রাজধানী

যানজট বনাম মডেল নগরী

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

অনলাইন ডেস্ক

রাজধানীর যানজটে প্রতিদিন গড়ে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে! সম্প্রতি এই তথ্য উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত ‘টোয়ার্ডস গ্রেট ঢাকা : এ নিউ আরবান ডেভেলপমেন্ট প্যারাডাইম ইস্টওয়ার্ড’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে। তাদের এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাজধানীতে যান চলাচলের গতি প্রতিঘণ্টায় সাত কিলোমিটার। অথচ মানুষের হাঁটার গতি প্রতিঘণ্টায় ধরা হয়ে থাকে ৫ কিলোমিটার। 

পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে ‘এমসিসিআই ও দ্য চার্টার্ড ইনস্টিটিউট অব লজিস্টিকস অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট’ যৌথভাবে রাজধানীর যানজট নিয়ে এক গবেষণা করেছিল। সেখানে তারা তুলে ধরে, রাজধানীতে যানজটের কারণে বছরে বাণিজ্যিক ক্ষতি ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি এবং প্রতিদিন ৮৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া আরো নানা ধরনের ক্ষতির কথা তুলে ধরা হয় তাদের প্রতিবেদনে। ফলে তখন সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা। বর্তমান সরকারেও এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু যানজট মধ্যম আয়ের দেশ গড়ার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। কেননা, এই দেশে যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসেন, তখন তারা প্রথমেই যানজট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ব্যবসায়ীরাও যানজটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অথচ এই ব্যবসায়ীদের কাজের সুযোগের ওপরই নির্ভর করে প্রতিটি দেশের উন্নতি। সে ক্ষেত্রে যানজট আমাদের উন্নয়নের মূল অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যানজট নিরসনে সরকার যে একদমই ভাবছে না তা যেমন ঠিক নয়, আবার তাদের ভাবনা যে আরো সম্প্রসারিত করা দরকার সেই দিকটিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ যানজট নিরসনে সরকারকে আরো গভীরে চিন্তা করতে হবে। সরকার সংশ্লিষ্টরা যদি মনে করেন, কেবল ফ্লাইওভার নির্মাণের মধ্য দিয়ে যানজট নিরসন সম্ভব, তাহলে এখানে দ্বিমত পোষণ করা যেতেই পারে।

পুরো ঢাকাকে যদি ফ্লাইওভার দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, তবুও বোধ করি যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এ সমস্যা সমাধানে চাই ভিন্ন চিন্তাভাবনা। প্রয়োজন যুগোপযোগী পরিকল্পনা। ঢাকা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য দরকার এখান থেকে জনসংখ্যার চাপ কমানো। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। কেননা, রাজধানীতে প্রতিদিন যেভাবে মানুষ আর গাড়ির চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা আগামী পাঁচ বছর পর কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে তা নিয়ে ভাবতে হবে এখনই। নতুবা তখন শহরে গাড়ি থাকবে ঠিকই, কিন্তু সেই গাড়ি করে গন্তব্যে যাওয়া-আসা করা সম্ভব হবে না। বর্তমান পরিস্থিতিই সাক্ষ্য দিচ্ছে, আগামীতে হেঁটেই ঢাকাবাসীকে চলাচল করতে হবে। যদি তাই হয়, তাহলে এই সমস্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামগ্রিক জীবনের কাজকর্ম সময় মতো সম্পাদন করা সম্ভব হবে না। স্বাভাবিক জীবনের গতিপথ বাধাগ্রস্ত হবে।

অনেকেই মনে করেন, যানজট সমস্যার জন্য ফুটপাত দখল একটি প্রধান কারণ। সেটা না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু ফুটপাত যদি দখলমুক্ত করা হয়, তাহলে কি এই যানজট সমস্যা সমাধান সম্ভব? হয়তো কিছুটা সম্ভব। কিন্তু ঢাকা থেকে ফুটপাত একেবারেই দখলমুক্ত করা কি সম্ভব? কেননা, মানুষের চাহিদার জন্যই ফুটপাত দখল হচ্ছে। এই চাহিদা যেহেতু মানুষের, সেহেতু ফুটপাত সকালে দখলমুক্ত করলে বিকেলে আবার দখল হবেই। ফলে যানজট নিরসনের জন্য শুধু ফুটপাতের পেছনে ছুটলেই হবে না।

প্রতিদিন রাজধানীতে যেভাবে মানুষের চাপ বাড়ছে তার রাস টানতে হবে। তা না হলে যানজট নিরসন কখনই সম্ভব নয়। কেননা, মানুষের চাপ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির চাপ বাড়বে। তাই রাজধানী থেকে মানুষের চাপ কমাতে হবে। এখান থেকে মানুষের চাপ কমলে কমে যাবে গাড়ির চাপও। সেই সঙ্গে ফুটপাত থেকেও কমবে দখলদারের সংখ্যা। ফলে রাজধানী থেকে যানজট নিরসন হবে সহজতর। তা না হলে ঢাকাকে যানজটমুক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

