ফ-তে ফল

আমের রাজ্য চাঁপাই

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

ফয়জুন্নেসা মণি

আম শুধু সুস্বাদু জনপ্রিয় ফলই নয়। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে প্রধান অর্থকরী ফলগুলোর অন্যতম হলো আম। জানা যায়, অতীতকাল থেকেই মালদহে আম চাষ হতো। নবাব আলিবর্দী খাঁর আমলে নবাব ও তার কর্মচারীরা নবাবগঞ্জ এলাকায় প্রমোদ বিহারে আসতেন। আমের অনুরাগী ছিলেন তারা। তাদের উৎসাহেই এই এলাকায় আম বাগান গড়ে ওঠে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

দেশের সর্বত্রই আমগাছ জন্মালেও চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের এলাকা হিসেবে বিখ্যাত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দেশ বিভাগের আগে ছিল মালদহ জেলার অংশ। মালদহের আম জগদ্বিখ্যাত। এখনো আম বাগানের বড় অংশ মালদহে। এই আম উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বরেন্দ্রভূমি সংলগ্ন রাজশাহী, নওগাঁ অঞ্চল। বাংলাদেশের আমের রাজধানী বলা হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জকে। দেশে উৎপাদিত আমের বৃহৎ অংশই চাঁপাইনবাবগঞ্জে উৎপন্ন হয়। প্রতিবছর আমের মৌসুম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গাছ থেকে আম পাড়া, ঝুড়ি তৈরি, বাঁধাই, আড়তে জমা করাসহ নানামুখী কর্মযজ্ঞে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এলাকার মানুষ। আম ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট লক্ষাধিক মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। প্রায় ৩-৪ মাস আম নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটায় শ্রমিকরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফজলি, আশ্বিনা, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত-এ জাতীয় কিছু আম ছাড়া সব আমকেই গুটি জাতের আমের কাতারে ফেলা হয়। বাণিজ্যিক দিক বিবেচনা করে আম বাগান গড়ে তোলার কারণে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে অনেক রকম আম। সচরাচর পাওয়া যায় এমন আমের মধ্যে আছে, কয়েক রকমের ফজলি, গোপালভোগ, মোহনভোগ, জিলাপীভোগ, লক্ষ্মণভোগ, বৃন্দাবনী, চন্দনী, হাজিডাঙ্গ, বোম্বাই ক্ষীরভোগ, মিছরিভোগ, সিঁদুর প্রভৃতি। এছাড়াও রয়েছে গিরিয়াধারী, বউভুলানী, জামাইপছন্দ, বাদশাভোগ, রানীভোগ, দুধসর, মিছরিকান্ত, বাতাসা, মধুচুসকি, রাজভোগ, মেহেরসাগর, কালীভোগ, সুন্দরী, গোলাপবাস, পানবোঁটা, দেলসাদ, কালাপাহাড় প্রভৃতি জাতের। প্রচলিত আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩০০ জাতের আম পাওয়া যায়। তবে তার অনেকগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। এসব জায়গা দখল করেছে মল্লিকা, আম্রপালি প্রভৃতি জাতের আম।

জেলার সবচেয়ে বড় আমের মোকাম কানসাট। সড়কপথে এটাই সবচেয়ে বড় আমের বাজার। কানসাটের বিস্তর এলাকা এখন আমের বাজার। প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম এখান থেকে যায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, ফেনীসহ দেশের সর্বত্র। এরপরই গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর বাজার আমের অন্যতম মোকাম। তবে এখানে বরেন্দ্র অঞ্চলে উৎপাদিত গুটি আমের আধিক্যই বেশি। চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় প্রত্যেকটি পাইকারি আমের বাজারে ৪০ কেজিতে ১ মণের স্থলে ৪৫ থেকে ৫০ কেজিতে ১ মণ হিসেবে আম বিক্রি হয়। এটা শুধু পাইকারি ক্রেতাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

শিবগঞ্জের কানসাটে আছে রাজার বাগান। রাজা নেই, কিন্তু তার বাগান আছে। এটি প্রায় ৩০০ বিঘার বাগান। যা এই এলাকার প্রাচীন বাগানগুলোর একটি। জেলা সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ভোলাহাট উপজেলায়ও রয়েছে ৩০০ বিঘা এলাকায় এক আম বাগান। এছাড়া আছে দেড়শ’ বছর আগে তৈরি ২৭০ বিঘার বিখ্যাত আম বাগান। ভারত সীমান্তসংলগ্ন ওবায়েদ মহাজনের দেড়শ’ বিঘার আম বাগান। এছাড়া অসংখ্য আম বাগান ছড়িয়ে আছে জেলার সর্বত্রই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চারটি প্রধান বাজারসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় অর্ধশত বাজার রয়েছে। দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার বসে শিবগঞ্জের কানসাটে। কানসাটের প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তার দুইধার জুড়ে বসে আমের বাজার। গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুরে বসে আমের বড় আরেকটি বাজার। এখানকার পাইকারি বাজাগুলোতে ৪০ কেজিতে এক মণের স্থলে ৪৫-৫০ কেজিতে এক মণ হিসেবে আম বিক্রি হয়। কানসাটে প্রতিদিন প্রায় ছয় কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। জেলায় প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর আম বাগান আর চারটি প্রধান আমের বাজারে প্রতিবছর হাজার কোটি টাকারও বেশি আম কেনাবেচা হয়। এখানে গড়ে ওঠা প্রায় ১২৫টি আড়ত থেকে দেশের পাইকারি ক্রেতারা আম কিনে নিয়ে যায়। তাছাড়া গোপালভোগ, ল্যাংড়া, রিসাপাত, ফজলি আর হিমসাগর আমের হাট রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর আম কেনাবেচায় জমজমাট। রাজশাহীর প্রবেশদ্বার পুঠিয়ায় প্রবেশ করার পরপরই রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের ওপর গড়ে ওঠা প্রায় অর্ধ কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে বিশাল আম কেনাবেচা দেখেই বোঝা যায় এটিই বানেশ্বর আমের হাট। পুঠিয়ার বানেশ্বর আমের হাটে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে কেনাবেচা। পুঠিয়া ছাড়াও কাটাখালী, দুর্গাপুর, বাগমারা, বাঘা ও চারঘাট উপজেলার বিক্রেতারাও আম বিক্রি করতে আসেন এ হাটে। এ কারণে আম বেচাকেনায় ইতোমধ্যেই উত্তরবঙ্গের সর্ববৃহৎ হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। জানা যায়, এই হাটে প্রতিদিন পাঁচ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রায় তিনটি উপজেলাতেই প্রতিবছর নতুন নতুন আম বাগান তৈরি হচ্ছে। বিশেষত বরেন্দ্র অঞ্চলের রুক্ষ কঠিন লাল মাটিতেও। বাড়ছে পদ্মার ভাঙনকবলিত এলাকার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় ৭-৮টি ইউনিয়নে বাগান তৈরি। ভাঙন, বন্যাকে উপেক্ষা করে ধু-ধু বালুরাশিতেও মানুষ গড়ে তুলছে আম বাগান।

লেখক : কবি ও কলামিস্ট

"