ভালোমন্দ

সমকালের কড়চা

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

এস এম মুকুল

ঢাকা ওয়াসার ধোঁয়াশা : সেবা না দিয়েও সুয়ারেজ (পয়োবর্জ্য) খাতে রাজধানীবাসীর কাছ থেকে বছরে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৩০০ কোটি টাকা লুটে নিচ্ছে ঢাকা ওয়াসা। এমনকি প্রতি বছর সুয়ারেজ সেবার ওপর বাড়াচ্ছে ট্যাক্স। নিরুপায় নগরবাসী বাধ্য হয়েই ঢাকা ওয়াসার এ অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ঢাকা ওয়াসা পাইপলাইনের মাধ্যমে বাসাবাড়ি থেকে মানুষের মলমূত্র নারায়ণগঞ্জের পাগলায় বসানো সুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্লান্টে নেওয়ার কথা। পরে তা পরিবেশবান্ধব উপায়ে শোধনসাপেক্ষে নদীতে ফেলবে। এ শর্তে রাজধানীর বড় একটি অংশের বাসাবাড়িতে সুয়ারেজ সার্ভিস সংযোগ দিয়েছে সংস্থাটি। এসব বাড়ি থেকে এ সংযোগ বাবদ পানির বিলের প্রায় সমপরিমাণ ট্যাক্স আদায় করলেও মাত্র ৫ শতাংশ পরিশোধন করা হচ্ছে। ৯৫ শতাংশ পয়োবর্জ্যই পানি নিষ্কাশনের নালা হয়ে মিশছে রাজধানীর চারপাশের নদী, ঢাকার ভেতরের খাল ও জলাধারে।

মন্তব্য : ঢাকা ওয়াসার ধোঁয়াশায় ভারী কুয়াশা কবে কাটবে, কে জানে। তবে সেবা না দিয়ে জনগণের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা নিজেদের আখেরে লুটপাট করার সূত্রটা ভালোই জানে তারা। খবরে প্রকাশ, ২০০৯ থেকে ২০১৭ অর্থবছর পর্যন্ত আট বছরে সুয়ারেজ খাতে ঢাকা ওয়াসা সার্ভিস চার্জ আদায় করেছে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা আর সুয়ারেজ পাইপলাইন মেরামতে খরচ করেছে শুধু ১৬ কোটি টাকা। তাহলে তারা নগরবাসীর কাছ থেকে এই বিপুল অর্থ কোন খাতে খরচ করেছে তার হিসাব আর জবাব আদায় করবে কে। টাকা দিয়ে সেবা না দেওয়া একটি অপরাধ আবার সেবা কার্যক্রম পরিচালনা না করার কারণে মানববর্জ্য জলাধারে মিশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টির দায় আরো বড় একটি অপরাধ। দ্বিমুখী অপরাধ করার পরও ওয়াসার কর্মকর্তাদের কোনো জবাবদিহিতা নেই কেন-এটাই বড় রহস্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে-সবার আগে ঢাকা ওয়াসাকে ভালো করে ওয়াশ করা উচিত। আগে ওয়াসা যারা চালাবেন তারা বর্জ্যমুক্ত হোন, তারপর নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণের স্বপ্ন নিয়ে ভাবতে হবে।

ইলিশ বাংলাদেশের : আন্তর্জাতিক মেধাসম্পদ বিষয়ক সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেসন’ (ডব্লিউআইপিও) কর্তৃক জামদানির পর বাংলাদেশের রুপালি ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্যের স্বীকৃতির ফলে নিজস্ব পণ্য হিসেবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশের ইলিশের সুনাম। ইলিশের একক মালিকানা পাওয়ার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিকভাবে জিআই নিবন্ধনের জন্য সরকারের পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতরে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করে মৎস্য অধিদফতর। তথ্য-প্রমাণাদি যাচাই ও বিশ্লেষণের পর চলতি বছরের ১ জুন নিজস্ব জার্নালে ৪৯ পৃষ্ঠার একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে পেটেন্ট ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর। আশঙ্কা থাকলেও প্রতিবেশী দেশ ভারত বা মিয়ানমার ইলিশের জিআই নিবন্ধনের ব্যাপারে আপত্তি তোলেনি।

