ভালোমন্দ

সমকালের কড়চা

প্রকাশ : ১৫ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

এস এম মুকুল

চিকুনগুনিয়ার মহামারী : স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছেন, তাদের অদক্ষতায় রাজধানীতে চিকুনগুনিয়া রোগের বিস্তার ঘটছে। রাজধানী পরিষ্কার রাখা আমাদের কাজ নয়। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমালোচনা করে বলেন, চিকুনগুনিয়া ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার দায়দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে। রাজধানীবাসী গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চিকুনগুনিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রাজধানীর প্রতি ১১ জনের একজন এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পরিসংখ্যানও প্রচারিত হয়েছে। এ রোগের মূল উপসর্গ হলো জ্বর এবং অস্থিসন্ধির ব্যথা। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে প্রায়ই ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়, তবে কাঁপুনি বা ঘাম দেয় না। জ্বরের সঙ্গে সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখ জ্বালা, গায়ে লাল লাল দানার মতো র‌্যাশ, অবসাদ, অনিদ্রা, বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে।

মন্তব্য : মন্ত্রণালয় আর সিটি করপোরেশনের দায় এবং দায়িত্ব নিয়ে এমন দায়মুক্তি ঠেলাঠেলির উপযুক্ত সময় এটা নয়। কারণ এখন প্রায় ঘরে ঘরে এ রোগের বিস্তার ঘটেছে। জনমনে আতঙ্ক, উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের দুটি সিটি করপোরেশন মশার বংশ বিস্তার রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। দুই নগরপিতার এখন বোধোদয় হওয়া উচিত যে, অতিকথনের চেয়ে মশক নিধনে তাদের বেশি নজরদারির প্রয়োজন ছিল এবং আছে। একজন নগরপিতা জনগণের উদ্দেশে বলেছেন, চিকুনগুনিয়া থেকে রক্ষা পেতে আপনার ঘর এবং বাহির পরিষ্কার রাখুন। ঘর পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নাগরিকদের নিজেদের, কিন্তু বাইরের চারপাশ পরিচ্ছন্নতার দায়িত্বের জন্যই তো নগরপিতাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারা এই দায় এড়াতে পারেন না। মশার প্রজনন মৌসুমের আগেই নগরীর জলাশয়গুলো সময় মতো ও নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশক নিধন কর্মসূচি জোরদার করার কর্তব্যজ্ঞান নগরপিতাদের আর কবে জাগ্রত হবে আল্লাহই ভালো জানেন।

দুর্বল হচ্ছে পুলিশ : অতিরিক্ত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে আগের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। জনবল ঘাটতি থাকায় পুলিশের এ সদস্যরা ১৬-১৮ ঘণ্টা ডিউটি করছে। ফলে তারা ক্লান্ত ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভবিষ্যতে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হলে ও আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বড় সংকট দেখা দিলে ক্লান্ত দুর্বল মনোবলসম্পন্ন পুলিশ দিয়ে তা মোকাবেলা দুরূহ হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা ডিএমপির। পুলিশের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং ক্লান্ত ও দুর্বল হওয়ার তথ্য জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সম্প্রতি চিঠি পাঠিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। চিঠিতে বলা হয়েছে, জনবল ঘাটতির মধ্যেই বহুমুখী নিরাপত্তা ও অপারেশনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ডিএমপির অপারেশনাল জনবলের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিন দিন নাইট ডিউটি করতে হয়। কয়েক পালায় ডিউটি বণ্টন করে একই ফোর্সকে একাধিকবার ডিউটিতে অর্থাৎ রিপিট ডিউটিতে নিয়োজিত করা হচ্ছে। ঘাটতি মেটানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাড়তি দুই হাজার ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্যের চাহিদা পাঠানো হয় জানিয়ে চিঠিতে তিনি আরো উল্লেখ করেন, ওই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ৫০০ আনসার সদস্য ডিএমপির অনুকূলে দেওয়া হয়। খবরে প্রকাশ অতিরিক্ত ডিউটি ও অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের কারণে নানা সমস্যায় ভুগছেন তারা। ডিউটি চলাকালে অধিকাংশ সময়ই থাকতে হয় দাঁড়িয়ে। তাছাড়া কর্মস্থলে খাবার সংকটের পাশাপাশি রয়েছে বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটও।

মন্তব্য : বুঝতেও কষ্ট হয়- জনগণের নিরাপত্তার জন্য যারা নিয়োজিত, নিবেদিত তাদের জীবনমানের সুরক্ষা সুনিশ্চিত না করেই রাষ্ট্র জঙ্গি নির্মূলসহ বড় অপরাধ প্রবণতার বিরুদ্ধে পুলিশ বাহিনীকে কাজে লাগাতে চাইছে কোন যুক্তিতে। রাজধানী, বিভাগীয় শহর, জেলা, উপজেলা পর্যায়ে জনগণের অনুপাতে পুলিশের সংখ্যা অত্যন্ত নাজুক অবস্থানে। সরকার যদি সবল পুলিশ বাহিনী চায় তাহলে সবার আগে পুলিশ বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দ্বিগুণ করতে হবে। পুলিশের ইউনিট বাড়াতে হবে। পুলিশের খাদ্য মান বাড়াতে হবে। স্বাস্থ্য-চিকিৎসা, ছুটি সুনিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ডিউটি টাইম বিশেষত যারা বড় শহরে তাদের বেলায় সীমিত করে আনতে হবে। পুলিশ নিজেরাই যদি মানসিক ও শারীরিকভাবে সুস্থ সবল না থাকেন, তাহলে কিভাবে তাদের দ্বারা আমরা নিরাপদ থাকার আশা করি। পুলিশের পাশাপাশি আনসার বাহিনীর কলেবর আরো বড় করা দরকার। এতে সরকার কর্মসংস্থান বাড়াতে পারবে।

