নিবন্ধ

অর্থ-ব্যবস্থায় ইসলাম

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

আহমদ আবদুল্লাহ

ইসলাম মূলত একজন আদর্শ মানুষ গঠনের একটি আদর্শ প্রক্রিয়া। জন্মলগ্ন থেকেই মানুষের জৈবিক এবং আর্থিক চাহিদা দেখা দেয়। এই চাহিদা পূরণে মানুষ নানা উপায় অবলম্বন করে থাকে। কিন্তু সেসব উপায় বা পন্থার সঠিকতাও নির্ধারণ করে দেয় ইসলামী ব্যবস্থা। ইসলাম সম্পদ উৎপাদন, উপার্জন এবং ব্যয়ের বৈধ-অবৈধ পন্থাগুলো সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে-যাতে মানবজাতি চলার পথে কোনোভাবেই বিভ্রান্ত না হয়। ইসলাম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামে অর্থ-ব্যবস্থা এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে, কিয়ামত পর্যন্ত আর কোনো নতুন অর্থ ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে না। শুধু যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে ইসলামের মৌলিক বিষয়াবলির সঠিক ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ তুলে ধরতে হবে।

মানুষের বহুবিদ চাহিদার ভেতর অর্থনৈতিক চাহিদা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ এবং তার অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্ম। সমাজের কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী কোনোভাবেই যাতে অধিকতর সুবিধাভোগী হতে না পারে এবং অন্য একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বঞ্চিত হতে না হয় সেজন্য ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা প্রদান করেছে। ইসলাম অর্থ উপার্জন এবং ব্যয়ের ক্ষেত্রে এমন সুন্দর উপায় বলে দিয়েছে, যেখানে একজন মানুষ অতি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে বৈধভাবে সম্পদ আহরণ ও অর্জন করতে পারে। ইসলামের এই নীতিমালার লঙ্ঘন শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে উল্লেখের দাবি রাখে যে, ইসলামের অর্থ ব্যবস্থার ন্যায়ভিত্তিক বাস্তবায়নের সফলতা নিরঙ্কুশভাবে নির্ভর করে। সমাজে এর অন্যান্য বিধিমালার সঠিক এবং যথার্থ প্রয়োগের ওপর একটি ইসলামী সমাজব্যবস্থার ধারণা মোটামুটিভাবে নির্ভর কতগুলো মৌলিক নীতির ওপর। যেমন-১. সর্বশক্তিমান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। ২. ইতিহাসের কুরআনিক ধারণা। ৩. উৎপাদন উপকরণের ধারণা। ৪. সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণা। ৫. সহ-অবস্থানের স্থায়ী নীতিমালা।

পবিত্র কুরআনের ভাষ্য ‘আসমান ও জমিনের মাঝে যা কিছু রয়েছে, তার সার্বভৌমত্ব আল্লাহর।’ (সুরা মায়িদা : ১৭)। অতএব দুনিয়ার যেখানে যে সম্পদ আছে তার ¯্রষ্টা যেমন আল্লাহ, তেমনি তার চূড়ান্ত মালিকও তিনি। তবে মানুষ আল্লাহর মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে সাময়িকভাবে সম্পদ ভোগ করতে পারবে মাত্র। পুরোপুরি মালিক হিসেবে নয়। এই আয়াতে এও বোঝা যায় যে, ভূমি, পানি, বাতাস ও আগুন ইত্যাদিসহ যেখানে যে সম্পদ রয়েছে এগুলো বিনামূল্যে আল্লাহ প্রদত্ত। মানুষ শুধু ইসলামী বিধানানুযায়ী প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণের জন্য বিধিবদ্ধভাবে ভোগযোগ্য পণ্য ও সেবা উৎপাদন, আহরণ ও ভোগ করবে। আর তাতে অপচয় করা যাবে না। ইসলাম কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সমাজের বৃহত্তর স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কিংবা সমাজের ক্ষতিকর কাজে সম্পদ ব্যবহার করে ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার সুযোগ রাখেনি। সম্পদ উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলাম যেসব নীতিমালা নির্ধারণ করে দেয়, তা হলো : ১. সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করা, যেন কারো কোনো স্বার্থ ক্ষ্ণুœ না হয়। ২. জাকাত প্রদান করা। ৩. আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা। ৪. সুদ ও সুদের লেনদেন বন্ধ করা। ৫. ব্যবসায়ে সব ধরনের এবং প্রকৃতির প্রতারণা পরিহার করা। ৬. অপ্রয়োজনীয় সম্পদের মজুদ গড়ে না তোলা। ৭. হারাম বস্তু উৎপাদন, বাজারজাতকরণসহ এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কর্মতৎপরতা থেকে বিরত থাকা। ৮. মুনাফাখোরী ব্যবসা বা লেনদেন হতে বিরত থাকা। ৯. সমাজে বৈধ সম্পদের অব্যাহত সঞ্চালন নিশ্চিত করা, যাতে সহজেই ভোক্তার কাছে সম্পদ পৌঁছানো নিশ্চিত হয়। ১০. এ ছাড়া ইসলাম সম্পদ বিকেন্দ্রীকরণের একটি বিশেষ পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে দিয়েছে। মৃত ব্যক্তির সম্পদ আত্মীয়দের মাঝে বণ্টন করে দেওয়া। তবে তার কোনো আত্মীয় না থাকলে সে সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া।

