মতামত

পাহাড়ধসে মৃত্যু

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

শফিকুল ইসলাম খোকন

পাহাড়ধসের কথা উঠলেই মনে পড়ে প্রাণহানির কথা। আর এই প্রাণহানির কথা মনে পড়লেই অনুভব করি স্বজন হারানোর বেদনা। পাহাড়ধসে আমার কোনো স্বজন মারা যায়নি, কিন্তু আমি একজন মানুষ হিসেবে স্বজন হারানোর বেদনা অনুভব করি আমার অস্তিত্বে।

২০০৭ আর ২০১৭ সালের পাহাড়ধসে প্রাণহানির কথা পুরো জাতির কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গত ১০ বছরে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও সিলেটের ৩৬টি এলাকায় পাহাড়ধসের কারণে ৬ শতাধিক মানুষ মারা গেছে। বারবার পাহাড়ধসে প্রাণহানি হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো জোরালো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রশ্ন হচ্ছে পাহাড়ধস কি রোধ করা সম্ভব?

একজন মানুষ যতই উন্নত বা উচ্চতর চিন্তা কিংবা উন্নত কাজ করুক না কেন, তাকে কোনো না কোনো স্থানীয় এলাকায় বসবাস করতে হয়। তাকে চলাচলের জন্য ফুটপাত, বেড়ানোর জন্য পার্ক, প্রার্থনার জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো বা সংরক্ষণ, পাহাড় সংরক্ষণ, পাহাড়ে অবৈধ বসবাস রোধ, সন্তানদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শপিং করার জন্য মার্কেট ইত্যাদি ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের সারা দিনের প্রায় ৯৫ ভাগ কাজ থাকে স্থানীয়তে। সে জন্য বর্তমানে ‘ঞযরহশ মষড়নধষু, অপঃ ষড়পধষু’ স্লোগানটি বহুল প্রচলিত। এ দেশের জনগণ স্থানীয়তাকে আত্মীয়তার মতো দেখে থাকে।

গণতন্ত্রের শেষ কথা হলো দেশের জনগণ। জনগণের সরকার, জনগণের শাসন। ১৮৬৩ সালে গেটিসবার্গে দেওয়া ভাষণে আব্রাহাম লিংকনের কালজয়ী ঘোষণা থেকে গণতন্ত্রের মর্মবাণী সত্যিকারভাবে উপলব্ধি করা যায়। গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল, ফর দ্য পিপল। অর্থাৎ গণতন্ত্রের প্রথম ও শেষ কথা হলো জনগণ। গণতন্ত্রের চর্চার জন্য কেন্দ্রীয় এবং স্থানীয় সরকারের যৌথ উপস্থিতি প্রয়োজন। দেশের স্থানীয় সরকার যত শক্তিশালী হবে গণতন্ত্রের ভিত্তিও তত মজবুত হবে। সুতরাং স্বাধীন ও শক্তিশালী স্থানীয় সরকার ছাড়া গণতন্ত্র কখনো নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না, প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে না, গণতন্ত্র বিকশিত হবে না, এমনকি পাহাড়ধসের মতো দুর্ঘটনাও রোধ করা যাবে না।

আমরা জানি, একটি গণতান্ত্রিক দেশের জনগণের সবচেয়ে কাছের প্রতিষ্ঠান হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা। এর প্রধান কাজ হলো-স্থানীয় সকল উন্নয়ন কর্মকা-ে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলাকার আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকান্ডের বাস্তবায়ন ছাড়াও এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা সমুন্নত রাখা। সেজন্য গণতন্ত্র ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দুটিই পরস্পরের সম্পূরক। অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা একটি ঐতিহ্য বহন করে আসছে। প্রাচীন ভারতে একসময় গ্রামীণ শাসনব্যবস্থার মূলভিত্তি ছিল পাঁচজন নির্বাচিত বা মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠান; পঞ্চায়েত ব্যবস্থা। স্থানীয় সরকার যতক্ষণ পর্যন্ত না জনগণের সবচেয়ে কাছের সরকার হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত একে স্বশাসিত বলা যাবে না এবং কেন্দ্রীয় সরকারের লেজুড়ভিত্তিক সরকারই থাকতে হবে। সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে দেখতে হলে অবশ্যই সিডিএলজির প্রস্তাবিত ‘গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের রূপরেখা’ বাস্তবায়ন করতে হবে।

সবার জানা রয়েছে, স্থানীয় অধিবাসীরা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন কিংবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের যেকোনো একটিতে বসবাস করে। স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের ভূমিকা বা তদারকি থাকলে শুধু পাহাড়ধস রোধের মতো ঘটনাই নয়, এ জাতীয় বহু কাজ প্রতিরোধ সম্ভব। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তথা স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন) ছাড়া দেশ যেমন গণতান্ত্রিক পন্থায় পরিপূর্ণভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়, তেমনি স্থানীয় সরকার ব্যতীত কেন্দ্রীয় সরকার চাকাবিহীন গাড়ির মতো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পর গণতন্ত্রের ধারা বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ায় স্থানীয় সরকারকে কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।’ তার কথাকে সমর্থন দিয়ে বলা যায়, জনগণের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কর্মসূচি গৃহীত না হওয়ায় গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খেয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার ও স্থানীয় সরকারের কাজ ও ভূমিকা নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। আর আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক আমলের মতো সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী/রাষ্ট্রপতিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায় ক্ষমতার গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ আজো সম্ভব হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কেউ কেউ বলে থাকেন সেখানে ক্ষুদ্রঋণের মতো ‘সরকার’ ছড়ানো-ছিটানো রয়েছে। ফলে সরকারের প্রাণভোমরাও এক জায়গায় থাকে না। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিক মন্ত্রী-এমপির মুখে শোনা গেছে, তারা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা- ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর স্থানীয় সরকার কার্যকর করবেন। আমরা এখনো তার কোনো নমুনা খুঁজে পাইনি।

আমরা মনে করি, স্বাধীন-সার্বভৌম এ দেশটিকে সুন্দরভাবে পরিচালিত করতে একটি পরিকল্পিত এবং দীর্ঘস্থায়ী গণমুখী স্থানীয় সরকার বাস্তবায়ন করা জরুরি। তাহলে, আমাদের বারবার দেখতে হবে না পাহাড়ধস ট্র্যাজেডি, মানুষের প্রাণহানি। পাহাড়ে চাপা পড়ে এমন অপমৃত্যুর মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তিরও সমাধি রচিত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

"