কুরআনে সেরা বাংলাদেশি : আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন প্রতিযোগিতায় (ডিআইএইচকিউএ) সেরা খেতাব জিতে নিয়েছে বাংলাদেশের ১৩ বছর বয়সী হাফেজ মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম। দুবাইয়ে ২১তম প্রতিযোগিতার ‘বিউটিফুল ভয়েস’ বিভাগের চতুর্থ পুরস্কারও অর্জন করেছে তরিকুল। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় প্রতিযোগিতায় শীর্ষস্থান অর্জনের পর এ বাংলাদেশি কিশোর দুবাইয়ে ৮৯ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে এ কৃতিত্ব দেখাল।

মন্তব্য : জয়তু বাংলাদেশ। আমাদের এই বাংলাদেশটা আসলে সোনার খনি। যতেœর অভাব, মূল্যায়নের অভাবে অনেক প্রতিভার প্রকৃত প্রতিফলন পায় না দেশ ও জাতি। দেশের প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ জনগোষ্ঠীর পেছনে সরকারের মনোযোগ ও বিনিয়োগ সমানতালে হলে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে বাংলাদেশের তারুণ্যের শক্তি। সুযোগ পেলে শুধু হাফেজ মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম নয়, উদ্ভাবন, আবিষ্কার, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষিসহ সকল ক্ষেত্রে এদেশের তরুণরা বিপ্লবের সূচনা করবে।

শত খেলাপির তালিকা : সম্প্রতি ঋণখেলাপির শীর্ষ ১০০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে সংসদে। তবে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কার কাছে কী পরিমাণ খেলাপি ঋণ রয়েছে, সে তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজে রক্ষিত ২০১৭ সালের এপ্রিলভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে কার্যরত তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৭৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, বিতরণকৃত মোট ঋণের যা ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। গত বছরের মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৯ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আরো ৪৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ অবলোপন করা হয়েছে।

মন্তব্য : এ তো গেল একশজনের তালিকা। পূর্ণ খেলাপকারীদের তালিকা প্রণয়ন করলে হাজার ছাড়াবে- যারা শত শত কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে ভিন্ন খাতে খাটিয়ে এখন লস দেখাচ্ছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় খেলাপি ঋণ আদায় না করে নিরীহ সাধারণ জনগণের ওপর ভ্যাট-ট্যাক্সে চাপ বাড়ানো আর সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানোর কাজে কেন যে ব্যস্ত থাকে বুঝতে একটু কষ্টই হয়। ঋণ খেলাপিদের নাম, ব্যবসা, টাকার পরিমাণ প্রকাশ করা উচিত। সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ আদালতে মামলা করে খেলাপকৃত টাকা তাদের সকল ব্যবসা ও স্থাবর সম্পদ ক্রোক করে আদায় করা দরকার। তবে সব খেলাপি ইচ্ছাকৃত খেলাপকারী নাও হতে পারে- ব্যাপারটি তদন্তের বিষয়।

উদ্ভাবনী সূচকে বাংলাদেশ : প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতায় বাংলাদেশ তিন ধাপ এগিয়েছে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০১৭ (জিআইআই) বা বৈশ্বিক উদ্ভাবনী সূচকে এবারে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৭টি দেশের মধ্যে ১১৪, যা গতবার ১২৮টি দেশের মধ্যে ছিল ১১৭। ২০১৫ সালে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১২৯তম। উদ্ভাবনে একটি দেশের সক্ষমতা ও সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে এ সূচক তৈরি করা হয়। এতে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের প্রাপ্ত স্কোর ছিল ২৩ দশমিক ৭ পয়েন্ট। ২০১৬ সালে তা কমে হয় ২২ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এবার তা আবার বেড়ে ২৩ দশমিক ৭ পয়েন্ট হয়েছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থান ভারতের। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শীর্ষ অবস্থানে এসেছে দেশটি। গতবারের চেয়ে ছয় ধাপ এগিয়ে এবারে ৬০তম অবস্থান ভারতের। শ্রীলঙ্কা রয়েছে ৯০তম স্থানে। নেপাল ১০৯ ও পাকিস্তান ১১৩তম অবস্থানে। বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচক প্রকাশ করে যৌথভাবে কর্নেল ইউনিভার্সিটি, ইনসিড, ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অর্গানাইজেশন।

মন্তব্য : অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো- দেশের উদ্ভাবকদের সরকার থেকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে দেখা যায় না। তাছাড়া দেশের উদ্ভাবকদের তথ্য দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হচ্ছে না। তা না হলে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আরো ভালো থাকার আশা করাটাই স্বাভাবিক ব্যাপার হতে পারত।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

writetomukul36@gmail.com

"