো জীবন গেছে স্বাধীনতা নির্মাণে। বাংলাদেশের নামকরণ, ছাত্রনেতা হিসেবে কৃতিত্ব, প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রিত্ব লাভ, আওয়ামী লীগের জন্ম থেকে সম্পৃক্ততা, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান নেতা, ছয় দফা দাবি পেশ, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু উপাধি, ’৭০-এর নির্বাচন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, অসহযোগ আন্দোলন, স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান, মৃত্যুমুখে জেলখানায় বন্দি জীবন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ, জাতির জনক উপাধির ইতিহাসগুলো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু আমরা কি জানি Inclusive democrac-এর কথা। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজন যদিও হয় তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের নামে অনেক ভালো চিন্তা ও উদ্যোগ বাতিল হয়ে যায়। শুভ কাজ সংখ্যাগরিষ্ঠের চাপে পিষ্ঠ হয়। Inclusive democrac হলো ভালো পরামর্শ ও প্রস্তাব যদি একজনও হয় তাকে মূল্যায়ন করা উচিত। যে মহান মানুষটি কমপক্ষে একজন লোকের মতামত এবং সর্বোচ্চ লোকের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন অর্থাৎ আপামর জনগণকে জীবন দিয়ে কী রকম ভালোবাসতেন তার একটি কথা না লিখে পারছি না। বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন “Mr. Prime minister what is your qualification?” উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, love my people. এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, “What is your disqualification?” চোখ মুছতে মুছতে প্রতিভাদীপ্ত কণ্ঠে বলেন, “I love them too much.” অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয়, সর্বনাশা কালরাতের (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট) দৃশ্যপট মানসচক্ষে একবার ভেসে উঠলেই শিহরিত হতে হয়। বঙ্গবন্ধুর রক্তমাখা নিথর দেহের সঙ্গে আরো ছিল বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ

কামাল, তার স্ত্রী সুলতানা কামাল, অপর পুত্র শেখ জামাল

ও তার স্ত্রী রোজী জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল, ভাই শেখ নাসের ও কর্নেল জামিলের মৃতদেহ। অন্য বাড়িতে শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, আবদুর রব

সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত, শিশু বাবু, আরিফ, রিন্টু খানসহ অনেকের লাশ।

বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনাই সময়ের বাঁকে বাঁকে এক দিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু হারাবে না হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তেজদীপ্ত ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ। ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

kaisardinajpur@yahoo.com

"