২০১৪ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে (নিপোর্ট) তাদের এক বিশ্লেষণে দেখিয়েছিল যে, ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রতিদিন ১ হাজার ৪১৮ জন মানুষ বাড়ছে। যা বছর শেষে দাঁড়ায় ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজারে। তাহলে এই তিন বছরে এই সংখ্যাটা কত হতে পারে, তা নির্দি¦ধায় অনুমান করা যায়। একই সঙ্গে এটুকুও বলা যেতে পারে যে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকা শহর বিশ্বের ঘনবসতি শহরগুলোর মধ্যে এগারতম। ১২৫ বর্গমাইলের এই শহরে বর্তমানে জনসংখ্য ১ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি। প্রতিদিনই এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে হাজারেরও বেশি মানুষ। জাতিসংঘের ‘ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্ট’-এর হিসাব অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় তিন কোটিতে। তখন এই শহর বিশ্বের ঘনবসতি শহরের মধ্যে করাচি, মেক্সিকো সিটি, কায়রো, সাও পাওলো এবং নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোকে পেছনে ফেলে ষষ্ঠ স্থানে উঠে আসবে।

২০১৪ সালের এক হিসাবে দেখা গেছে, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৮২টি। এর মধ্যে ৬০টি ঢাকা শহরে অবস্থিত। এছাড়া সারা দেশে মোট ৭৫টি সরকারি-বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের মধ্যে ২৮টি রয়েছে ঢাকায়। শুধু সংখ্যার বিচারে নয়, মানের দিক থেকেও দেশের সেরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ঢাকাকেন্দ্রিক। এসব মানসম্মত স্কুলে-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রাম কিংবা মফস্বল থেকে ছুটে আসছেন অনেকেই।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে দেশের স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় ১ কোটি ৭ লাখ ৭৩ হাজারের কিছু বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ লাখ ৩০ হাজার (২৮ শতাংশ) শিক্ষার্থী রয়েছে ঢাকা বিভাগে। এছাড়াও ঢাকা শহরে রয়েছে ২০ লাখের ওপরে পোশাক শ্রমিক, প্রায় ১১ লাখ নির্মাণ শ্রমিক এবং ৫ লাখের ওপর রিকশাচালক। এই মানুষগুলোর জীবনের সঙ্গে আরো কয়েক লাখ মানুষ জড়িয়ে রয়েছে এখানে। ফলে জ্যামিতিক হারে এই সংখ্যাটি প্রতিদিনই বাড়ছে। তাই এই স্রোত ঠেকাতে হবে। ঢাকাকে যানজটমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখান থেকে জনসংখ্যা কমাতেই হবে। পাশাপাশি ঢাকায় অবস্থিত কলকারখানা অন্যত্র স্থানান্তর করতে হবে।

এক্ষেত্রে প্রথম দিকে ঢাকার আশপাশে তথা, মুন্সীগঞ্জ, শ্রীনগর, নবাবগঞ্জ, নরসিংদী, গজারিয়া, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁও, মেঘনাসহ এর আশপাশের অঞ্চলগুলোকে উপশহর হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। কেননা, এসব অঞ্চল থেকে ঢাকায় যাতায়াত খুবই সহজ। সেই সঙ্গে নির্মিত উপশহরগুলোতে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার আধুনিক ব্যবস্থা যাতে থাকে সেই দিকটিও নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য এর জন্য সর্বপ্রথম সুষ্ঠু-সুন্দর একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তবে উপশহর নির্মাণের পর বসে থাকলেই হবে না। উপশহর নির্মাণের পর সেখানে স্থানান্তর করতে হবে রাজধানীর সব কলকারখানা, গার্মেন্টস বা এমন উৎপাদনশীল কোম্পানিগুলো।

প্রতিটি উপশহর নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। ভালো ভালো স্কুল-কলেজ, মানসম্মত হাসপাতাল, কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি আধুনিক নাগরিক সুবিধার দিকটি বিবেচনায় আনতে হবে। মানুষ যদি নিজের শহরে রাজধানীর সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারে, তখন কেউ আর ঢাকামুখী হতে চাইবে না। একই সঙ্গে মানুষের যে স্রোত এই ঢাকাকেন্দ্রিক, তা রোধ করা সম্ভব হবে। ফলে একদিকে ঢাকা যেমন হবে যানজটমুক্ত নগরী, তেমনি হবে দূষণমুক্ত। সেই সঙ্গে এই রাজধানী হবে একটি মডেল নগরী।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

simantaprodhan05@gmail.com

"