ধর্ম

ইভটিজিংকে না বলুন

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

মাহফুজ আল মাদানী

ইভটিজিং শব্দটি বর্তমান সময়ে অত্যন্ত পরিচিত একটি শব্দ। ইদানীংকালে তা বেশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। ইভ অর্থ আদি মাতা হাওয়া এবং টিজিং অর্থ উত্ত্যক্ত করা। অতএব ইভটিজিং অর্থ নারীদের উত্ত্যক্ত করা। ইভটিজিং একটি জঘন্যতম ও নিন্দনীয় সামাজিক ব্যাধি। সমাজের বখাটে, চরিত্রহীন, লম্পট, উচ্ছৃঙ্খল এবং মাদকাসক্ত ছেলেরাই এর আসল হোতা। ইভটিজাররা মেয়েদের গমনাগমনের পথে ওত পেতে অবস্থান করে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। ফলে মেয়েদের চলাফেরা, পড়ালেখা ও কাজকর্ম বিঘিœত হয়। বিঘিœত হয় সমাজের শান্তি। শুরু হয় কলহ, বিবাদ, বিসম্বাদ। সমাজে দেখা দেয় নানাবিধ অন্যায় অপকর্মের।

মানবতার ধর্ম ইসলাম ইভটিজিংকে সমূলে উৎখাতের ব্যবস্থা করে রেখেছে। যেসব কারণে সাধারণত ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ সংঘটিত হয়, ইসলাম তা অংকুরেই বিনাশ করে দিয়েছে। সন্তানদের দ্বীন শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের চরিত্র গঠন ও নৈতিক মূল্যবোধসহ তাকওয়াবান করে গড়ে তোলার জন্য পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, শিষ্টাচার শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে তাদেরকে শাসন থেকে বিরত থাকবে না’-(আহমদ)। নারীরা যাতে ইভটিজিংয়ের শিকার না হয়, এজন্য গায়রে মাহরাম নারীদের প্রতি থাকাতে নিষেধ করেছে। ‘হজরত কাসিম বিন আব্দুর রাহমান (রহ.) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, চোখের দৃষ্টি ইবলিসের বিষাক্ত তীরগুলোর মধ্যে একটি তীর। যে ব্যক্তি আমার ভয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ বর্জন করবে আল্লাহ পাক উহার পরিবর্তে তাকে এমন ইমান দান করবেন, যার স্বাদ সে অন্তরে অনুভব করবে’ (ত¦াবারানী)। এমনকি পবিত্র কোরআনেও এ সম্পর্কে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে এভাবে, আল্লাহ বলেন, ‘মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা আছে। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা অবহিত আছেন। ইমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান, তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষদেশে ফেলে রাখে’ -(সূরা আন নূর : ৩০, ৩১)।

ইভটিজিংয়ের সিঁড়ি বেয়ে অনেকে বিপথগামী ধর্ষণ বা ব্যভিচারে লিপ্ত অথবা ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকেন। অথচ ইসলাম ধর্ম ব্যভিচার এবং এতদসংশ্লিষ্ট কাজ হতে দূরে থাকতে নির্দেশ প্রদান করেছে। এমনকি ব্যভিচারের যাতে কোনো সুযোগ তৈরি না হয়, সেটাও ইসলাম সতর্ক রয়েছে। হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে মাহরাম ব্যতীত একান্তে মিলিত না হয়’। এর মাধ্যমে ইসলাম মূলত ব্যভিচারের পথকে অবরুদ্ধ করতে চায়। এ ছাড়া আল্লাহর বাণী, ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয়ই এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ’ (সুরা আল ইসরা : ৩২)। আর ইসলাম ধর্ম অশ্লীল, অশোভনীয় কাজকে কখনো প্রশ্রয় দেয় না। চাই সে যত বড় বিত্তশালী বা বিত্তবান হোক না কেন। সবার জন্য সমানভাবে নির্দেশনা প্রদান করে রেখেছে। এরপরও যদি কেউ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন সে পরিপূর্ণ মুমিন থাকে না।

কোনো বান্দা পূর্ণ ইমানদার থাকা অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে না। ইমান একজন ব্যক্তিকে সব খারাপ এবং গর্হিত কাজ হতে বিরত রাখে। ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ব্যভিচারি ইমান থাকা অবস্থায় ব্যভিচার করতে পারে না’ -(বোখারি ও মুসলিম)। ইমাম বোখারি (রহ.) বলেছেন, ওই ব্যক্তি পূর্ণ ইমানদার থাকবে না এবং ঈমানের আলো থাকবে না।

অন্য হাদিসে এসেছে, ব্যভিচারে লিপ্ত হলে ইমান বের হয়ে যায়। তার তাকওয়া সরে যায় অন্তর থেকে। তখন লিপ্ত হয় ব্যভিচারে। হাদিসের ভাষ্যানুযায়ী, ‘হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন কোনো বান্দা ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তখন তার ইমান বের হয়ে যায় এবং এটা ছায়ার মতো তার মাথার ওপর অবস্থান করে। অতঃপর সে যখন এ অপকর্ম হতে বিরত হয়, তখন তার দিকে ইমান ফিরে আসে’ (তিরমিজি ও আবু দাউদ)।

এতে স্পষ্ঠ হয়ে ওঠে যে, একজন পরিপূর্ণ মুমিন ব্যক্তি ইভটিজিং বা তৎসংশ্লিষ্ট অগ্রবর্তী কাজ ব্যভিচারে লিপ্ত হতে পারে না। আর এ কাজসমূহ আদর্শ সমাজ গঠনের পরিপন্থী। আমাদের সমাজের এহেন নিকৃষ্ট কার্যাবলিকে দূর করতে না পারলে সমাজের ধনী-গরিব, ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা কেউই সুন্দর ও ভালোভাবে বসবাস করতে পারবে না। আসুন আমরা ইভটিজিং ও ব্যভিচারের পথকে বন্ধ করতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি।

লেখক : গবেষক, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

mahfujnb@yahoo.com 

"