শিক্ষা

পরীক্ষা : মানসিক চাপ

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

অলোক আচার্য

পরীক্ষা শব্দটিই এখন আমার কাছে কিছুটা ভীতিকর বলে মনে হয়। কারণ পরীক্ষার আগের রাত ও দিনগুলোয় এক ধরনের মানসিক দুশ্চিন্তায় সময় কাটে ছাত্রছাত্রীদের। কয়েকটি উন্নত দেশ সম্পর্কে পড়েছি। যেখানে দশ বছরের আগে নাকি কোনো পরীক্ষা দিতে হয় না। আমার জানতে ইচ্ছে করে, তাদের শৈশবটা কেমন হয়। নিশ্চয়ই খুব আনন্দের। পরীক্ষা দিতে হবে না মানে পড়তে বা শিখতে হবে না তা কিন্তু নয়। কারণ বই পড়া ছাড়াও শেখার আরো অনেক উপায় রয়েছে। আজকাল সেসব বিষয়ের ওপরই গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। সেগুলোকে সহশিক্ষাক্রমিক কার্যক্রম বলা হচ্ছে। কিন্তু শেখার মূল বিষয়টা পাঠ্য বই এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যেই আটকে আছে। একটা মেয়ে যদি গণিতে ভালো করে, কিন্তু ইংরেজিতে ভালো না করে সেক্ষেত্রে সে ওই বিশেষ বিষয়ে দুর্বল; তবে কোনোক্রমেই সে সার্বিকভাবে খারাপ নয়। সব বিষয়েই দক্ষ হয়ে গড়ে উঠতে হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। কেউ ভালো দৌড়ায়, কেউ ভালো গান করে, কেউ আবৃত্তি করে, কেউ বা নাচে আবার কারো একাডেমিক দিক শক্তিশালী। পরীক্ষা মানেই চ্যালেঞ্জ। টিকে থাকার যুগে প্রতিনিয়তই বিভিন্ন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। তা হোক সে একাডেমিক বা হোক সে চাকরির বাজারের। পরীক্ষার হাত থেকে যেন নিস্তার মেলে না। পরীক্ষা মানেই টেনশন। ঘুমের ভেতর পরীক্ষার টেনশন, খাওয়ার টেবিলে টেনশন। সব মিলিয়ে খুব খারাপ অবস্থায় থাকে ছাত্রছাত্রীরা।

একাডেমিক পরীক্ষা শুরু হয় সেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকে। সারা বছর এখন পরীক্ষা। সাপ্তাহিক, মাসিক, অর্ধবার্ষিক, বার্ষিক। এ ছাড়াও ক্লাসে তো নিয়মিতই পরীক্ষা নেওয়া হয়। সারা দেশব্যাপী হাজার হাজার কিন্ডারগার্টেনের বেশির ভাগই পরীক্ষা বিষয়টাকেই তাদের কিন্ডারগার্টেনের অন্যতম ভালো বৈশিষ্ট্য হিসেবে টানে। কে কত বেশি পরীক্ষা নেয় সেটা নিয়ে খোদ অভিভাবকদের মধ্যেও দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। কোন কোচিং বা কিন্ডারগার্টেনে কত বেশি পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং তার পদ্ধতি কিরূপ এসব নিয়েই ভালোমন্দ যাচাই করা হয়। পরীক্ষা বিষয়ের সঙ্গে মূল্যায়ন কৌশলটাকে তাই অনেকেই গুলিয়ে ফেলেন। কোচিং সেন্টারগুলোতেই তাই সারা বছর পরীক্ষার চাপ থাকে। ছাত্রছাত্রীরা পরীক্ষা দেয় ঠিকই তবে তা আনন্দের সঙ্গে না। পরীক্ষা শব্দটির সঙ্গে রয়েছে মূল্যায়ন প্রসঙ্গ। কেননা মূল্যায়নের উদ্দেশ্যেই পরীক্ষা নেওয়া হয়। কে কত ভালো করে ক্লাস করেছে, কতটা মনোযোগ সহকারে ক্লাসে শিক্ষকের কথা শুনেছে, কার মেধা কতটুকু-এসবেই সীমাবদ্ধ। এসব মূল্যায়নের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো মার্কস প্রদান। যে যত বেশি নম্বর পায় সে তত ভালো ছাত্র বলে বিবেচিত। নম্বর কম হলে সে খারাপ ছাত্র। পরীক্ষায় ফেল করলে তো কথাই নেই। পরীক্ষা মানেই পাস আর ফেল। এত এত পাস-ফেলের চাপ সামলাতে না পেরে প্রতিবছরই পাবলিক পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর অভিমানে বা লজ্জায় আত্মহত্যার মতো বেদনাদায়ক সংবাদও শুনতে হয়।

পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে অভিভাবক মহলেই যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে। কারণ এখান থেকেই জিপিএ নিয়ে তুমুল প্রতিযোগেতা শুরু হয়। খুব ছোট ছোট এসব ছাত্রছাত্রী যখন কেউ ভালো ফল করে তখন অভিভাবক এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে অনুপ্রেরণামূলক এবং উৎসাহব্যঞ্জক কথা বলে। তারা মনে মনে আনন্দিত হয়। আবার যদি কেউ খারাপ ফল করে তখন তাকে বিপরীতে বেশ কটু কথা শুনতে হয়। এই দুই শ্রেণির ছেলেমেয়ের মধ্যে মিলটা হলো তারা উভয়ই এই ফলের সুদূরপ্রসারী যে প্রভাব তা সম্পর্কে বোঝে না। তাদের কাছে জিপিএ ফাইভ মানেই ভালো এবং ফেল বা পয়েন্ট কম পেলেই খুব খারাপ কিছু। এই বদ্ধ ধারণা নিয়ে তারা বড় হতে থাকে। এবং তারপর যখন আবার জেএসসি পরীক্ষায় যায় পূর্ববর্তী ফলের চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। এবং এর বছর দুয়েক পরেই এসএসসি পরীক্ষা দিতে হয়। সেই শিশু শ্রেণি থেকে ভর্তি হয়েই অবুঝ ছেলেমেয়েগুলো অল্প অল্প করে পরীক্ষা বিষয়টা যখন স্বল্প পরিসরে বুঝতে আরম্ভ করে তখনই এদের পাবলিক পরীক্ষার মতো বড় আসরে বসতে হয়। তাদের মাথায় ঢুকে যায় ভালো ফলের স্বপ্ন। অনেক সময় নিজের দক্ষতার সঙ্গে অভিভাবকের চাহিদা না মেলায় সন্তান মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়। কেননা বেশিরভাগ অভিভাবকই চায় সন্তানের খুব ভালো রেজাল্ট।

নিজের স্কুলে পরীক্ষা থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেই তাদের পাবলিক পরীক্ষার বিশাল এক কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করতে হয়। এর সঙ্গে আছে এ প্লাস পাওয়ার চাপ। আমি জানি অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কাছ থেকে ওই শব্দটাই বেশি আশা করে। এমনকি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরাও আশা করে। ভালো ফল সবাই আশা করতেই পারে। কিন্তু কোনো মানসিক চাপে পরিণত হয়-এমন কিছু করা উচিত নয়। পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর আমাদের দেশে আত্মহত্যা করার খবর পাওয়া যায়। ফেল করাকে ওইসব ছাত্রছাত্রী জীবনের খুব খারাপ একটা বিষয় বলেই মনে করে এবং চরম অপমান বোধ করে। এটি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়। ওরা এটা বুঝতেই চায় না যে, জীবন হলো সব থেকে মূল্যবান এবং এসব একাডেমিক পরীক্ষার ফল এর কাছে অনেক তুচ্ছ একটা বিষয়। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে এমনকি স্কুল থেকে বের করে দিলেও পরবর্তী জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার রেকর্ড বহু রয়েছে। কিন্তু পরীক্ষায় ফল খারাপ করা মানেই সব শেষ, এমন ধারণাই আমাদের সমাজে এখন পর্যন্ত বদ্ধমূল হয়ে আছে। এমনিতে নিজ স্কুলের বাইরে, নিজ শিক্ষকদের সঙ্গে

না থেকে একটা নতুন পরিবেশে গিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার চাপ, তারপর আবার অভিভাবকদের ভালো ফল করার বাধ্যবাধকতা। সবমিলিয়ে ছোটবেলা থেকেই শিশুর মধ্যে জন্ম নেয় পরীক্ষা ভীতি। যা থেকে বের হতে তার অনেক সময় লেগে যায়।

বাধ্যবাধকতা শব্দটি আমি ব্যবহার করছি, কারণ যে কোনো ফলাফলেই চলবে এমন অভিভাবক আজ আর দেখা যায় না। তাতে সন্তানের মানসিক যন্ত্রণা যাই হোক না কেন। সবাই তো ভালো ছাত্র হয়ে জন্ম নেয় না। সবাই ক্লাসে এক রোল করে না। আবার পেছনের সারিতে থাকা ছাত্র বা ছাত্রীটির যে ভালো কোনো পজিশনে যাবে না, এমন কোনো কথাও নেই। এটা হচ্ছে মেধার বিষয়। মেধা হলো নিয়মিত চর্চার বিষয়। কিন্তু পরীক্ষা

থেকে যে ভীতির জন্ম নেয় সেই ভীতি কাটতে কাটতে অনেকটা সময় লেগে যায়। আমার মনে হয়, এখন জেএসসি পরীক্ষার বিয়য়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। এই পরীক্ষাটি

ইতোমধ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণিতে সমাপনী পরীক্ষা দেওয়ার পর মাত্র দুই বছরের মাথায় আরেকটি পাবলিক পরীক্ষার ঝক্কি এবং তার দুই বছর পর আবারও একটি পাবলিক পরীক্ষা- এভাবে একের পর এক পরীক্ষা দিতে দিতে আমাদের সন্তানরা না পরীক্ষা বিষয়টির প্রতিই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীর অগ্রগতি মূল্যায়ন করার জন্য অবশ্যই পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু সেটা এত ঘন ঘন বা অল্প সময়ের ব্যবধানে না হওয়া উত্তম বলে মনে করি। তবে এর যদি কোনো বিকল্প পদ্ধতি বের করা যায় তাহলেও হয়। অন্তত আমাদের সন্তানদের পরীক্ষাভীতি থেকে মুক্ত করতে চাইছি। ওরা যেন পরীক্ষা দিতে কোনো ভয় না পায়। শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রমের একটি অপরিহার্য অংশ হলো পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের মনোভাব অব্যশই ইতিবাচক হতে হবে। ইতিবাচক মনোভাব ছাড়া পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।

লেখক : কলামিস্ট

sopnil.roy@gmail.com

"