মতামত

সাইবার অপরাধে শাস্তি

প্রকাশ : ০৯ আগস্ট ২০১৭, ০০:০০

দিলীপ কুমার আগরওয়াল

দেশে সাইবার অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে। আগ্রাসী চেহারায় আবির্ভূত হচ্ছে অপরাধীরা। সাইবার অপরাধের বিচারে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের শুরু। প্রথম বছরে ট্রাইব্যুনালে মামলা ছিল তিনটি। পরের বছর ২০১৪ সালে মামলা আসে ৩২টি। ২০১৫ সালে ১৫২, ২০১৬ সালে ২৩৩টি। সর্বশেষ চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আসা ৩৬৬টি মামলা নিয়ে ট্রাইব্যুনালে মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮৬তে। এসব মামলার মধ্যে ২২২টি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং বিচারাধীন ৫৬৫টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে চার বছরে সাইবার আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ২৬২ গুণ।

সোজা কথায়, জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সাইবার মামলা। সাইবার অপরাধের প্রকৃত চিত্র আরো ভয়াবহ। অপরাধের শিকার, ভুক্তভোগীর মাত্র ৩০ শতাংশ মামলার আশ্রয় নেন। সাইবার অপরাধীরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থারও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাইবার অপরাধের তুলনায় মামলার সংখ্যা যে অনেক কম, তা ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকেও স্বীকার করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করেন অথবা নিজেরাই সমঝোতা করে নেন। পর্নোগ্রাফি, ফেসবুক হ্যাকিং, অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার নিয়েই সাধারণত সাইবার অপরাধের অভিযোগগুলো আসে।

জরিপে বলা হয়েছে, ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর মধ্যে ৭৭ শতাংশই ফেসবুককেন্দ্রিক সাইবার অপরাধের শিকার। পাসওয়ার্ড হ্যাকিংয়ের শিকার ১২ শতাংশ নারী। ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নারীর মধ্যে ৪ শতাংশ ই-মেইল ও এসএমএসে হুমকির সম্মুখীন হন। সাইবার পর্নোগ্রাফির শিকার হন ২ শতাংশ নারী এবং ৫ শতাংশ আইডেনটিটি থেফটের শিকার। তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী মানুষের পাঁচটি মৌলিক চাহিদার পর ইন্টারনেট ব্যবহারকে ষষ্ঠ অধিকার হিসেবে অভিহিত করেছেন। বলেছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারে নিজের প্রয়োজনেই সতর্ক থাকতে হবে। পানি পানের সময় যেমন ফুটিয়ে পান করতে হয়; তেমনি ইন্টারনেট ব্যবহারের ঝুঁকি এড়াতেও সতর্ক থাকতে হবে। অ্যান্টি ভাইরাস ব্যবহার, সিস্টেম আপডেট, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড দেওয়া, ডাউনলোডের আগে অ্যাপস ভেরিফাই করা ইত্যাদি ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সন্দেহ নেই, দুনিয়ার সব দেশে সাইবার অপরাধ বাড়ছে, বাংলাদেশও তা থেকে মুক্ত নয়। এ ধরনের অপরাধে যারা জড়িত, তাদের ছাই দিয়ে ধরারও উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রযুক্তির এই যুগে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ছাড়া জীবনযাপন প্রায় অসম্ভব। প্রযুক্তি জনমুখী হয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে মানুষকে। এটা যেমন সত্য এবং যুগের বাস্তবতা, তেমনি এর অপব্যবহারও হয়ে উঠছে মানুষের যন্ত্রণার অন্যতম কারণ। আমাদের দেশে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক যে অপরাধগুলো ঘটছে, এর মাঝে বেশি হলো সামাজিক যোগাযোগ সাইটের মাধ্যমে বন্ধুত্ব তৈরি করে মিথ্যা সম্পর্কের আশ্বাস বা অন্য কোনো প্রলোভন দেখিয়ে অন্যের কাছ থেকে সুবিধা আদায় করা বা প্রতারণার মাধ্যমে ফাঁদে ফেলা; কারো কোনো অন্তরঙ্গ বা আপত্তিকর অবস্থার ছবি বা অন্যকোনো একান্ত ব্যক্তিগত বা গোপনীয় তথ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া বা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে জিম্মি করা। স্কুল-কলেজ পড়ুয়া অল্পবয়সী মেয়েরাই এসব প্রতারণার শিকার হচ্ছে বেশি। শুধু যে নারী নিগ্রহের লক্ষ্যেই সাইবার অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, তা নয়। আর্থিক ক্ষেত্রেও সাইবার অপরাধীরা ভয়ংকর অপরাধ করে চলেছে। মোবাইল ফোনে ভুয়া মেসেজ দিয়ে নম্বর হ্যাক করে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ লোপাট করার মতো ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। এ ছাড়া আরেকটি বড় অপরাধ প্রবণতা হলো- ইন্টারনেটে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো। আমাদের চোখের সামনেই রয়েছে এর দৃষ্টান্ত- একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি চাঁদে দেখা যাওয়ার প্রচারণায় ব্যাপক মানুষকে উসকানি দিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টি; মহানবীকে অসম্মান করা হয়েছে এমন একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসকে কেন্দ্র করে উদ্দেশ্যমূলক উসকানির মাধ্যমে রামুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর জঘন্য আক্রমণ, তাদের বাড়িঘর-উপাসনালয় ধ্বংস করা বেশি দিন আগের ঘটনা নয়।

আমরা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে ইন্টারনেটকেন্দ্রিক প্রতারণা ও অপরাধের খবর পাচ্ছি। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্টরাই বলছেন, এ-সংক্রান্ত অপরাধের মাত্রা আরো বেশি, অনেক অপরাধের খবরই সংবাদমাধ্যমে আসে না। মানসম্মানের ভয়ে অনেকে এ রকম অপরাধের শিকার হয়েও থানা পুলিশ কিংবা অন্য কোনো সংস্থার কাছে অভিযোগ করছেন না। ফলে অনেক ঘটনাই বিচারের আওতায় আসছে না আর যেগুলো আসছে, সেগুলোরও অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায় না। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। মনে রাখতে হবে, সাইবার অপরাধ যেমন বাড়ছে; তেমনি তা দমনেও অপরাধ তদন্ত বাহিনীকে প্রশিক্ষিত হওয়া দরকার। প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন হচ্ছে এবং অপরাধীরা সে প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে অপরাধ করে চলেছে। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে যারা মাঠপর্যায়ে অপরাধ তদন্তে কাজ করছেন, তাদেরও এ ব্যাপারে দক্ষতা বাড়াতে হবে। দেশের নিরাপত্তা এবং সুনাম রক্ষার স্বার্থে, সাইবার অপরাধী শনাক্ত এবং দমনে প্রযুক্তিপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলার বিকল্প থাকতে পারে না। সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে-এটাই সবার প্রত্যাশা।

লেখক : পরিচালক, এফবিসিসিআই

"