শিক্ষা

সিলেবাস পড়ায় কোন স্যার

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০১৭, ০০:০০

সোলায়মান মোহাম্মদ

“Shall I compare thee to a summer’s day?
Thou art more lovely and more temperate”

শেকসপিয়ারের ‘সনেট ১৮’-এর চরণ দুটি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে যথার্থ এবং চমৎকার একটি উপমা। দেশকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত করার প্রশ্নে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। একজন আদর্শবান শিক্ষকই পারেন অন্ধকারে নিমজ্জিত যুবসমাজকে আলোর পথে ফেরাতে। তারাই হলেন সুস্থ ও সুন্দর জাতি গঠনের মূল কারিগর।

একটি মাধ্যমিক স্কুলে সরকারিভাবেই ১৫-২০ শিক্ষক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে থাকেন। যারা প্রত্যেকেই দেশের সর্বোচ্চ ডিগ্রি সম্পন্ন করেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে মেধা তালিকায় উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা তাদের মেধার সবটুকু ঢেলে দিয়ে তৈরি করেন আগামী প্রজন্মকে। একজন শিক্ষকের নিরলস পরিশ্রম আদর-ভালোবাসা, শাসন ও শিক্ষার্থীর মননশীলতায় একেকজন শিক্ষার্থী হয়ে ওঠে আদর্শ দেশপ্রেমিক, রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক।

শিক্ষা যদি জাতির মেরুদ-ই হয়, তাহলে শিক্ষকরা হলেন ওই মেরুদ-ের প্রতিপালক। কিন্তু তারপরও এ দেশে সবসময় শিক্ষকরাই যেন থেকেছেন অবহেলিত। একজন শিক্ষক পাচ্ছেন না তার সঠিক মূল্যায়ন। পদদলিত হচ্ছে মর্যাদা। ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে সম্মান। এখানে একটি কথা মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি, যে জাতি তার শিক্ষককে সম্মান করে না, সে জাতি নিজে কখনো সম্মানিত হবে না। এসব শিক্ষক প্রথমত তাদের নিজ কর্মস্থলেই অবমূল্যায়িত হচ্ছেন, নিজ নিজ স্কুলের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের দ্বারা।

একটি মাধ্যমিক স্কুলে সাধারণত ১০-১২ জনের একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকে। চারজন অভিভাবক সদস্য, একজন সংরক্ষিত মহিলা অভিভাবক সদস্য, দুজন সাধারণ শিক্ষক প্রতিনিধি (টি আর), একজন সংরক্ষিত মহিলা প্রতিনিধি (টি আর), একজন দাতা সদস্য, একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এরা সবাই মিলে আলোচনা সাপেক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে একজন সভাপতি নির্বাচন করেন।

কমিটির কাজ হলো স্কুল যেন ভালোভাবে চলে, তার তদারকি করা এবং স্কুলের সার্বিক উন্নয়নে সব সময় সহযোগিতা করা। কিন্তু এই কমিটি কি সত্যিকার অর্থে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করছে? অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো দেশের অধিকাংশ স্কুলেই ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্বে যিনি থাকেন তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ৮ম থেকে ১০ শ্রেণি পর্যন্ত। একজন সভাপতি হলেন স্কুলের অভিভাবক, সুতরাং তার শিক্ষাগত যোগ্যতার যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে তিনি কিভাবে মাস্টার ডিগ্রি সম্পন্নকারী একজন শিক্ষককে দিকনির্দেশনা দেবেন। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় পূর্বের ন্যায় স্বশিক্ষিত মানুষরা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। তাদের মতো মানুষ থাকলে এ ধরনের সমস্যা নিরসন সম্ভব হতো।

অনেক সময় এসব সভাপতি শিক্ষকদের সঙ্গে অনায়াসে খারাপ আচরণ করছেন। পুরো স্কুলে হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে অনেক সময় শিক্ষকরা সামাল দিতে পারেন না, তখন সভাপতির কার্যকর ভূমিকা রাখতে হয়। একজন অশিক্ষিত ও অমার্জিত সভাপতি হাজার হাজার ছাত্রদের কীভাবে ম্যানেজ করবেন! নিজের মহানুভবতা ও যোগ্যতা দিয়ে সম্ভব নয়, সম্ভব ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং তারা তাই করে থাকেন। এসব সভাপতি ও উপপতিদের নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। গল্পে বলা হয়েছে, দেশের উপজেলা পর্যায়ে এমন কিছু স্কুল আছে যেখানে স্কুলের বিভিন্ন কালচারাল প্রোগ্রামে সভাপতি তার বক্তব্যের সময় ইলেকট্রিসিটিকে ইলেকটিটি বা ইলেকসিটি উচ্চারণ করছেন আর শিক্ষার্থীরা তা শুনে হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে।

