মতামত

৫৭ ধারা বনাম সাংবাদিকতা

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

আবুল বাশার শেখ

‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেউ পড়লে, দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারেন অথবা যার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহলে তার এই কার্য হবে একটি অপরাধ। আর সেই ধারাটি ৫৭ ধারা নামে বহুল পরিচিত। এ ধারায় অপরাধের জন্য অনধিক ১৪ বছর ও অন্যূন সাত বছর কারাদ- এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদ- দেওয়া যাবে।’ ২০০৬ সালে আইসিটি আইন প্রণয়ন করা হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়।

এই আইনে ৯টি অধ্যায়ে মোট ৯০টি ধারা যুক্ত করা হয়। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ল্যাপটপ, স্মার্টফোন, ফেসবুক, ইউটিউব ইত্যাদির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়ে যায় কয়েকগুণ। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এই আইনের অপব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিষয়টি অনুধাবন করে সরকার ২০১১ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সংশোধন আনার চিন্তা শুরু করে এবং এই আইনের শাস্তি ও আইন প্রয়োগে পরিবর্তন আনার চিন্তা করে। অবশেষে ২০১৩ সালে তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে এ আইন প্রণয়ন করা হয়। একই বছরের ৮ অক্টোবর সংসদে আইনটি সংশোধিত আকারে পাস করা হয়। সচেতন মহলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনটি সংশোধন করে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর থেকেই সমালোচনার শুরু। এই আইনে পুলিশকে সরাসরি মামলা করার ও ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই আইনকে সামনে রেখে এর অপব্যবহার অনেকগুণ বেড়েছে। এই আইনের অপব্যবহারের ফলে অনেককে জেল-জুলুমসহ হয়রানির স্বীকার হতে হয়েছে এবং হচ্ছে।

‘রাজনীতি’ শব্দটা এমন একপর্যায়ে চলে গেছে যে, সংবাদকর্মীরাও এর থেকে দূরে নেই। মুখে মুখে অনেক বড় কথা বলে থাকেন আমাদের অনেক সাংবাদিক। কিন্তু ক্ষমতা আর লোভের কাছে তাদের সেই নীতিকথা কখনো কখনো ‘ক্ষমতাগীতি’ হয়ে বাজে কানের কাছে। আর এই কারণে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় সাংবাদিক মহল। তখন সরকারের লেজুড়বৃত্তি ছাড়া আর কিছু করতে পারে না। বিষয়টি খুব পরিষ্কার বোঝা যায়, বিভিন্ন দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে। যেমন যে ব্যক্তি আজ এক সরকারের আমলে বিশ্বমুক্ত গণমাধ্যম দিবসে বলছেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এখন সবচেয়ে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করছে; সেই ব্যক্তিই তার অপছন্দের সরকারের আমলে বলবেন, দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। এই হচ্ছে আমাদের সংবাদকর্মীদের সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের বিষয়।

একাধিক আইনজীবী এই ধারাটির বিরোধিতা করে বলেছেন, সরকার অনেক সময় ভালো উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়ন করলেও তার অপব্যবহারের ফলে মানুষের হয়রানি বাড়ে। ৫৭ ধারাটিই মানুষের, বিশেষ করে সাংবাদিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণœ করেছে। তাই এই ধারাটি বাতিল করা উচিত। আইনজীবীরা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বিশ্লেষণ করে বেশ কিছু অস্পষ্টতা দেখতে পেয়েছেন। এই আইনে বলা হয়েছে, মিথ্যা ও অশ্লীল, নীতিভ্রষ্টতা, মানহানি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি ইত্যাদি অপরাধ। কিন্তু সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নীতি বা নৈতিকতার কথা বলা থাকলেও কোনো কোনো বিষয়বস্তুকে অশ্লীল বা মিথ্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা হবে, তা এই ধারায় সুস্পষ্ট করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে এই আইনে সুনির্দিষ্ট স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। এসব কারণেই এই আইনের অপ্রয়োগের অনেক বেশি সুযোগ রয়েছে। তাই এই আইনটি বাতিল হওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

