পরামর্শ

দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয়

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

খায়রুন নাহার লিপি

বর্তমানে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়েছে দুর্নীতি। সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কবলে আজ বিপন্ন মানবসভ্যতা। সর্বনাশা এই সামাজিক ব্যাধির মরণ ছোবলে বর্তমান সমাজ জর্জরিত। সর্বোচ্চ প্রশাসন থেকে শুরু করে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, সংস্কৃতি, শিল্প-বাণিজ্যসহ সর্বত্রই চলছে দুর্নীতি। তাই বিশেষজ্ঞরা দুর্নীতিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আভিধানিক অর্থে দুর্নীতি হলো নীতিবিরুদ্ধ, কুনীতি, অসদাচরণ, অসৎ উপায় অবলম্বন, অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জন, নীতি-বিরুদ্ধ আচরণ ইত্যাদি। আর প্রতিরোধ অর্থ হচ্ছে-নিরোধ, নিবারণ, বাধাদান, প্রতিবন্ধকতা, আটক, ব্যাঘাত। আভিধানিক অর্থে শব্দটি অত্যন্ত ছোট হলেও এর অর্থ ব্যাপক। দুর্নীতিকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা যায় না। বিজ্ঞজনরা দুর্নীতিকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। দুর্নীতির ধরন প্রকৃতি বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময়। তাই তা নির্দিষ্টকরণ জটিল কাজ। দুর্নীতি এমন এক ধরনের অপরাধ, যার সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার, সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার যুক্ত। সাধারণ কথায় দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ উৎকোচ গ্রহণ বা মহল বিশেষের অশুভ স্বার্থ হাসিল করাকে দুর্নীতি বোঝায়।

বাংলাদেশের সমাজজীবনে অনৈক্য, হিংসা, দলাদলি, কোন্দল, স্বার্থপরতা, অবিশ্বাস এবং চরম দুর্নীতি বিরাজ করছে। দুর্নীতি আজ রাজনীতি, প্রশাসন, অর্থনীতি, সামাজি, ধর্মীয় ও ব্যক্তি জীবনের সব ক্ষেত্রে বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও তা থেকে বাদ যায়নি।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ সবার কাম্য। দুর্নীতি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে এবং জনগণের সম্পদকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা জাগায়। দুর্নীতি ও বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে যারা প্রভাব বিস্তার করে তারা সেই প্রভাব স্বীকার করে না। এই দুর্নীতিপরায়ণ অবস্থা কোনো নীতিকথা ও তথাকথিত সামাজিক বয়কটে পরিবর্তন হবে না। বর্তমান যুগে অপরাধের ধারা বদলে গেছে। গত কয়েক বছর ধরে ভিওআইপির সাহায্যে কতিপয় কোম্পানি যে অনাচার করে এসেছে, প্রশাসন তাদের কেশ পর্যন্ত স্পর্শ করতে পারেনি। এসব দুর্নীতি ও অপরাধ কর্মের সঙ্গে সমাজের উচ্চ মহলের শিক্ষিত, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মদদ রয়েছে। তাদের সহায়তায় অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে বহাল তবিয়তে থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনের সহায়তায় দ-িতদের অর্ধেকেরও বেশি অপরাধী সামাজিক ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা। দুদকের তত্ত্বাবধানে গত দেড় বছরে প্রায় ৩২৫ ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৪২৫টি মামলা হয়েছে এবং এর মধ্যে নিম্ন আদালতে ৮৯টি মামলার রায়ে সাজা দেওয়া হয়েছে ১২৪ জনকে। তন্মধ্যে দুদকের তালিকাভুক্ত মাত্র ৪০ জন। এর মধ্যে আবার ২৪ জনই পলাতক। সব মিলিয়ে ইতোমধ্যে সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ৮১ জনই পলাতক। ধনী ও প্রভাবশালীরা নিয়ম মেনে চলে না। তাই সঠিক নীতি কাজ করে না। টিআইবি রিপোর্টে বাংলাদেশ চারবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