মন্তব্য : ইলিশ বাংলাদেশরই ঐতিহ্য। বাংলার রুপালি ইলিশের সঙ্গে পৃথিবীর কোনো মাছেরই তুলনা নেই। ভারত-মিয়ানমারের ইলিশ আমাদের ইলিশের ধারেকাছেও যেতে পারে না। তবে আর যাই হোক ইলিশের এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশীয় ঐতিহ্য সুরক্ষার পথে আরো এক ধাপ এগিয়ে গেল। আশাবাদের ব্যাপারটি হলো-বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে ইলিশের উৎপাদন কমলেও বাংলাদেশে প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে। তারচেয়েও গর্বের বিষয় সারা বিশ্বে যে পরিমাণ ইলিশ উৎপাদিত হয় তার সিংহভাগই হয় বাংলাদেশে। ইলিশের স্বত্ব স্বীকৃতি পাওয়ার পেছনে এসব ব্যাপার কাজ করেছে। গুঞ্জন আছে, ভারতের জামাইষষ্ঠি ও পুজোয় বাংলাদেশের ইলিশ ছাড়া চলেই না। তাছাড়াও চোরাইভাবে মধ্য সাগর থেকে বাংলাদেশের যে ইলিশ ভারতে পাচার হয়, সেই ইলিশই ভারতের ব্যবসায়ীরা তাদের দেশের ট্যাগ লাগিয়ে বিদেশে রফতানি করে! এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মৎস্যবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদফতরের সচেতন ভূমিকা কাম্য। আর যারা চোরাই কারবার করছেন তাদেরও বোধোদয় হোক-দেশের সম্পদ পাচার না করে রফতানি করুন। তাহলে দেশের অর্থ ও সম্মান দুটোই সমৃদ্ধ হবে। আর তখন আপনার কর্ম চুরি না হয়ে গর্বও হতে পারে।

হটলাইন-১০৬, অভিযোগে নেইকো ভয় : দুর্নীতি রুখবে-১০৬ সেøাগানে ২৭ জুলাই থেকে শুরু হওয়া দুর্নীতি-সংক্রান্ত অভিযোগ সরাসরি দাখিলের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হটলাইনে লাখো কলের সংখ্যা ছাড়িয়েছে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দুর্নীতি, পুলিশের অনিয়ম-দুর্নীতি, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট, ভিজিএফ, কাবিখা, কাবিটা, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম, গৃহকর্মী নির্যাতন, জমি দখল, জমি উদ্ধার, জাল দলিল, মাদক ব্যবসাসহ নানা ধরনের অভিযোগ আসছে। হটলাইনে থাকা দুদকের কর্মকর্তারা এসব অভিযোগ, অনুযোগ, নালিশ শুনে এরই মধ্যে দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের আওতায় থাকা অভিযোগগুলো লিপিবদ্ধ করছে। এ ধরনের এক লাখের বেশি কলের মধ্য থেকে দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ বিবেচনায় ৩১৫টি অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে ব্যবস্থা গ্রহণে যাচাই-বাছাই শাখায় পাঠানো হয়েছে। উপযুক্ত অভিযোগকারী পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিও নিয়েছে দুদক। দুদকের উপপরিচালক জানান, দুর্নীতি বা দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধের বাইরে কোনো অভিযোগ নেওয়ার সুযোগ নেই। এটা দুর্নীতি প্রতিরোধে কিছুটা সহায়ক হবে। এর চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, দুর্নীতি দমনে নাগরিকের সঙ্গে দুদকের সরাসরি যোগাযোগ হটলাইনের মাধ্যমে সফল হচ্ছে। দুদকের হটলাইন টেলিফোন নম্বরটি-১০৬। এটি একটি হান্টিং নম্বর? একই সঙ্গে ৩০টি ফোনকল রিসিভ করা যায়। এর সঙ্গে কম্পিউটার সংযুক্ত রয়েছে। কোনো কল রিসিভ করা না গেলে যিনি কল করেছেন তার ফোন নম্বরসহ তার বক্তব্য রেকর্ড হয়ে যায়। আর যাদের ফোন রিসিভ করা হয়, তাদের কথোপকথনও রেকর্ড হয়ে থাকে। ছুটির দিন বাদে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কল গ্রহণ করা হয়।