সাংবাদিক নেতারা এই আইনটির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই আইনটির মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। মুক্ত মতপ্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ৫৭ ধারা। কোনো সংবাদ পরিবেশন যদি কারো বিপক্ষে যায়, তাহলে এর জন্য প্রেস কাউন্সিল রয়েছে। এ ছাড়া দেশের প্রচলিত আইনেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ৫৭ ধারার যেভাবে অপব্যবহার হচ্ছে তা সাংবাদিক মহলকে ভাবিয়ে তুলছে।

এদিকে সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘৩৯। (১) চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল। (২) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, বিদেশি রাষ্ট্রসমূহের সহিত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, জনশৃঙ্খলা, শালিনতা ও নৈতিকতার স্বার্থে কিংবা আদালত অবমাননা, মানহানি বা অপরাধ-সংঘটনে প্ররোচনা সম্পর্কে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে (ক) প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’ আইনজীবীদের মতে, সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদের ২(ক)-এর সঙ্গে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা সাংঘর্ষিক। এখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আইসিটি আইনে তাতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকরা প্রতিদিন সরকারি বাহিনী কিংবা উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে হুমকি পাচ্ছেন। শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করার মাধ্যমে সরকারের সমালোচনা থেকে বিরত থাকার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

একজন প্রকৃত সাংবাদিক সব সময় দেশের সংবিধান ও আইন মেনেই চলেন। আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে-এমন কোনো খবর তৈরি করেন না। দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, সাংবাদিকরা কোনো কালেই কারো প্রতিপক্ষ ছিলেন না। এখনো নেই এবং আগামীতেও থাকবেন না। সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের লক্ষ্য নিয়েই তারা এই শঙ্কাকুল পেশায় কাজ করেন। সাংবাদিকরা দুরন্ত সাহস নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেন বিধায় দেশ থেকে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি রুখে দেওয়া যায়। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকে। জনকল্যাণ নিশ্চিত করা যায়। আর তাই সরকারের উচিত হবে, দেশের স্বার্থে সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সাম্প্রতিক বাংলাদেশে নাটকীয়ভাবে বেশ কজন সাংবাদিককে আটক ও নাজেহাল করার পর থেকেই মূলত এই আইন নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইতে শুরু করে সব মহলে। সাংবাদিকরাও সোচ্চার হচ্ছেন এই আইনের বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে এই আইন বাতিলের নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট মামলা করা হয়েছে, যা এখনো বিচারাধীন। সাংবাদিকরা আশা করছেন, উচ্চ আদালত এ বিষয়ে একটি সঠিক নির্দেশনা দেবেন। তবে এর সুরাহা কবে হবে তা কারো জানা নেই। তথ্যপ্রযুক্তি আইন থেকে বহুল আলোচিত ৫৭ ধারা সরিয়ে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাখা হবে কি না, আগামী অগেস্ট মাসে তা জানা যাবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্তে সচিবালয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে ৫৭ ধারা সাংবাদিকদের মতপ্রকাশে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধারার ব্যবহার ও অপব্যবহারে ইতোমধ্যে বেশ কজন সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। যাতে দেখা গেছে, দেশের প্রতিভাবান তরুণ সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তারুণ্যদীপ্ত তরুণরা হারিয়ে ফেলছেন সঠিকভাবে কাজ করার মন-মানসিকতা। নীতি-নৈতিকতার পথ ভুলে অনেকেই চুপ থাকার মতো সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশ-জনতার কথা বিবেচনা করে দ্রুত এ ধারাটি বাতিল করা না হলে এটি এক সময় কালো আইন বলে সাধারণ মানুষের কাছে বিবেচিত হবে। এ আইনটি নিয়ে দেশ ও দেশের বাইরে বিতর্ক চলছে। এই বিতর্কের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। যাতে করে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত কর্তব্য সঠিক সময়ে সঠিকভাবে পালন করতে পারেন।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

basharpoet@yahoo.com

"