মানুষ কেন দুর্নীতি করে তার উত্তর খুঁজতে ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক অবস্থা, মানসিকতা, শিক্ষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজ এ দুয়ের পারস্পরিক ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়ার মাঝেই দুর্নীতির উদ্ভব এবং বিস্তার হয়। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে কী কী উপাদান দুর্নীতির নিয়ামক হিসেবে কাজ করে তা উদঘাটন করে সেগুলোকে দুর্নীতির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যেমন-১. ঐতিহাসিক কারণ, ২. অর্থের মূল্যস্তর বৃদ্ধি, ৩. অপর্যাপ্ত বেতন, ৪. রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ত্রুটি, ৫. অপরাধ দূরীকরণে বলিষ্ঠ পদক্ষেপের অভাব, ৬. আইন সম্পর্কে জনগণের সচেতনতার অভাব, ৭. অর্থের মাপকাঠিতে সামাজিক মর্যাদা নিরূপণ প্রবণতা, ৮. ব্যক্তিগত লোভ-লালসা ও ৯. ধর্মীয় শিক্ষার অভাব।

দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে কেউ কেউ ধর্মীয় শিক্ষা ও জনগণের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বস্তুত দুর্নীতির প্রতিকার, প্রতিরোধ ও সংশোধনের জন্য কার্যকর সামাজিক নীতি-কর্মসূচি গ্রহণ, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং জনমত গড়ে তুলতে হবে। আর এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো বিবেচনায় আনা যেতে পারে- যেমন : দুর্নীতি সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করা তথা শিক্ষা কৌশল, বিভিন্ন প্রদর্শনমূলক অনুষ্ঠানমালা, সাহিত্য ও বিচিত্রানুষ্ঠান, স্লোগান, পথযাত্রা, রেডিও-টিভি, ছায়াছবি, দুর্নীতিবিরোধী পোস্টার এবং পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে। নি¤েœ দুর্নীতি মোকাবেলায় আরো কিছু পদক্ষেপ সম্পের্কে তুলে ধরা হলো- ১. দুর্নীতিবিরোধী চিন্তাচেতনার বিকাশ ও বিস্তার ঘটানো। ২. আন্দোলন পরিচালনার জন্য সংগঠন গড়ে তোলা। ৩. নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি জনগণের সমর্থন ও আস্থা অর্জন করা। ৪. দুর্নীতি মোকাবেলায় গঠিত সংগঠনে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ৫. ক্ষমতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় দুর্নীতি মোকাবিলায় অধিকতর ফলদায়ক উপায় ও পন্থা নির্বাচন। ৬. গৃহীত উপায় ও পন্থার প্রতি জনসর্থন যাচাই ও প্রয়োজনে সংশোধন। ৭. জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্নীতি মোকাবিলায় কার্যকর পন্থা ও উপায় কার্যকরকরণ। ৮. মূল্যায়ন ও কার্যকারিতা স্থায়ীকরণ। ৯. ধর্মীয় বিধানাবলি প্রচার ও কার্যকর করা। ১০. দুর্নীতিবিরোধী সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা করা। ১১. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ১২. দুর্নীতিবাজদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। ১৩. দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা। ১৪. দুর্নীতিবাজদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বা সামাজিকভাবে বয়কট করা। ১৫. দক্ষ তদন্তকারী এবং সরকারি আইনজীবী নিয়োগ করে দুর্নীতিবাজদের শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা। ১৬. দুর্নীতি দমন কমিশনকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন ও শক্তিশালী করা।

দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং সমাজ ও সভ্যতার জন্য মারাত্মক অভিশাপ। একমাত্র দুর্নীতির কারণেই আমাদের ওপর নেমে এসেছে দরিদ্রতা এবং দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই অবিলম্বে এর মূলোৎপাটন অপরিহার্য। বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিধায় দুর্নীতির কারণ এবং তা প্রতিরোধে কতিপয় নীতিমালার কথা বলা হয়েছে। এটি যত বেশি বিশ্লেষিত ও আলোচিত হবে জনগণ এ বিষয়ে তত বেশি সচেতন হবে এবং তার সুফল ভোগে সমর্থ হবে। আর আমরা পাব দুর্নীতিমুক্ত, স্বাবলম্বী, স্বনির্ভর এবং সুখী-সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ। এটাই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

"