মন্তব্য : দুর্নীতি প্রতিরোধে এমন জনবান্ধব উদ্যোগ আরো আগেই নেওয়া উচিত ছিল। তবু তো শুরু হয়েছে, এটাও বড় সান্ত¡না ও আশাবাদের বিষয়। তবে মনে হচ্ছে এ বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা কম। অভিযোগ যে হারে পড়ছে, সঠিকভাবে মানুষ জানতে পারলে আরো কয়েকগুণ বেশি অভিযোগ হওয়াটাই স্বাভাবিক বাস্তবতা। তবে যেহেতু দুদকের কার্যক্রম এটি, এখানে দুর্নীতি ও অনিয়ম-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো দ্রুত আমলে নেওয়া উচিত। তাৎক্ষণিক হোক বা তৎক্ষণাৎ হোক ঘুষ নামক সামাজিক ব্যাধিটি বন্ধ করা গেলে দুর্নীতি অর্ধেক নিচে নেমে আসবে। অনিয়মও বন্ধ হবে। হাতেনাতে অভিযোগের ধরা সব ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। অভিযোগ আমলে নিয়ে তথ্য-তালাশের মাধ্যমে ঘুষখোর কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা হোক। একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন সুবিধা আলোকে সেই কর্মকর্তার জীবনযাপন, ব্যাংক ব্যালান্স এবং স্থাবর সম্পদের উৎস নিশ্চিত হয়ে তার সম্পদ বা অর্থ রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যয় করা হোক। এখন দেখার বিষয় জনগণের অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক কত দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে। তার ওপরই নির্ভর করবে দুদকের ওপর জনগণের আস্থা থাকবে কি না। আমরা দুদকের সাফল্য কামনা করব। অন্তত এই কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশে ঘুষখোরদের দৌরাত্ম্য কমুক-এটাই প্রত্যাশিত।

সরকারের টাকায় আত্মীয়ের হজ : চলতি বছর রাষ্ট্রীয় খরচে হজ পালনের জন্য নির্বাচিত হওয়া ৩১৮ জনের মধ্যে রয়েছেন ধর্মমন্ত্রীর আরো বেশ কয়েকজন আপনজন। শুধু তাই নয়, নিজ এলাকাকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। এতে এমন অনেক জেলাই আছে যেখান থেকে একজনও নেই। একই পরিবারের একাধিকজন একত্রে হজে যেতে পারছেন সরকারি টাকায়। তালিকায় থাকা কারো কারো নামের পাশে ‘রহস্যজনক’ কারণে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। আবার কারো কারো বেলায় বাবা-মায়ের নাম পর্যন্ত রাখা হয়নি। মূলত বিত্তবানদের সরকারি খরচে হজ পালনের সুযোগ করে দেওয়ার কারণেই বেশির ভাগেরই পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, মন্ত্রীর জামানায় নিজের এলাকার ও পছন্দের লোকদের রাষ্ট্রীয় খরচে হজের তালিকায় জায়গা করে দিতে বছর বছর বাড়ছে এ তালিকা। ২০১৪ সালে যা ছিল ১২৪ জন, ২০১৫ সালে ২৬৩, ২০১৬ সালে ২৮৩, ২০১৭ সরকারি খরচে তালিকায় যুক্ত হয়েছে ৩১৮ জনের নাম।

মন্তব্য : এই যদি হয় আমাদের ধর্মমন্ত্রীর কর্ম, তবে হজ নামের পবিত্র কর্মটির পবিত্রাও যেন আর টিকবে না (নাউজুবিল্লাহ!)। গুরুতর এই অভিযোগ আমলে নেওয়া হোক। ক্ষমতার বলয়ে বসে সরকারের টাকার এহেন তছরুপ বরদাশত করা ঠিক নয়।

 

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"