এমন যদি অবস্থা হয়, তাহলে সভাপতি কিভাবে একটি স্কুলের অভিভাবক হয়ে স্কুল পরিচালনা করবেন! ওই স্কুলের শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকের যোগ্যতা যদি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মান এবং যোগ্যতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে, তা আজ নতুন করে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

কমিটির অন্য সদস্যদের অবস্থা আরো নাজুক। তাদের অনেকেই শুধু নামের কারণে রাজনৈতিক কিংবা টাকার জোরে স্কুল কমিটির পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হয়ে থাকেন। এদের অবস্থা আরো ভয়াবহ। অধিকাংশই নিজেদের প্রতিষ্ঠানের মূল হর্তাকর্তা ভাবেন এবং প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মনে করে ইচ্ছে মতো সিদ্ধান্ত শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে অনৈতিক স্বার্থ আদায় করেন।

একটি মজার ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কোনো এক স্কুলের অভিভাবক সদস্যের ছেলে পরীক্ষায় খুব খারাপ রেজাল্ট করে। এতে ছেলেকে তার বাবা কারণ জিজ্ঞাসা করায় ছেলেটি বলে, ‘স্যার সিলেবাস ভালোভাবে পড়ায়নি’। ব্যস্! ওই অভিভাবক সদস্য তেলেবেগুনে জ্বলে গিয়ে প্রধান শিক্ষককে ধমকের স্বরে বলেন, ‘এই স্কুলে সিলেবাস পড়ায় কোন শিক্ষক?’ না হেসে উপায় নেই, এই হলো কমিটির অভিভাবক সদস্যদের শিক্ষার নমুনা।

কমিটির সব সদস্য যেমন তেমন হলেও সভাপতির আসনটি লোভনীয় বটে। স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে ওই এলাকার সংসদ সদস্য পর্যন্ত ওই পদের আশায় থাকেন। সংসদ সদস্য না হলেও তার দলের বা অনুসারীর কাউকে উক্ত পদে বসানো হয়। তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় যে নেতার পকেট ভরা টাকা থাকে, তিনিই সিংহাসনের অধিকারী। কে কী পাস বা তার যোগ্যতা কতটুকু তা ভেবে দেখা হয় না। এসব সভাপতি অনেক সময় তাদের পছন্দ মতো বা কথা মতো না চললে শিক্ষকদের অন্যায়ভাবে ছাঁটাই পর্যন্ত করে থাকেন। বেসরকারি এসব স্কুলের সভাপতিদের স্বাক্ষর ছাড়া শিক্ষকদের বেতন ছাড়পত্র পায় না। আর সে কারণে সব শিক্ষককে বাধ্য হয়ে সভাপতির দাস হয়ে চলতে হয়। তবে আনন্দের কথা হলো বেসরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে এনটিআরসির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াটি চালু হওয়া। স্কুল কমিটির ক্ষমতা খর্ব করে কেবল যোগ্য প্রার্থীরাই যাতে নিয়োগ পেতে পারেন- সেই বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগের এই নতুন ব্যবস্থা। যে ব্যবস্থা নিয়োগ বাণিজ্যকে প্রতিহত করতে কিছুটা হলেও সমর্থ হয়েছে। কিন্তু এই নিয়োগ বাণিজ্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়নি। প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক ও কম্পিউটার অপরেটরের নিয়োগের বিষয়টি এখনো স্কুল পরিচালনা পরিষদের হাতে ন্যস্ত। এই হাতের ক্ষমতা খর্ব করে অন্যান্য শিক্ষক নিয়োগের মতোই এনটিআরসির ওপর দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে।

বর্তমান সরকার শিক্ষাবান্ধব সরকার। কাজেই জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে সভাপতি ও অন্য সদস্যদের মার্জিত ও শিক্ষিত হওয়াটা বাধ্যতামূলক হতে হবে। বিষয়টি যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা না করে তাহলে আগামী প্রজন্ম যে ধীরে ধীরে অন্ধকারের অতল গহ্বরে প্রবেশ করবে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। এ সন্দেহ থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্র এ কাজে এগিয়ে এসে আগামী প্রজন্মকে দূষণমুক্ত করে জাতি গঠনে তার দায়িত্ব পালন করবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : শিক্ষক ও সাংবাদিক

"