আমরা জানি, আমাদের সমাজসহ পৃথিবীর সব সমাজেই বৈধ-অবৈধ উপায়ে সম্পদ আহরণ ও ব্যয়ের প্রবণতা রয়েছে। কিন্তু ইসলাম তার অনুসারীদের অবৈধ পন্থায় সম্পদ উৎপাদন, উপার্জন যেমন অনুমোদন দেয় না, তেমনিভাবে অবৈধ উপায়ে সম্পদ ভোগ-বণ্টনের অনুমতি দেয় না। ইসলাম উপার্জনের ক্ষেত্রে সামাজিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতেই বৈধতা ও অবৈধতা পার্থক্য সৃষ্টি করে দিয়েছে। এমনকি বৈধ উপায়ে যেসব ধন-সম্পদ উপার্জন করা হবে তা পুঞ্জীভূত করে রাখা যাবে না। কেননা, এতে সম্পদের আবর্তন বন্ধ হয়ে যায় এবং ধন-সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। সম্পদ সঞ্চয়কারী নিজেই মারাত্মক নৈতিক রোগে আক্রান্ত হয় তা নয়, বরং সে সব সমাজের বিরুদ্ধে জঘন্যতম অপরাধ করে এবং অবস্থানও নেয়। এই নীতিমালার আলোকে ইসলাম দৈনন্দিন জীবনের জন্য যেসব বস্তু এবং কাজ অবৈধ করে দিয়েছে তা হলো : ১. উৎকোচ আদান-প্রদান করা। ২. ব্যক্তি, সমষ্টি নির্বিশেষে সবার সম্পদ আত্মসাৎ করা। ৩. চৌর্য কর্ম। ৪. এতিম অসহায়দের সম্পদ আত্মসাৎ। ৫. মদ উৎপাদন; মাদকদ্রব্য এবং এ সংক্রান্ত যাবতীয় কর্মকান্ড। ৬. জুয়া ও এমন সব উপায়-উপকরণ যেগুলোর মাধ্যমে নিছক ঘটনাচক্রে এবং ভাগ্যক্রমে একদল লোকের সম্পদ অন্য দলের কাছে স্থানান্তর হয়।

ইসলামের এক বা একাধিক বিষয় নয়, বরং সর্বদিক হতে ইসলামকে গ্রহণ করাই হলো একজন মুসলমানের জন্য অবশ্যই পালনীয়। সন্ত্রাসমুক্ত ও কল্যাণকামী এবং অর্থনীতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ একটি আদর্শ সুশীল সমাজ গঠনে পরস্পরে সহযোগিতার হাত বাড়ানো বাধ্যতামূলক। আমরা এ ব্যাপারে এক পা এগিয়ে গেলে আল্লাহ নিশ্চয়ই দু’পা এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগাবেন।

লেখক : কলামিস্ট

ahmadabdullah7860@gmail.com

"